জীবন মশায় প্রমাদ গনলেন। কণ্ঠস্বর শুনে তিনি নিশি ঠাকরুনকে অনুমান করতে পারেন নি। কিন্তু অনুমান করা উচিত ছিল, কারণ এই গলিতে এমনভাবে আধিপত্য খাটানো কণ্ঠস্বরে আর কে ডাকবে? নিশি ঠাকরুন এই গলিতে নিজের দাওয়ার উপর বসে থাকে এবং যাকে দরকার তাকেই ডেকে তার প্রয়োজনীয় সংবাদটি সংগ্রহ করে।
জীবন ডাক্তার সংক্ষেপে বললেন–অসুখ কঠিন বটে, তবে হাল ছাড়ার মত নয়। আমি যাই নিশি, ওষুধ দিতে হবে।
—আঃ, তবু যদি মশায়, তোমার ঘোড়া থাকত! দাঁড়াও না।
–ওষুধ দিতে হবে নিশি।
–তা তো বুঝছি। সঙ্গে লোকও দেখেছি। ওরে লোকটাতুই এগিয়ে চল, ডাক্তার যাচ্ছে। আমার মামাতো ভাইয়ের মেয়েটা বড় ভুগছে। পেটের ব্যানো কিছুতেই সারছে না। একবার দেখে যাও মশায়। এই সব হালের ডাক্তারদের পাল্লায় পড়ে এককাড়ি টাকা খরচ করলাম কিছুতে কিছু হল না। তা তুমি তো আর এ গা মাড়াও না। একেবারে আমাদিকে ছেড়েছ। বলি–অ–নীহার, শুনছিস?
—ডাকতে হবে না, চল দেখেই আসি। ওরে দাঁড়া তুই পাঁচ মিনিট।
বাড়ির মধ্যে ঢুকেই নিশি প্রায় পথরোধ করে দাঁড়িয়ে বললে—ঠিক করে বল দেখি মশায়, রতন মাস্টারের ছেলে বাঁচবে না মরবে?
অবাক হলেন না জীবন মশায়। নিশি ঠাকরুনের স্বভাবই এই। পৃথিবীর গোপন কথাগুলি ওর জানা চাই। জেনে ক্ষান্ত হবে না, প্রচার করে তবে তৃপ্ত হবে।
গম্ভীর কণ্ঠে জীবন মশায় বললেন, আমি তোমাকে লুকিয়ে কথা বলি নি নিশি। নাড়িতে কিছু বুঝতে পারি নি।
–না পার নি! তুমি জীবন মশায়, তুমি বুঝতে পার নি, তাই হয়? লোকে বলে জীবন মশায় রোগীর নাড়ি ধরলে মৃত্যু রোগে মরণ পায়ের চুটকি বাজিয়ে সাড়া দেয়! লুকোচ্ছ তুমি।
এবার ডাক্তার ভ্ৰকুটি করে উঠলেন। নিশি এতে নিরস্ত হল কিন্তু ভয় পেলে না, বললে–আচ্ছা আচ্ছা বুঝতে পেরেছি। ওই হয়েছে। এখন ওললা ও নীহার! বলিযাস কোথায় লা?
—কী পিসি? নীহার এতক্ষণে উত্তর দিলে ঘরের ভিতর থেকে। একটুখানি দরজা খুলে উঁকি মারলে মেয়েটি। সঙ্গে সঙ্গে আচারের গন্ধ পেলেন জীবন মশায়। মেয়েটি ঘরের মধ্যে লুকিয়ে আচার খাচ্ছিল। আমাশয় পেটের অসুখের ওটা একটা উপসর্গ। রোগটা দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। নইলে অনিষ্টকারক বস্তুতে রুচি কেন?
মেয়েটি বেরিয়ে এল।
শীর্ণ কঙ্কালসার বাসি অতসী ফুলের মত দেহবর্ণ একটি কিশোরী। মাথায় সিন্দুর। বয়সে কিশোরী হলেও সন্তানের জননী হয়েছে।
জীবন মশায় চমকে উঠলেন। সর্বাঙ্গে যেন কার ছায়া পড়েছে।
নিশি ঠাকরুন বললে, গৰ্ভসূতিকা হয়েছে। দুটি সন্তান। সব ভেসে যাবে মশায়। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে কেঁদে ফেললে নিশি।
দুটি সন্তান। কত বয়স? চোদ্দ? দুটি সন্তান? ডাক্তার সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলে।
চোখ মুছে মুহূর্তে সহজ হয়ে নিশি বললে–পূর্ণ বারতে প্রথম সন্তান হয়েছে। নেকটানেকটি বিয়েন—চোদ্দ বছরে কোলেরটি। চাঁদের মত ছেলে মশায়, কী বলব তোমাকে, চোখ জুড়িয়ে যায়।
চাঁদ নয় যম। মাকে খেতে এসেছে। বাপের মূর্তিমান অসংযম। সমস্ত অন্তরটা তিক্ত হয়ে উঠেছিল জীবন ডাক্তারের। এইসব অনাচারীর সাজা হয় না? পরক্ষণেই দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। ডাক্তার। বাবা বলতেন—রোগী যখন দেখবে বাবা, তখন কোনো কারণে তার ওপর ক্রোধ বা ঘৃণা কোরো না, করতে নাই। তিনি বলতেন, মানুষের হাত কী বাবা? মানুষ তো ক্রীড়নক।
তাঁর অ্যালোপ্যাথিক শাস্ত্রের গুরু রঙলাল ডাক্তার বলতেন মানুষ বড় অসহায়। তার অন্তরে পশুর কাম, ক্ৰোধ, লোভ; অথচ পশুর দেহের সহনশক্তি তার নাই! ওদের ওপর রাগ কোরো না! করতে পার, অধিকার অবশ্যই তোমার আছে। কিন্তু তা হলে চিকিৎসকবৃত্তি নিতে পার না।
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ডাক্তার বললেন–এতদিন কী করছিলে নিশি?
—এই এটা-সেটা। তা ছাড়া সূতিকা তো হয় মশায়, এমন হবে কী করে জানব বল? তারপরে এই দিন কতক হালের ডাক্তারদের দেখলাম, ওরা আবার নানান কথা বলে। এই লম্বা খরচের ফর্দ। সে আমি কোথায় পাব?
—হুঁ। বলেই থেমে গেলেন ডাক্তার।
নিশির কথা তখনও ফুরোয় নি–বাঈয়ের কবচ, দেবতার ওষুধ, অনেক করেছি।
তা বুঝতে পেরেছেন ডাক্তার। গলায় এক বোঝা মাদুলি। হাতে ন্যাকড়ায় বাধা জড়িপুষ্প। কিন্তু কী করবেন? ডাক্তারই বা কী করবেন? আছে একমাত্র ওষুধ। কবিরাজি–সূচিকাভরণ।
পারবে? জল বারণ। খাওয়াতে পারবে নিশি?
–জল বারণ? নিশিও চমকে উঠল। কী বলছ মশায়?
–হাঁ! জল বারণ। দেখি আর একবার হাতখানি খুকি!
মরণ-রোগক্লিষ্টা খুকি—মুখে কাপড় দিয়ে হাসে। দুই সন্তানের জননী সে–সে নাকি খুকি? ডাক্তারও হাসেন। সঙ্গে সঙ্গে গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন। একমাত্র উপায় বিষ। বিষম। রোগের বিষজ ঔষধ! নাড়িতে পদধ্বনি শুনছেন তিনি।
নিশি মিথ্যা বলে নি। মরণের পায়ে এদেশের মেয়েদের চুটকি থাকলে তার ঝুমঝুম বাজনাও শুনতে পেতেন ডাক্তার। লোকে বলত, কেমন বাপ, কেমন শিক্ষা দেখতে হবে! বাপ ছিলেন গুরু, তিনি ছিলেন এই নাড়ি-পরীক্ষা বিদ্যায় প্রায় সিদ্ধপুরুষ। দীক্ষার নি ব্যাকরণ পাঠ আরম্ভের পর যেদিন হাতে-কলমে নাড়ি-পরীক্ষা বিদ্যায় শিক্ষা দিয়েছিলেন সে দিনটিও ছিল অতি শুভ দিন। বৈশাখী অক্ষয় তৃতীয়া।
এই বৃদ্ধ বয়সেও সেদিনের কথাগুলোকে মনে হচ্ছে যেন কালকের কথা। স্পষ্ট মনে পড়ছে সব। পথ চলতে চলতে মশায় ভাবছিলেন কথাগুলি।
***
হিক্কার ওষুধ তৈরি করে ওষুধ খাওয়ার প্রণালী পালনের নিয়ম কাগজে লিখে রতনবাবুর লোকের হাতে দিয়ে জীবন মশায় আয়ুর্বেদ-ভবনের দাওয়ার উপর বসে দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। নিশি ঠাকরুনের কথা কয়টিই আবার মনে পড়ল।
