আর-এক ক্ষেত্রে নিজে থেকে বলতে হবে রোগীর আত্মীয়কে-স্বজনকে। সেক্ষেত্রে রোগী বৃদ্ধ না হলেও, পরমার্থ-সন্ধানী না হলেও বলতে হবে। কর্মী সম্পদশালী রোগী—যিনি সংসারে, সমাজে বহু কর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, জড়িত, যার উপর বহুজন নির্ভর করে, তার ক্ষেত্রে অবশ্যই বলতে হবে তোমাকে। তাঁর আত্মীয়স্বজনকে বলবে; কারণ ওই মানুষটির মৃত্যুতে বহুকর্ম বহুজন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এক্ষেত্রে পূর্বাহ্নে জানতে পেরে তার যতটুকু প্রতিকার সম্ভব হতে পারবে।
আর এক ক্ষেত্রে বলতে হবে। যে ক্ষেত্রে রোগী প্রবৃত্তিকে রিপুতে পরিণত করে মৃত্যুকে আহ্বান করে নিয়ে আসছে—সেই ক্ষেত্রে তাকে সাবধান করবার জন্য জানিয়ে দেবে, প্রবৃত্তিকে
সংযত কর বাপু!
প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেই পরমানন্দ মাধবকে অনুভব করা প্রয়োজন। কিন্তু সে মাধবকে এ জীবনে তার পাওয়া হল না। তিনি কী করে রতনকে বলবেন? না, সে তিনি পারবেন না। মমতার সংসারে আশ্বাসই আশ্ৰয়, আশাই অসহায় মানুষের একমাত্র সুখনিদ্রা; জ্ঞানের চৈতন্যের কোনো প্ৰয়োজন নাই।
কালই তিনি হরেনকে বলে আসবেন। এ তিনি পারবেন না! রনবাবুকে সে যেন বলে। দেয়—জীবন মশায়ের মতিভ্রংশ হয়েছে, তিনি আর কিছু বুঝতে পারেন না। বড় ভুল হয়ে যায়। গতকালের নাড়ির অবস্থা পরদিন মনে থাকে না। অনেক বিবেচনা করেই তিনি বলেছেন তিনি আর আসবেন না।
ভোরবেলাতেই বিছানা থেকে উঠলেন তিনি।
না, আর না। বিপিন আরোগ্যলাভ করুক। মতির মা সুস্থ হয়ে ফিরে আসুক। দাঁতু বেঁচে উঠুক। তাঁর সব উপলব্ধি, সব দর্শন ভ্রান্ত মিথ্যা হয়ে থাক।
নিচে নেমে প্রাতঃকৃত্য সেরে দাওয়ায় এসে বসলেন। সমস্যা এক জঁ বিকার। তা চলে যাবে।
উপার্জন অনেক করেছেন। জীবনে লক্ষ টাকার বেশি উপার্জন করেছেন—সব খরচ করে দিয়েছেন। ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকার মত ওষুধের দাম বাকি পড়ে শেষ পর্যন্ত আদায় হয় নি। মেয়েদের বিয়েতে দেনা করেছিলেন, যাদের বাড়িতে দেনা—তাদে, বাড়ি চিকিৎসা করে ফিজ নেন। নি। আশা করেছিলেন—সুদটা ওতেই কাটান যাবে। কিন্তু তা যায় নি, তারা দেন নি। সুদে আসলে নালিশ, ডিক্রি করে সম্পত্তি নিলাম করে নিয়েছেন। কোনো আক্ষেপ নাই তাতে। তবে হ্যাঁ, যতটুকু জীবনে প্রয়োজন—ততটুকু থাকলে ভাল হত। রাখা উচিত ছিল। তা তিনি রাখতে পারেন নি। সংসারে হিসেবি বিষয়ী লোক তিনি হতে পারলেন না। লোকে বলে, জগদ্বন্ধু মশায়ের ঘরে দুধেভাতে জন্ম, নিজে দু হাতে রোজগার করেছে। নাড়ি টিপে পয়সা। হিসেব শিখবেই বা কখন–করবেই বা কেন? ভেবেছিল চিরকাল এমনিই যাবে। দু হাতে রোজগার করে চার হাতে খরচ করেছে।
তাও খানিকটা সত্য বটে বৈকি। কিন্তু ওইটাই সব নয়। না–তা নয়।
আতর-বউ বলেন—এ সংসারে মনই কোনোদিন উঠল না মশায়ের। তেতো, বিষ লাগল চিরদিন। আমি যে তেতো, আমি যে বিষয় হত সে, অমৃত হত সব। তখন দেখতে সে অর্থাৎ মঞ্জরী! কথা শেষ করে হাসেন আতর-বউ, সে যে কী হাসিসে কেউ বুঝতে পারবে না; তাঁর সামনে ছাড়া তো ও হাসি আর কারও সামনে হাসেন না।
এও খানিকটা সত্য। মশায়ও দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে হাসেন, মনে মনে বলেন-সংসারকে তোমরা তেত করে দিয়েছ তাতে সন্দেহ নেই। তুমি, বনবিহারী, মেয়ে, জামাই সকলে; সকলে মিলে। তবে তোমার বদলে মঞ্জরী হলেও সংসার অমৃতময় হত না। এবং তাতেও তার সংসারে আসক্তি হত না। না। হত না।
তাঁর মনের একটা কোণ তোমরা কোনোদিন দেখতে পাও নি। মনের সে কোণে তার জীবনের শ্মশান-সাধনার আয়োজন। সেখানে অমাবস্যার অন্ধকারে নিজেকে ঢেকে রেখেছেন। আজীবন। অহরহ সেখানে মধ্যরাত্রি। মৃত্যু, মৃত্যু আর মৃত্যু। এই নামেই সেখানে জপ করে গেলেন আজীবন। মৃত্যু অমৃতময়ী হয়ে দেখা দেয়, বলেছিলেন তাঁর বাবা। সেই রূপ দেখবার যার সাধনা সে বিষয়ের হিসেব, বস্তুর যত্ন করবে কখন? নইলে যে রোজগারটা জীবনে তিনি করেছিলেন—তাতে কি তোমাকে পালকিতে চড়িয়ে নিজে সাদা ঘোড়ায় চেপে কাঁদী ঘুরে আসতে পারতেন না! সাদা ঘোড়া তো হয়েছিল। গহনাও তোমার কম হয় নি; পালকি বেহারার খরচ আর কত? তুমি তো জান না, রোগীর মৃত্যুশয্যার পাশ থেকে উঠে চলে আসবার সময় রোগীর আপনজনেরা যখন ডাকত একটু দাঁড়ান মশায়, আপনার ফি। হাত পেতে নিয়ে ভাবতে ভাবতে আসতেন সেই বিচিত্র রূপিণীকে; আজও আসেন। এই পরিণাম মহাপরিণাম। অনিবার্য অমোঘ। বার বার প্রশ্ন করেছেন-কী রূপ? কেমন? বর্ণে গন্ধে স্পর্শে স্বাদে সে কেমন? কেমন তার কণ্ঠস্বর? বাবার বলা কাহিনীর রূপও এ সময়ে মনকে পরিতুষ্ট করতে পারে না।
হঠাৎ ধূমকেতুর মত শশী এসে উপস্থিত হল। এই আশ্বিন মাসেই শশী তার ছেড়া ওভারকোট চড়িয়েছে। হাতে কো। এই সকালেই চোখ দুটো লাল। নেশা করেছে, কিন্তু মদের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে না, গাঁজার গন্ধও না, বোধহয় ক্যানাবিসিন্ডিকা খেয়েছে। বিনা ভূমিকায় বললে রামহরে বেটা আজ উইল রেজেস্ট্রি করতে আসছে। আপনাকে সাক্ষী করবে। রামহরের এই শেষ বউকে কিছু দেওয়াতে হবে আপনাকে। আর আমার ফিয়ের অনেক টাকা বাকি, তা ঝকমারুকগে গোটা বিশেক টাকা আমাকে দেওয়াবেন।
শশী বসল চেপে।
শশীকে কী বলবেন—তাই ভাবছিলেন তিনি। হঠাৎ বাইসিক্লের ঘণ্টার শব্দে আকৃষ্ট হয়ে মুখ ফেরালেন তিনি। বাইসিক্ল আজকাল অতি সাধারণ যান, আশপাশে গ্রামের চাষীর ছেলেরাও আজকাল বাইসিক্ল কিনেছে। তবু ওর ঘণ্টার একটা আকৰ্ষণ আছে। এ গ্রামে বনুই প্রথম বাইসি কিনেছিল।
