–কী যা বলছিস? বীরের মত চেহারা। মুগুর ভাঁজে কিনা!
—তা হলে পড়তে না এসে যাত্রার দলে ভীম সাজতে গেল না কেন? আমরা সত্যিকারের ভাল গদাযুদ্ধ দেখতে পেতাম। তুই যা—আমি যাব না।
বঙ্কিম একটু ক্রুদ্ধ হয়েই ফিরে এল।
জীবনও বন্য বরাহের মত মাথা হেঁট করেই বসে ছিল; খুব প্রীতিপ্রদ নয়, তরুণ বয়সে ও কথায় কারুরই পুলক-সঞ্চার হয় না। সে চলে আসবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল। বললে—আজ যাব ভাই, কাজ আছে।
মা ঠিক এই সময়েই জলখাবারের থালা নিয়ে বেরিয়ে এলেন। থালাখানি নামিয়ে দিয়ে ডাকলেন মঞ্জী কই? মঞ্জী—জল নিয়ে আয় এক গেলাস। মঞ্জী!
মাটি বড় রাশভারী লোক। অমান্য সহজে করা যায় না। জীবন ওই কণ্ঠস্বর শুনেই না বলতে গিয়েও বলতে পারলে না। মঞ্জরীও মিনিটখানেকের মধ্যেই জলের গেলাস হাতে বেরিয়ে এল।
মা বললেন– প্রণাম কর। দাদার বন্ধুই শুধু নয়, আমাদের আপনার লোক। তাদের দাদামশায় হয়।
মঞ্জরী মুখে কাপড় চাপা দিয়ে হাসতে লাগল।
–হাসছিস যে? প্ৰণাম কর।
–ওইটুকু আবার দাদামশাই হয়?
–হয়। মামা-কাকা বয়সে ছোট হয় না? তুলসীপাতার ছোট বড় আছে?
মঞ্জরী এবার প্রণাম করলে। সে আমলে গড় করে প্রণাম করত। এ আমলের মত হেঁট হয়ে পা ছুঁয়ে মাথায় ঠেকানো প্ৰণাম নয়। উঠেই আবার হাসতে লাগল।
মা বিরক্ত হয়েই বললেন– হাসছিস কেন?
–দাদামশাই মিলছে না বলে হাসছি।
–কী? কী মিলছে না?
–দাদামশায়ের গালে কাদা কই? ছড়ায় আছে, ঠাকুরদাদা গালে কাদা–। বলেই মঞ্জরী হাসতে হাসতেই চলে গেল।
এরপর কিশোর জীবন দত্তের অবস্থার কথা বোধ করি না বললেও চলে।
সে একেবারে উন্মত্ত হয়ে উঠল। মঞ্জরী! মঞ্জরী! মঞ্জরীকে সে জয় করবেই। কিন্তু অকস্মাৎ পথ রোধ করে দাঁড়াল একজন।
এই হল সেই ছেলে যার সঙ্গে বিবাদ করে জীবনের সমস্ত আশা বিসর্জন দিয়ে তিনি বাড়ি ফিরেছিলেন। অভিজাত বংশের উগ্ৰ দাম্ভিক ছেলে ভূপতিকুমার বসু। লোকে ডাকত ভূপী বসু বলে। ভূপী বসুওখানকার নামজাদা দুর্দান্ত। মাঝখানে শহরে-বাজারে বেশ গা দুলিয়ে হেলে দুলে যে মাতঙ্গ-গমন ধরনের চলনটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেটা ওখানে অর্থাৎ কাঁদী অঞ্চলে আমদানি করেছিল ভূপী বোস। সে যখন যে পাখানা ফেলত-তখন তার সর্বাঙ্গটা সেই দিকে লোকের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে যেন হেলে যেত। সামনে বা পিছনে যারা থাকত তারা বাধ্য হয়ে দেখত; পাশে যারা চলত—যাদের পাশে তাকাবার অবকাশ থাকত না, তারা এই দোলার ধাক্কা খেয়ে তাকিয়ে সভয়ে সরে যেত; ওরে বাবা, ভূপী বসু যাচ্ছে।
ভূপী বসু ছিল গৌরবর্ণ দীর্ঘাকৃতি। মাথায় রেখেছিল বাবরি চুল; জমিদারের বাড়ির ছেলে। এই ভূপীও ছিল বঙ্কিমের বন্ধু। অনেক আগে থেকেই সে মঞ্জরীর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল।
সুতরাং ভূপী বোসের সঙ্গে আরম্ভ হল প্রতিযোগিতা। ব্যাঘ্র-বরাহ-সংবাঁদরচনা শুরু করলেন কৌতুকপ্রিয় বিধাতা। ভূপী বোস ব্যাঘ্ৰ, জীবন দত্ত বরাহ। এ নাম মঞ্জরী দিয়েছিল।
০৭. বোর্ডিঙে পাশের সিটের ছাত্র
তাঁর সহপাঠী, বোর্ডিঙে পাশের সিটের ছাত্র, এরা তাঁকে সাবধান করে দিয়েছিল। কিন্তু একটু দেরি হয়ে গিয়েছে তখন। দোষ তাদেরও ছিল না, কিশোর জীবনেরও ছিল না।
সহপাঠীরা জানত না যে জীবন বুকে মঞ্জরীর ধাক্কা খেয়েছে এবং ধাক্কা খেয়েও সেইদিকেই ছুটেছে। এবং জীবনও জানত না যে, ভূপী বোস-রূপী ব্যাঘাটি মঞ্জরীর প্রত্যাশায় ওত পেতে বসে আছে। সে সময়ে সামান্য একটা কারণে অভিজাত-কুলপ্ৰদীপ ভূপী বোস মঞ্জরী ও মঞ্জরীর মায়ের উপর রাগ করে ওদিক দিয়ে যাওয়া-আসা বন্ধের ভান করে বসে ছিল। এরই মধ্যে বরাহ প্রবেশ করল।
ভূপী জীবন থেকে বয়সে বেশ ক-বছরের বড়। কিন্তু ফেল করেও জীবনের এক ক্লাস উপরে পড়ে। কাঁদী স্কুলের সর্বজনপরিচিত ভূপী। কাঁদী স্কুলে সেকালে যারাই পড়েছে তারা স্কুলে ভর্তি হওয়ার পাঁচ দিন বা সাত দিনের মধ্যেই তাকে চিনেছে। প্রথমেই চোখে পড়ত তার হেলেদুলে চলন। তারপর শুনত তার বিচিত্র বাগবিন্যাস।
—কোথায় বাড়ি রে ব্যাটাচ্ছেলে? দরিদ্র অবস্থার পাড়াগেঁয়ে ছেলেদের প্রতি এইটিই ছিল তার প্রথম প্রশ্ন।
তার চেহারা বেশভূষা এবং বাগভঙ্গিতে আগন্তুক দরিদ্র সন্তানেরা শঙ্কিত হত, একালের মত বিদ্রোহ করা তাদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। কাল ছিল বিরূপ। তারা সসম্ভ্ৰমেই বলত গ্রামের নাম। তারপরই ভূপী প্রশ্ন করত—অ! কোন্ থানা র্যা? কোন্ পরগনা? কত নম্বর লাট?
তারপর বলতওইখানে আমাদের একটা লাট আছে ৫০৭ কি ৭০৫ একটা নম্বর তাতে সে লাগিয়ে দিত।
জীবন দত্তের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে কিন্তু এই ভঙ্গিতে প্রশ্ন করে নাই ভূপী; একটু খাতির করে বলেছিল—কোথায় বাড়ি হে ছোকরা? জীবনের বলিষ্ঠ দেহ এবং বেশ ফিটফাট পোশাক দেখেই তাকে র্যা এবং ব্যাটা না বলে বলেছিল হে এবং ছোকরা।
প্রথম দিন জীবন ভড়কে গিয়েছিল, সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তও হয়েছিল। কিন্তু সে বিরক্তি গোপন করেই বলেছিল—নবগ্রাম।
বলেই সে চলে গিয়েছিল। দন্তী নখী, শৃঙ্গীদের সান্নিধ্য পরিত্যাগই শ্ৰেয়,এই বাক্যটি স্মরণ করেছিল এবং ভূপীকে ওই দলেই ফেলেছিল। কিন্তু ভূপী ছাড়ে নাই। সে নিজেই এসেছিল এগিয়ে, দু-চার দিন পরেই একদিন বোর্ডিঙে জীবনের ঘরে এসে বলেছিল—শুনলাম নাকি ছোকরা, তুমি তামাক খাও ভাল। কই খাওয়াও দেখি! দেখি কী তামাক তুমি খাও! ভূপীর কণ্ঠস্বর রীতিমত পৃষ্ঠপোষকের কণ্ঠস্বর।
