জীবন ওখানে সহপাঠী পেলে মঞ্জরীর বড় ভাই বঙ্কিমকে। বোর্ডিঙে জীবন নামক ছুটিয়েছিল; খরচ করত দরাজ হাতে। ওই যে বাপ জমিদারি কিনেছিলেন তারই হকটা জীবন ওখানে নানাপ্রকারে ছড়িয়ে দিয়েছিল। তার মধ্যে ভাল তামাকের গন্ধটা ছিল একটি বিশেষ প্রকার। ওই গন্ধে গন্ধে এলেন চতুরানন। বঙ্কিমের নামডাক ছিল চতুরানন। ছেলেরা বলত বঙ্কিম চার মুখে হুঁকো খায় চার মুখে কথা কয়। ভাল তামাকের গন্ধে এসে বঙ্কিমই আলাপ জমিয়ে তুললে। এবং আলাপের সূত্রে আবিষ্কার করলে যে, জীবন তাদের আত্মীয়। বঙ্কিমের মামা জীবনের নিজের মামির দেওরের আপন ভায়রার নাতজামাই। এবং একদা টেনে নিয়ে গেল নিজেদের বাসায়। বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল-জীবন আমাদের আপনার লোক বাবা। বঙ্কিমের বাবা নবকৃষ্ণ সিং সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দেন নি, তবুও তিনি পরিচয় পেয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করেই সমাদর করলেন।
–দীনবন্ধু দত্ত মহাশয়ের পৌত্র তুমি? জগদ্বন্ধু দত্ত মহাশয়ের ছেলে? তোমরা তো মহাশয়ের বংশ গো। আয়ুর্বেদ তোমাদের কুলবিদ্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুনেছি তোমার বাবা জমিদারি কিনেছেন।
পুলকিত হয়েছিল জীবন। সলজ্জমুখে মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ভালই লেগেছিল এ প্রশংসাবাদ।
নবকৃষ্ণবাবু বলেছিলেন–আমার বাড়িও তো তোমাদের ওই দিকে গো। চাকরি করি যাওয়া-আসা পুজোর সময় গরমের ছুটিতে বড় যাই না। দেশে তো সম্পত্তি তেমন কিছু নাই; বিঘে পাঁচ-সাত জমি, শরিকে শরিকে বিবাদ। কী করব গিয়ে? নইলে পাঁচ কোশ দূরে বাড়ি, আত্মীয়তাও যাহোক একটা আছে, আলাপ থাকত। তা ভাল হল আলাপ হল। কিন্তু
একটু ভুরু কুঁচকে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন কিন্তু তুমি যে ইংরেজি পড়তে এলে?
প্রশ্নের মর্মার্থ বুঝতে পারে নি জীবন; উত্তরে প্রশ্নের সুরেই বলেছিল—আজ্ঞে?
—তোমাদের তো আয়ুর্বেদই এক রকম কুলগত বিদ্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুলধৰ্মও বলতে পারি। এর জন্যে তোমার সংস্কৃত পড়া উচিত ছিল গো। ইংরেজি পড়তে এলে কেন? বিদ্যাই শুধু নয়, বাধা টাট, বাঁধা ঘর,সে এক রকম যজমানের মত। ওই থেকেই তো তোমাদের প্রতিষ্ঠা, মহাশয় উপাধি; জমি পুকুর জমিদারি সব তো ওই থেকে।
জীবন বলেছিল—আমার ইচ্ছে ডাক্তারি পড়ব।
—ডাক্তারি! বাঃ বাঃ! খুব ভাল হবে। সে খুব ভাল হবে। মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন নবকৃষ্ণ সিংহ। তারপর তিনি বলেছিলেন যাও, বাড়ির ভিতরে যাও। বঙ্কিম, নিয়ে যা তোর মায়ের কাছে। তিনি তো হলেন আসল আত্মীয়। আমরা তো তার টানে-টানে আত্মীয়! যাও।
মঞ্জরী তখন উঠানে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে আনি-মানি ঘুরছিল। গাছকোমর বেঁধে হাত দুটোকে দুদিকে প্রসারিত করে দিয়ে বনবন করে খাচ্ছিল ঘুরপাক। মুখে সে ছড়া আওড়াচ্ছিল–
আনি মানি জানি না
পরের ছেলে মানি না
লাগলে পরে নাইকো দোষ
মানব নাকো রাগ কি রোষ
সরে যাও–সরে যাও
নইলে এবার ধাক্কা খাও।
বলেই পাশে ঘুরন্ত ভাইদের কোনো একজনের সঙ্গে খাচ্ছিল ধাক্কা। একজন—সে ভাই-ই হোক বা বোনই হোক পড়ছিল। পড়ে গিয়ে কেউ অবশ্য এসব ক্ষেত্রে রাগ-রোষ সত্যই করে না, পড়ে শুয়েই থাকে চোখ বুজে, মনে হয় মাটি দুলছে—আকাশ দুলছে–ঘরগুলোও দুলছে। সঙ্গে সঙ্গে মনে হচ্ছে অতলের কি পাতালের দিকে সে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। সর্বাঙ্গ কেমন শিরশির করতে থাকে।
বঙ্কিম জীবনকে নিয়ে ঘরে যখন ঢুকল তখন মঞ্জরী পাক খেতে খেতে কাউকে ধাক্কা মারবার উদ্যোগ করছে এবং ঘুরপাকের বেগের মধ্যে ঠিক ঠাওর করতে না পেরে দাদা ভ্রমে জীবনের হৃৎপিণ্ডের উপর মারলে ধাক্কা; এবং নিজেই পড়ে গিয়ে খিলখিল করে হাসতে লাগল। জীবন দত্ত থ মেরে দাঁড়িয়ে গেলেন। এদিকে মঞ্জরীর হাসিও স্তব্ধ হয়ে গেল কয়েক মুহূর্তের। মধ্যে। তার ভুল ভেঙেছে। দাদা ভ্ৰমে অপরিচিত একজনকে ধাক্কা মেরেছে বুঝে বিস্ময়ে ও লজ্জায় চোখ দুটো বড় করে ভূমিশয্যা থেকে উঠেই ও মাগো বলে ছুটে পালিয়ে গেল। গৃহাভ্যন্তরে। এবং আবার শুরু করলে খিলখিল হাসি। জীবন বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
সে আমলে ওই যথেষ্ট।
ঘটনার ওইখানেই শেষ নয়, আরও আছে।
বঙ্কিম পলায়নপরা মঞ্জরীকে উদ্দেশ করে হেসে বলেছিল—মর হতচ্ছাড়ী! তারপর মায়ের সঙ্গে জীবনের পরিচয় করিয়ে দিলে। জীবন তাকে প্রণাম করতে গিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন না না। তুমি তো সম্পর্কে আমার বড় গো। আমার দাদা তোমার মাসিমার দেওরের ভায়রার নাতজামাই। সে হিসেবে তুমি আমার দাদার কোনো শ্বশুর-টশুর হবে। আমারও তাই তা হলে। বোসো, বোসো। প্রণাম আমিও তোমাকে করব না, তুমিও আমাকে কোরো না।
বঙ্কিম এ সম্পর্ক নির্ণয়ে খুব খুশি হয়েছিল—তা হলে তো তার সঙ্গে সম্পর্ক আর এক পর্ব তফাত অর্থাৎ তৃতীয় পুরুষ। নাতি দাদামশায় সম্পর্ক রসিকতার অবাধ অধিকার।
মা খাবার আনতে উঠে যেতেই বঙ্কিম ভিতরে গিয়ে মঞ্জরীকে ডেকে বলেছিল—আয় না হতচ্ছাড়ী, দাদামশায় দেখবি।
–কে? মঞ্জরীর কণ্ঠস্বর ঈষৎ চাপা হলেও শুনতে পাচ্ছিল জীবন।
–দাদামশায় রে!
–দূর! ওই আবার দাদামশায় হয়! ও একটা বুনো শুয়োর, মা গোকী হেঁতকা চেহারা, কালো রঙ!
—ছি! তুই ভারি ধিঙ্গি হচ্ছিস দিন দিন। আমাদের বড় মামা হল ওর মাসিমার দেওরের নিজের নাতজামাই।
—মরণ! সইয়ের বউয়ের বকুলফুলের বোনপোবউয়ের বোনঝি-জামাই!
–না। না। উঠে আয়, আমার বন্ধু। খুব ভাল ঘরের ছেলে।
–ভাল ঘরের ছেলে তো এমন হেতকা বুনো শুয়োরের মত চেহারা কেন?
