রোগীর ধৈর্যচ্যুতি ঘটে যায়। সে উঠে চলে যায়। চক্রধারী হেসে বলে—গোবিন্দ গোবিন্দ। তার পরই বলেবিনা পয়সায় অনেক হাত দেখেছি। আর না।
প্রদ্যোত ডাক্তার চক্রধারীকে চিকিৎসক বলেই ধরে না। তাই তার গণনায় নগ্রামে পাসকরা। ডাক্তারের সংখ্যা মাত্র তিন জন। প্রদ্যোতের কথায় প্রতিবাদ কেউ করেন নি, হরেন ডাক্তার বা চারুবাবু কেউ না। এক রকম মৌন থেকে তার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন বলতে হবে। মানুষের মুখের উপর তুমি আর বাঁচবে না এ কথা বলার চেয়ে নিষ্ঠুর আর কী হতে পারে? এবং এতে যে রোগীর মনোবল ভেঙে যায়, রোগের সঙ্গে যুদ্ধে দুর্বল হয়ে পড়ে, এও সত্য। বাবার ইচ্ছা, বাঁচব বিশ্বাসটাই যে বাছবার পক্ষে পরম ঔষধকে অস্বীকার করবে এ কথা? হরেন ডাক্তার চুপ করে প্রদ্যোতের অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েও হাত জোড় করেছে। অর্থাৎ মার্জনা করুন। আমাকে। প্রদ্যোত ডাক্তার তীব্র তিরস্কার করেছে—ডাক্তারিকে কি আপনি শুধু আপনার জীবিকার পেশা মনে করেন হরেনবাবু? আপনার কোনো সেক্রেড ডিউটি নাই? এই ধরনের নিদান হকা আর গেরুয়ারী করকোষ্ঠী গণকদের মধ্যে তফাত কী? আর জড়ি-বুটি-তুক-তাক-জলপড়া এইসব চিকিৎসার সঙ্গে বেদেদের চিকিৎসার অনাচারের মধ্যে ডিফারেন্স কী?
হরেন জোড়হাত করেই দাঁড়িয়ে ছিল সর্বক্ষণ। প্রদ্যোতের কথার শেষে হেসে বলেছে–আমি গ্রামের লোক। এক সময় আমার বাল্যকালে উনিই আমাকে বাঁচিয়েছিলেন।
একটু থেমে আবার বলেছে—এক সময় উনি খুব ভাল চিকিৎসা করতেন প্রদ্যোতবাবু। আমি অবশ্য ছোট ডাক্তার, আমার বিদ্যাবুদ্ধি সামান্য। তবে ওঁর নাড়ি দেখে রোগ ডায়গনিসিসচিকিৎসা অদ্ভুত ছিল। এখন বৃদ্ধ হয়েছেন, হয়ত মুনিনাঞ্চ মতিভ্ৰমঃ। তার ওপর বয়স হয়েছে। এ ক্ষেত্রে। এ ছাড়া কিশোরদা নেই, তিনি আসুন, তার অ্যাবসেন্সে এটা করা ঠিক হবে না।
কিশোরবাবু! কিশোরবাবু! প্রদ্যোত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। কিশোরবাবু কে? কোনো কথা না বলে তিনি উঠে এলেন।
চারুবাবু বলেছেন—আপনি ইয়ং ম্যান, রক্তের তেজ আছে। তা ছাড়া আজ আছেন কাল। নাই। চলে যাবেন অন্যত্র। কে যেন বলছিল—এ চাকরিও আপনার ট্রপিকাল ডিজিজের এক্সপিরিয়েন্সের জন্যে। এর পর আপনি ফরেনে যাবেন। স্পেশালাইজ করবেন। আপনার কি ওই বৃদ্ধের ওপর রাগ করা উচিত? যেতে দিন। দরখাস্ত করলে ওর সঙ্গে হয়ত অনেকের অন্ন উঠবে। শতমারি ভবেদ্বৈদ্য সহস্ৰমারি চিকিৎসক। মানুষ মেরে মেরে হাতুড়েরা নিজেরাও করে খায়, লোকেরও কিছু উপকার করে। আপনার মত লোকের এ রাগ সাজে না। আমি বরং বৃদ্ধকে বারণ করে দেব। বুঝেছেন। নিদানটিদান হঁকবেন না। জানেন আমাদের সময় একটা গান। ছিল—আমরা খুব গাইতাম—যা কর বাবা আস্তে ধীরে, ঘা কর কেন খুঁচিয়ে। বলেই হো-হো করে হেসে উঠলেন চারুবাবু।
প্রদ্যোতের বেশ লাগল চারুবাবুকে আজ। এখানে এসেই চারুবাবুর সঙ্গে আলাপ সে করেছে কিন্তু সে আলাপ একেবারে যাকে বলে ভদ্রতার মুখোশ এটে বাঁও-কষাকষি ব্যাপার। আজ চারুবাবু মুখোশ খুলে কথা বলেছেন। রসিক লোক। বেশ বসিয়ে আবৃত্তি করলেন—যা কর বাবা আস্তে ধীরে। প্রদ্যোতের মন অনেকখানি নরম হয়ে গেল। একটু লজ্জাও পেলে। চারুবাবু ওই যে বললেন–বৃদ্ধের ওপর রাগ করা তার উচিত নয়।
প্রদ্যোত বললে—বেশ, আপনার কথাই মানলাম। কিন্তু বৃদ্ধকে একটু সাবধান করে দেবেন। এ সব ভাল নয়। একে তো অত্যন্ত নিষ্ঠুর, তার ওপর আনসায়েন্টিফিক। হাত দেখে নাড়ি, পিত্ত, কফ, নিদান—এসব কী?
চারুবাবু বললেন– এক সময় কিন্তু মশায় লোকটার নিদান আশ্চর্যরকম ফলেছে। তা ফলত এবং এখনও। কণ্ঠস্বর মৃদু করে বললেন– আপনি কিন্তু দেখবেন—মতির মাকে বর্ধমান কি কলকাতা পাঠাব ভেবেছেন—তাই পাঠিয়ে দেবেন। নইলে বুড়োর কথা যদি ফলে যায়।
—যাবে না। দৃঢ়স্বরে কথার মধ্যেই প্রতিবাদ এবং দৃঢ় প্রত্যয় জানিয়ে প্রদ্যোত সাইকেল চেপে চলে এসেছে। হি মাস্ট গ্রুভ হিমসেলফ প্রমাণ সে করবেই। উইচক্র্যাফটের মত এই হাতুড়ে বিদ্যের ভেলকি ভেঙে সে দেবেই। জীবনে তার মিশন আছে। শুধু অর্থোপার্জনের জন্য
সে ডাক্তার হয় নি।
কথাটা গোপন থাকে নি। ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে পল্লবিত হয়ে সারা নবগ্রামেই ছড়িয়ে পড়ল। –প্রদ্যোত ডাক্তার নাকি জীবন মশায়কে জেলে দেবে! মতির মায়ের নিদান হেঁকেছে জীবন মশায়, ডাক্তার মতির মাকে বাঁচাবে। এবং তারপর দরকার হলে মামলা করবে। ম্যাজিস্ট্রেট, কমিশনার, মিনিস্টারের কাছে দরখাস্ত করবে। দরখাস্ত করবেহাতুড়ের চিকিৎসা করা আইন করে বন্ধ করে দেওয়া হোক। কথাটা নিয়ে সবচেয়ে গরম এবং তীব্র আলোচনা হল বি কে মেডিক্যাল স্টোর্সে।
বিনয়ের ওষুধের দোকান–বি কে মেডিক্যাল স্টোর্স এ অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বড় ওষুধের দোকান। ডাক্তারেরা যারা প্র্যাকটিসের সঙ্গে ওষুধেরও ব্যবসা করে তারা সকলেই বিনয়ের দোকান থেকে পাইকারি হারে ওষুধ কেনে। এ অঞ্চলে বিনয়ের দোকানের নামডাক খুব। ওষুধ নেন না শুধু চারুবাবু। চারুবাবুর দোকানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই বিনয় দোকান খুলেছিল। চারুবাবু যেবার হাসপাতালের চাকরি ছাড়েন-হাসপাতালে আসে নতুন এম. বি. অহীনবাবু, সেইবার বিনয় দোকান খোলে। অহীনবাবুই খুলিয়েছিলেন। তার যত প্রেসক্রিপশন আসত বিনয়ের দোকানে, বিনয়ের দোকানে তিনি সন্ধের সময় নিয়মিত ঘণ্টা দুয়েক করে বসতেন। বিনা ফিয়ে রোগী দেখতেন। অহীনবাবুর পর তিন জন ডাক্তার এসেছেন হাসপাতালে–তাঁরাও অহীনবাবুর মতই বিনয়ের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। প্রদ্যোত কিন্তু তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নি। তার সঙ্গে কী কী নিয়ে বিনয়ের একটু-আধটু দরকষাকষি চলছে।
