চাকর ইন্দির এসে কোটা বাড়িয়ে দিয়ে দাঁড়াল।
ডাক্তার তার মুখের দিকে তাকালেন। ভাবছিলেন রতনবাবুর ছেলে বিপিনের হিষ্কার কথা। বোধ করি কাল ভোর নাগাদ হিক্কার উপশম হবে। কমে আসবেই। কী বলবে প্রদ্যোত ডাক্তার?
—তামাক খান। আর মা বললেন– চায়ের জল ফুটছে।
অর্থাৎ বাড়ির ভিতর যাবার জন্যে আতর-বউ বলে পাঠিয়েছেন। কোটি হাতে নিয়ে ডাক্তার বললেন–চা বরং তুই নিয়ে আয়। এখন আর উঠতে পারছি না।
—এই খোলাতে বসে থাকবেন? আকাশে মেঘ ঘুরছে। বৃষ্টি নামবে কখন!
আকাশের দিকে চাইলেন ডাক্তার। শ্রাবণের আকাশে এক স্তর ফিকে মেঘের নিচে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ ঘুরছে, এক যাচ্ছে এক আসছে। গতি দেখে ডাক্তারের মনে হল—বৃষ্টি আসবে না। বললেন, বেশ আছি। বৃষ্টি আসবে না।
তবু দাঁড়িয়ে রইল ইন্দির। ডাক্তারের মনে পড়ল, বাজারের খরচ চাইছে ইন্দির।
নিয়ম হল ডাক্তার কল থেকে ফিরে টাকাগুলি আতর-বউয়ের হাতে দিয়ে থাকেন। আজকাল ডাক্তার ব্যবসা প্রায় ছেড়েছেন। এককালে কুড়ি পঁচিশ ত্রিশ টাকা দৈনিক পকেটে নিয়ে ফিরতেন। এখন কোনোদিন চার টাকা কোনোদিন ছয় কোনোদিন বা দু টাকা। এক একদিন কল আসে না। আবার বেশি দূরের কল যাতে টাকা বেশি তাতে ডাক্তার নিজেই যান না। আজ ডাক্তার আতর-বউকে টাকা দেন নি। পরান শেখের বাড়ি থেকে ফিরে খাওয়াদাওয়ার পরই আতর-বউয়ের সঙ্গে কলহ বেধেছিল। তারপর কিশোর এসে ডেকে নিয়ে গেল রতনবাবুর বাড়ি। ডাক্তার ইতিমধ্যেই জামা খুলে খালি গা করে বসেছিলেন। জামাটা ইন্দিরের হাতে তুলে দিলেন। বললেন–পকেটে টাকা আছে দেখ–
—চার টাকা।
–দিগে আতর-বউকে। আমাকে আর বিরক্ত করিস নে।
–আর দুটো কল্কে সেজে রেখে যাই?
—যা, তাই যা। তুই বড় বেশি বকিস।
আকাশের দিকে চেয়ে কথা বলছিলেন ডাক্তার। দেখছিলেন আকাশের মেঘইন্দিরের কথার দিকে ছিল কান, মুখে তার জবাবও দিচ্ছিলেন কিন্তু মনের মধ্যে ঘুরছিল বিপিনের হিক্কার কথা, প্রদ্যোতের কথা, নিশির কথা। লোকে বলে জীবন মশাই নাড়ি ধরলে মরণ পায়ের চুটকি বাজিয়ে সাড়া দেয়। কেমন বাপ, কেমন শিক্ষা!
***
সেদিন ছিল বৈশাখের অক্ষয় তৃতীয়া। পুত্রের দীক্ষার জন্য এই প্রথম শুভ দিনটিই নির্বাচন করেছিলেন জগৎমশায়। একান্তে নিৰ্জন ঘরে পুত্রকে কাছে বসিয়ে তিনি যেন তার চৈতন্যকে প্রবুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন সেদিন। বাড়িতে বলে রেখেছিলেন যেন কেউ তাদের না ডাকে, কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি না করে।
জীবন অল্পস্বল্প নাড়ি দেখতে জানতেন। চিকিৎসকের বাড়ির ছেলে। বাল্যকালে খেলাচ্ছলে খেলাঘরে বৈদ্য সেজে বসে সঙ্গী সাথীদের হাত দেখতেন, কাদামাটি, ধুলো কাগজে মুড়ে ওষুধ। দিতেন। জীবনের মা পর্যন্ত নাড়ি দেখতে জানতেন। সেদিন বাপ তাকে প্রথম পাঠ দিয়ে নাড়িতত্ব বুঝিয়ে মৃত্যুর কাহিনী বলে আয়ুর্বেদ-ভবনে যেসব রোগীরা এসেছিল তাদের কয়েকজনের নাড়ি নিজে পরীক্ষা করে ছেলেকে বলেছিলেন, দেখ–এর নাড়ি দেখ।
রোগীকে ওষুধের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে অন্যদিকে যেদিকে ওষুধ পাওয়ার ব্যবস্থা সেই দিকে। পাঠিয়ে দিয়ে জীবনকে রোগীর নাড়ির বৈশিষ্ট্য বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এই ছিল জগত্মশায়ের শিক্ষার ধারা।
আয়ুর্বেদ-ভবনের কাজ শেষ করে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকটি রোগীকে রোগীর বাড়িতে গিয়ে দেখে বাড়ি ফেরার পথে বলেছিলেন বাবা, যে চিকিৎসক নাড়িবিজ্ঞানে সিদ্ধিলাভ করতে পারে তার সঙ্গে মৃত্যুকে সন্ধি করতে হয়। মৃত্যুর যেখানে অধিকার সেখানে মৃত্যু বলে—আমার পথ ছেড়ে দাও। এ আমার অধিকার। আর যেখানে তার অধিকার নাই সেখানে ভুলক্রমে উঁকি মারলে চিকিৎসক বলেন-দেবী, এখনও সময় হয় নাই, এক্ষেত্রে তোমাকে স্বস্থানে ফিরতে হবে।
কারণ এমন চিকিৎসকের রোগনির্ণয়েও ভ্রান্তি ঘটে না, ঔষধ নির্বাচনেও ভুল হয় না। মৃত্যু যেমন অমোঘ, পঞ্চম বেদ আয়ুর্বেদের স্রষ্টা ব্ৰহ্মার সৃষ্টি ভেষজ এবং ওষধির শক্তিও তেমনি অব্যৰ্থ। যে ব্রহ্মার কুটিকুটিল দৃষ্টি থেকে সৃষ্টি হল মৃত্যুর, সেই ব্ৰহ্মারই প্ৰসন্ন দৃষ্টি থেকে সৃষ্টি হয়েছে ভেষজের। ব্ৰহ্মা এই শাস্ত্র দিয়েছিলেন দক্ষ-প্রজাপতিকে, দক্ষের কাছ থেকে এই শাস্ত্র পেয়েছিলেন অশ্বিনীকুমারেরা, তাদের কাছ থেকে পেলেন ইন্দ্ৰ, ইন্দ্র দিলেন ভরদ্বাজ আর দিবদাস ধন্বন্তরিকে। এইখানে আয়ুৰ্বেদ দু ভাগে ভাগ হয়েছে। ধন্বন্তরি শল্যচিকিৎসার ভাগ। পেয়েছিলেন। তারপর পুনর্বসু এবং আত্রেয়। তারপর অগ্নিবেশ। আচার্য অগ্নিবেশ রচনা করেছিলেন অগ্নিবেশ সংহিতা। এই সংহিতা থেকেই চরক সংহিতার সৃষ্টি। পঞ্চনদ প্রদেশের মনীষী চরক এই সংহিতাকে নতুন করে সংস্কার করেছিলেন। চরক হলেন চিরজীবী। কথা বলতে বলতেই পথ চলছিলেন পিতাপুত্রে। চলেছিলেন গ্রামান্তরে। জগন্মশায় সচরাচর গাড়ি পালকি ব্যবহার করতেন না। বেশি দূর হলে তবে গরুর গাড়ির এবং তাড়াতাড়ি যাওয়ার প্রয়োজন হলে তবে ড়ুলিতে চাপতেন। সেদিন ছেলেকে দেখিয়েছিলেন ঠিক আজকের ওই নিশির ভাইঝির মত একটি রোগিণী। ঠিক এমনি। কিশোরী মেয়ে, বড়জোর ষোল বছর বয়স সে আবার দুই সন্তানের পর তৃতীয়বার সন্তানসম্ভবা ছিল।
সেদিকে ফিরবার পথে জগৎমশায় বলেছিলেন–নির্দিষ্ট আয়ুর কথা শাস্ত্রে আছে। কিন্তু কর্মফলে সে আয়ুরও হ্রাসবৃদ্ধি আছে। ব্যভিচার করে মৃত্যুকে নিমন্ত্রণ করে আনে মানুষ। এসব ক্ষেত্রে তাই—অথচ–।
