বি কে ফার্মাসির বিনয় চিকিৎসা জানে না, কিন্তু চিকিৎসকদের ডাক্তার-কবিরাজদের ইতিহাসে ইতিকথায় সে প্রায় শুকদেব বললেও অত্যুক্তি হয় না। দিন-রাত্রিই বিনয় এখানকার ডাক্তারদের নিয়ে আলোচনা করে। শশী পথ দিয়ে যাচ্ছিল হরিজন পল্লীতে রোগীর সন্ধানে। বিনয় তাকে ডেকে বললে—ডাক্তার, তামাক খেয়ে যাও। তারপর রসিকতা করে বলেছে—মলে, শশী ডাক্তার, তোমরা এবার মলে। প্রদ্যোত ডাক্তার বলেছে—সব হাতুড়ের রুটি মারব। জেলে দেব ব্যাটাদের। তারপর বিস্তৃত উত্তপ্ত আলোচনা।
শশী সেই কথা এসে বলেছে ডাক্তার-গিন্নিকে।
–কী দরকার? বিনা পয়সায় মতির মায়ের হাত দেখে নিদান হকার কী দরকার? এ কাল হল বিজ্ঞানের কাল। পাসকরা ডাক্তারদের কাল। সর্দি পিত্তি কফ নিদান—সেকালে চলত। একালে ওসব কেন? যত সব! হুঁ!
এই কথাটা ডাক্তারের অন্তরে বড় লাগে। জীবনের সকল দুঃখ-ব্যর্থতার উদ্ভব ওইখান থেকেই। মানুষের দেহে যেমন একটি স্থানে অকস্মাৎ একটি আঘাত লাগে বিষমুখ তীক্ষ্ণধার কোনো বস্তুতে, তারপর সেই ক্ষতবিন্দুকে কেন্দ্র করে বিষ ছড়ায় সর্বদেহে, এও ঠিক তেমনি। তার অদৃষ্ট। অদৃষ্ট ছাড়া কী আর বলা যায়! সঙ্গতি থাকতেও তাঁর ডাক্তারি পড়া হয় নাই। তিনি কলেজে পড়ে পাস করে ডাক্তার হলে, আতর-বউ—তুমিও আসতে না এ বাড়িতে।
বিচিত্ৰ ঘটনা সে। স্মরণ হতেই ডাক্তার দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন।
এক সর্বনাশী ছলনাময়ী তাঁর জীবনটাকে ব্যর্থ করে দিয়ে গিয়েছে। কাঁদী স্কুলে পাঠ্যজীবনে এই সর্বনাশীকে নিয়ে ওখানকার এক অভিজাত বংশের ছেলের সঙ্গে বিবাদ হল। ছেলেটিও তাঁর স্বজাতি, কায়স্থ। পড়ন্ত জমিদারবাড়ির ছেলে।
হায় রে অবুঝ কৈশোর! শক্তি যোগ্যতা বিচার করে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামে না। কিশোর ছেলে তালপত্র খাড়া হাতে রাক্ষসের সঙ্গে যুদ্ধ করে। রাখাল ছেলে রাজার ছেলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সঙ্কোচ অনুভব করে না, ভয় পায় না।
০৬. জীবন মশায়ের মনে পড়ল
জীবন মশায়ের মনে পড়ল। এক কিশোর শাল আর এক কিশোর তমাল চারায় প্রতিযোগিতা হয়েছিল—তাতে কিশোর তমাল লজ্জা পায় নি।
নবগ্রামে মাইনর পাস করে জীবন ডাক্তার কাঁদী গেলেন এন্ট্রান্স পড়তে। কাঁদী রাজ হাই স্কুলে ভর্তি হলেন। এন্ট্রান্স পাস করে বর্ধমান মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি হবেন। জীবনে সে কত কল্পনা, কত আশা। নিজের ডাক্তারি জীবনের ছবি অ্যাঁকতেন মনে মনে। রঙলাল ডাক্তারের মত গরদের পাতলুন আর গলাবন্ধ কোট পরে, সাদা একটা ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াবেন এ অঞ্চল। বুকে সোনার চেনে বাঁধা সোনার পকেটঘড়ি। থারমোমিটার, স্টেথোসকোপ, কলবাক্স। ঘরে লক্ষ্মী ছিলেন, বাপও ছিলেন স্নেহময়, অর্থের অভাব ছিল না, জীবনের দেহেও ছিল শক্তি, মনেও ছিল সাহস; সুতরাং কাঁদীর পাঠ্যজীবনে উৎসাহের সূর্তির অভাব হয় নি। একদিকে করতেন হইহই, রইরই, অন্যদিকে বোর্ডিঙের তক্তপোশে শুয়ে স্বপ্ন দেখতেন ভাবীকালে জীবন দত্ত এল. এম. এস, সাদা ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন জীবনের মোড় ফিরে গেল। সদ্যযুবক জীবন দত্ত প্রেমে পড়ে গেলেন। প্রেমে পড়েছিলেন এক দরিদ্র কায়স্থ শিক্ষক-কন্যার। তার বয়স তখন আঠার, নায়িকার বয়স বার। সেকালে চোদ্দ বছরেই মেয়েরা যৌবনে প্রবেশ করত। দেহে মনে দুইয়েই তারা একালের বেণিদোলানো সতের বছরের মেয়েদের থেকে স্বাস্থ্য এবং মনে অনেক বেশি পরিপুষ্ট হয়ে উঠত। এ মেয়েটি আবার একটু বেশি পরিপুষ্ট হয়ে উঠেছিল। আজকালকার মতে অকালপক্ব বললে একটু আপত্তি করেন জীবন ডাক্তার। বলেন অকালে পাকার আর সকালে পাকার তফাত আছে। অকালে যা পাকে তাতে গঠনে খুঁত থাকে; উপাদানে খামতি থাকে। কিন্তু সকালে যা পরিপুষ্টিতে পূর্ণতা লাভ করে পাকে তাতে খুঁত থাকে। না; যে-যে উপাদানের রস-পরিপূর্ণতায় স্বাভাবিকভাবে ফলই বল বা দেহমনই বল, রাঙিয়েওঠা রঙ ধরে মিষ্ট গন্ধে মনকে আকর্ষণ করে, তার সবই থাকে তার মধ্যে। বরং একটু বেশি পরিমাণেই থাকে, নইলে সকালে পাকে কী করে? মঞ্জরী একটু সকালে ফুটেছিল।
মেয়েটির নাম মঞ্জরী।
মঞ্জরীর স্বাস্থ্য ছিল সুন্দর। বার বছরের মঞ্জরী একালের কলেজে পড়া ষোড়শী বা পূর্ণিমার। চেয়ে স্বাস্থ্যে শক্তিতে পূর্ণাঙ্গী ছিল। শুধু চুল দেখে সন্দেহ হত যে মেয়েটি ষোড়শী নয়—কারণ। চুলগুলি পিঠ ছাড়িয়ে নিচে নামে নি। কালো চুলের রাশিটি পিঠ ছাড়িয়ে নিচে নামলে তবে ষোড়শী রূপটি পরিপূর্ণ হবার কথা। ঠিক কেমন জান? যেন কোজাগরী লক্ষ্মীপ্রতিমার পিছনে চালপট লাগানো হয়েছে অথচ তাতে ডাকসাজের বেড়টি এখনও লাগানো হয় নি। সেইগুলি অ্যাঁটা হলেই নিখুঁত হয়ে লক্ষ্মীপ্রতিমা হয়ে উঠবে। এইটুকু খুঁত ছিল। তার বেশি নয়।
একটু বাড়িয়ে বলা হয়েছে। জীবন ডাক্তার মনে মনেই সংশোধন করে নেন সেটুকু। লক্ষ্মীপ্রতিমা বটে—তবে শ্যামা। এবং তাতেই যেন অধিকতর মনোরম মনে হত মেয়েটিকে। মঞ্জরীর রূপটি তখন ছিল ভুঁইচাঁপার সবুজ নিটোল ডাঁটাটির মত, মাথায় এক থোকা ফুলের কুঁড়ি তখনও ফোটে নি; ফুটবার সব আয়োজন সম্পূর্ণ।
অন্তরের দিক থেকেও বার বছরের মঞ্জরী ষোড়শীর চেয়ে কম ছিল না। দেহের পরিপুষ্টিতায়, স্বাস্থ্যসমৃদ্ধির কল্যাণে সে তখন কিশোরীর মন পেয়েছিল। একেবারে ষোল আনার অধিকারীর চেয়েও বেশি, আঠার আনা বলা চলে; বলা চলে কেন, জীবন দত্তের হিসাবে তাই হয়। ষোল বছরে কৈশোর পূর্ণ হলে বয়স মেপে হিসেবের আইনে বার আনা তো পাওয়ারই কথা, ষোল আনার বাকি চার আনার দু আনা পূরণ করেছিল তার সমৃদ্ধ স্বাস্থ্য, বাকি দু আনা সেকালের ঘরের শিক্ষায় এবং মায়ের প্রদত্ত শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার মন্ত্রপাঠের ফলে সে পেয়েছিল। এর ওপরও বাড়তি দু আনা মূলধন তার ছিল। সে পড়ে-পাওয়া নয়, সেটা সে পড়াশুনা করে পেয়েছিল। গরিব হলেও বাপ ছিলেন শিক্ষক, বাঙলা লেখাপড়া কিছু শিখিয়েছিলেন। বাপ শিশুবোধক থেকে বোধোদয় পর্যন্ত পড়িয়ে আর পড়ান নি, বলেছিলেন, কৃত্তিবাসী কাশীদাসী রামায়ণ মহাভারত পড়। কিন্তু রামায়ণ মহাভারত পড়েও সে ক্ষান্ত হল না। বৈষ্ণব পদাবলী থেকে ভারতচন্দ্র পর্যন্ত নিজেই পড়লে। ওগুলি বাড়িতেই তাদের ছিল। খাতায় লেখা পূর্বপুরুষের সম্পদ। এরপর বঙ্কিমচন্দ্র পেল হাতে। প্রতাপ-শৈবলিনী, জগৎসিংহ-আয়ের সঙ্গে পরিচয় হতেই ষোল আনা আঠার আনায় ফেঁপে উঠল। বঙ্কিমচন্দ্র তার হাতে এনে দিয়েছিল তারই বড় ভাই।
