বাইসিক্ল দুখানা। প্রদ্যোত ডাক্তার আর তার বন্ধু দুজনে চলেছে। এদিকে এত সকালে কোথায় যাবে?
প্রদ্যোত ডাক্তার নেমে পড়ল সাইক্ল থেকে। বন্ধুটি একটু এগিয়ে গিয়ে নামল। প্রদ্যোতবাবু হঠাৎ নেমেছে বোধহয়।
–নমস্কার!
প্রত্যাশা করেন নি মশায়। একটু যেন চমকে উঠেই প্রতিনমস্কার করলেন–নমস্কার!
অহীন্দ্র সরকারের বাড়িটা কোথায় বলুন তো? বলে এল—আপনার বাড়ির কাছাকাছি।
—অহীনের বাড়ি? এই তো, এই গলিটা ধরে যেতে হবে। ওদের বাড়ি যাবেন?
–হ্যাঁ। একটু হাসলেন প্রদ্যোত ডাক্তার। অহীনবাবুর জামাই আমার ক্লাসফ্রেন্ড। একসঙ্গে আই. এস. সি. পড়েছিলাম। তার ছেলের অসুখ।
অহীনের জামাইয়ের ছেলে? দৌহিত্র? অতসীর ছেলে তা হলে? মতির মাকে যেদিন দেখে গঙ্গাতীর যাবার কথা বলেছিলেন সেদিন ফিরবার পথে মদনের ছেলে বদনের সঙ্গে জল ঘেঁটে খেলা করছিল একটি ছোট ছেলে—চোখ-জুড়ানো—যশোদা দুলালের মত ফুটফুটে ছেলেটি, সেই ছেলেটি? তার অসুখ? তিনি এই বাড়ির দোরে রয়েছেন—তাকে ডাকে নি, দেখায় নি? কী অসুখ?
ততক্ষণে গলির মধ্যে ঢুকে গেছে প্রদ্যোত এবং তার বন্ধু।
—আজকাল লোকের খুব পয়সা হয়েছে, বুঝলেন মশায়। মেলা পয়সা। আপনাকে আমাকে। দেখাবে কেন? অথচ অহি সরকারের বাবার কত্তাবাবার আমল থেকে আপনারা চিরকাল বিনা পয়সায় দেখে এসেছেন।
মশায় অকস্মাৎ দাওয়া থেকে পথের উপর নেমে পড়লেন। ধরলেন ওই গলিপথ। অহি সরকারের বাড়ির দিকে।
***
শশী অবাক হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সে বলে উঠল—এরই নাম মতিচ্ছন্ন। দেবে, প্রদ্যোত ডাক্তার ঘাড় ধরে বের করে দেবে।
বছর চারেকের শিশু। জ্বরে আচ্ছনের মত পড়ে আছে। এদিকের কৰ্ণমূল থেকে ওদিকের কৰ্ণমূল পর্যন্ত গোটা চিবুকটা ফুলেছে, সিঁদুরের মত টকটকে লাল।
প্রদ্যোত ডাক্তার দেখছে। বন্ধুটিও দেখছে। মা বসে আছে শিয়রে, অহি এবং একটি প্রিয়দর্শন যুবা দাঁড়িয়ে আছে পাশে। মশায় গিয়ে ঘরে ঢুকলেন। নীরবে পিছনে দাঁড়িয়ে রইলেন।
একটা বিষম যন্ত্রণা চলছে রোগীর দেহে, রোগীর অনুভবশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসছে। চেতনা বোধ। করি বিলুপ্তির মুখে।
তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মশায়। কোনো ছায়া পড়েছে কি? বুঝতে পারছেন না। দৃষ্টিশক্তি তারও ক্ষীণ হয়ে এসেছে।
প্রদ্যোত দেখা শেষ করে উঠে দাঁড়াল। মুখ গম্ভীর, চিন্তান্বিত। তার চোখ পড়ল মশায়ের উপর।
—আপনি!
–আমি একবার দেখব।
তিনি এগিয়ে এলেন রোগীর দিকে। বিছানায় বসে পড়লেন।
অপ্রস্তুত হল অহি সরকার। অতসীও হল। শশী মিথ্যা বলে না। আজ তিন পুরুষ ধরে মশায়দের প্রীতির জন্য সরকারদের চিকিৎসা খরচ ছিল না। আজ তাকে উপেক্ষা করে–।
অহি বললে—দেখুন না, কোথা থেকে কী হয়। কাল সকালে জামাই এল। ছেলেটা কোলে নিলে, বললছোট একটা ফুসকুড়ি হয়েছে, একটু চুন লাগিয়ে দাও। সন্ধেবেলা কাঁদতে লাগল-বড় ব্যথা করছে। ফুসকুড়িটা মুড়ো ফোড়ার মত মুখটুক নাই—একটু বেড়েছে। দেখলাম। তারপর সারারাত ছটফট করেছে, জ্বর এসেছে। সকালবেলায় দেখি মুখ ফুলেছে আর জ্বর, শ-চেতন নাই। আমি আপনাকেই ডাকতে যাচ্ছিলাম, তা জামাই বললে—এ তো ফোড়াটোড়ার জ্বর, হয়ত কাটতে হবে, কি আর কিছু করতে হবে। এতে ওঁকে ডেকে কী করবেন? তা কথাটা মিথ্যেও বলে নি। তার ওপর হাসপাতালের ডাক্তারবাবু জামাইয়ের ক্লাসফ্রেন্ড। তা আমি বললাম—তোমার ধন-তুমি যাকে খুশি দেখাও বাপু। আমার কী দায় এতে কথা বলতে!
মশায় ছেলেটিকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন। প্রদ্যোত ডাক্তার ততক্ষণে বেরিয়ে চলে গিয়েছে। বাইসিক্লে চড়েই চলে গিয়েছে ওষুধ আনতে। ইনজেকশন দেবে। পেনিসিলিন ইনজেকশন।
ছেলেটির মা অতসী ব্যথভাবে বলে উঠল—কেমন দেখলে মশায়দাদু? আমার ছেলে কেমন আছে? কী হয়েছে?
হেসে মশায় বললেন–গাল-গলা ফুলে জ্বর হয়েছে ভাই! ভয় কী? ডাক্তারবাবুরা রয়েছেন আজকাল ভাল ভাল ইনজেকশন উঠেছে। ভাল হয়ে যাবে।
চলে এলেন তিনি; যেমনভাবে এসেছিলেন ঠিক তেমনিভাবেই বের হয়ে এলেন। অহি। সরকার পিছনে পিছনে এসে রাস্তায় নেমে ডাকলে—কাকা!
–অহি?
–কী দেখলেন?
—নাড়ি দেখে আর কতটা বুঝব বল? তবে জ্বরটা বাড়বে।
–এখনই তো—
সে বলবার আগেই মশায় বললেন–দুই হবে-একটু ওপরেই। কম নয়।
–হ্যাঁ, দুই পয়েন্ট দুই। আরও বাড়বে?
–বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে, বাবা।
–গাল-গলা ফোলা? এমন লাল হয়ে উঠেছে। সামান্য ফোড়া!
–এঁরা তো রক্ত পরীক্ষা করছেন। দেখ। নাড়ি দেখে বলে যে বেকুব হতে হবে বাবা!
চলে এলেন তিনি, আর দাঁড়ালেন না। বাড়ির দোরে তখন দুখানি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। একখানা পরান খাঁয়ের, অন্যখানা রামহরি লেটের। রামহরি উইলে সাক্ষী করাতে এসেছে।
শশী পালিয়েছে রামহরিকে দেখে।
***
পরানের স্ত্রী অন্তর্বত্নী। পরান খুশি হয়েছে। একটু লজ্জিতও যেন, সেইটুকু ভাল লাগল মশায়ের। মনটা ভাল থাকলে হয়ত একটু রসিকতাও করতেন। অন্তত মসজিদে-দরগায়দেবস্থানে মানত মানতে বলতেন; বলতেন—তা হলে একদিন খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা কর পরান। এবার সন্তান হয়ে বাঁচবে। বুঝেছ? আর বিবিরও সব অসুখ সেরে যাবে। কিন্তু মনটা বিমর্ষ হয়ে আছে। চৈতন্য এবং অচৈতন্যের মাঝখানে বিহ্বল অবস্থার মধ্যে উপনীত অতসীর ওই ছেলেটির কথাই তাঁর মনকে বিষণ্ণ করে রেখেছে। এখানে রিপু নাই, প্রবৃত্তির অপরাধ নাই–প্রতিষ্ঠা, সম্পদ, লালসা, লোভ-কোনোটার বিশেষ আকর্ষণে বাঁচবার বাসনা উদগ্র নয়। নবীন জীবন বাড়বার, পূর্ণ হবার জন্য বাঁচতে চায় প্রকৃতির প্রেরণায়। কী প্রাণপণ কঠোর যুদ্ধ! নিজের দাবিতে সে যুদ্ধ করছে। প্রচণ্ড দাবি। প্রচণ্ডতম। নিষ্ঠুর ব্যাধিটা দেখা দিয়েছে কালবৈশাখী ঝড়ের মত। একবিন্দু কালো মেঘে যার আবির্ভাবসে কিছুকালের মধ্যেই ফুলে ফেঁপে ছেয়ে ফেলবে, ফেলতে শুরু করেছে। তাণ্ডব এখনও শুরু হয় নি। তবে খুব দেরি নাই। দেরি নাই। নাড়ি ধরে তিনি বাতাসের শো শে ডাকের মত সে ডাক যেন অনুভব করেছেন। দূরের প্রচণ্ড শব্দের ধ্বনি যেমন মাটিতে অনুভব করা যায়, ঘরের দরজা জানালায় হাত দিয়ে স্পর্শে অনুভব করা যায়, তেমনিভাবেই অনুভব করেছেন। এ ছাড়া আর উপমা নাই। বিষজর্জরতার মত একটা জর্জরতা সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে। গতি তার উত্তরোত্তর বাড়বে—ঝড়ের সঙ্গে মেঘের মত জ্বরের সঙ্গে বিষজর্জরতাও বাড়বে।
