মাদাম কুরির কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে নীলা বলে, এ তো পোলিশ গৌরব, ফরাসি নয়।
বেনোয়া বলে মাদাম কুরি ফরাসি গৌরব, কারণ যে দেশেই তাঁর জন্ম হোক না কেন, এ দেশে তিনি বাস করেছিলেন।
নীলা ধীরে বলে, আমি তো এ দেশে বাস করছি। আজ যদি সাংঘাতিক কিছু একটা আবিষ্কার করি আমি, খুব বড় কিছু, আমাকে কি ফরাসি গৌরব বলে ভাবা হবে?
বেনোয়া উত্তর দেয় না।
নীলাই উত্তর দেয় তার প্রশ্নের, ভাবা হবে। আর যতদিন না বড় কিছু ঘটাচ্ছি, ততদিন ভারতীয়ই থাকব। গরিব দুঃখী ভারতীয়, খেতে না পাওয়া ভারতীয়, শূন্য থালা হাতে ভিক্ষে করা ভারতীয়। ফরাসি সংস্কৃতি নষ্ট করা, বিনাশ করা অনুপ্রবেশকারী।
নীলা শব্দ করে হেসে ওঠে। বেনোয়া সতর্ক করে দেয়, এখানে এত জোরে হাসার নিয়ম নেই।
ফুঁপিয়ে কপট কেঁদে বলে, কাঁদা কি চলবে?
না, তাও চলবে না।
ভলতেয়ারের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে নীলা বলে, কিন্তু ওই কফিনের ভেতর কি ভলতেয়ারের মৃতদেহ আছে?
বেনোয়া হেসে ওঠে, মৃতদেহ কি আর এতদিন থাকবে, হাড়গোড় আছে।
নীলাও হাসে, তাই তো। কিন্তু আমার মনে হয় কী জানো, এখানে ভলতেয়ারের কিছু নেই।
নিশ্চয়ই আছে।
কিন্তু যদ্দুর জানি ধর্মান্ধ ক্রিশ্চানরা ভলতেয়ারের মৃতদেহ চুরি করে নিয়েছিল এখান থেকে, কেটে ছিঁড়ে আবর্জনার স্তূপে ফেলে দিয়েছে। হৃৎপিণ্ডটা অবশ্য আছে এখনও, বিবলিওটেকে, মস্তিষ্ক অকশনে বিক্রি হতে হতে এখন লাপাত্তা।
বেনোয়া হেসে উড়িয়ে দেয় নীলার গল্প।
প্যানথিওঁ থেকে বেরিয়ে বেনোয়া বলে, আমার অবশ্য ভলতেয়ারকে তেমন মনে হয় না।
কেন বড় কিছু মনে হয় না ভলতেয়ারকে, তা বেনোয়া খোলসা করে বলে না, বলে দেকার্তকে মনে হয় বড় কিছু। তারপর গড়গড় করে দেকার্তের অঙ্ক কষার অসাধারণ পদ্ধতি ব্যাখ্যা করে, দীর্ঘ সময় নিয়ে বর্ণনা করে দেকার্তের জ্যামিতি বিশ্লেষণ তত্ত্ব। নীলার মন পড়ে থাকে ভলতেয়ারে।
কগিতো আরগো সাম। বেনোয়া দুবার বাক্যটি আওড়ায়।
এ আবার কী? নীলা জিজ্ঞেস করে।
দেকার্তের বিখ্যাত লাতিন উক্তি।
নীলা জানে না। বেনোয়া অর্থ বলে দেয়, আমি চিন্তা করি, সুতরাং আমি।
দেকার্তের তো ঈশ্বরে বিশ্বাস ছিল। নীলা বলে।
এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যা কিছু সব ঈশ্বরের তৈরি। মানুষের মন হচ্ছে ঈশ্বরের মতো, ভাবে। মানুষের আকার আছে, ঈশ্বর নিরাকার। কিন্তু মানুষ মরে যায়, মানুষের ভাবনা থেমে যায়, ঈশ্বর থাকেন, তাঁর ভাবনা থাকে, তাঁর থাকার জন্য তাঁকে নির্ভর করতে হয় না তাঁর সৃষ্টিকর্তার ওপর। বেনোয়া মুখস্থ বলে যায়।
বেনোয়ার চোখ মাঝে মাঝে আকাশে, ঈশ্বরের গল্প করলে অনেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে করে, ভেতরে একটি ছবি ভাসে সম্ভবত, আকাশের ওপর কোথাও কোনও সিংহাসনে বসে আছেন স্বয়ং ঈশ্বর। অবশ্য বেনোয়ার ধারণায় ঈশ্বর নিরাকার। নিরাকার ঈশ্বরের তো কোথাও বসার কথা নয়।
নীলা বলে, মুসলমানরা বিশ্বাস করে ঈশ্বর নিরাকার। আবার এও বিশ্বাস করে ঈশ্বর আকাশে বাস করেন। রীতিমতো ভ্রমণ করেন এক আকাশ থেকে আরেক আকাশে। তোমার দেকার্তের ঈশ্বর কি আকাশে থাকেন?
বেনোয়া হাতের মুঠো থেকে নীলার হাত খসিয়ে দেয়, কী ব্যাপার, তুমি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো না?
নীলা হেসে বলে, আমি ফ্রাসোয়া মারি আরোয় বিশ্বাস করি।
এ আবার কে? বেনোয়া জিজ্ঞেস করে।
এ হচ্ছে এক ফরাসি লোক, জন্মেছেন প্যারিসে।
প্রেমে পড়েছ নাকি তার?
হ্যাঁ। অনেকদিন। নীলা হাসে।
দেখতে কেমন?
সুন্দর। ছিপছিপে শরীর। মেদহীন।
শুয়েছ ও ব্যাটার সঙ্গে?
না শুইনি এখনও।
নীলা বেনোয়ার আঙুলের ফাঁকে আঙুল ঢুকিয়ে হাতটিকে বন্দি করে।
আমার চেয়ে বয়সে বড় না ছোট? বেনোয়া জিজ্ঞেস করে।
তোমার চেয়ে বড়, খানিক ভেবে, বেশি না, তোমার চেয়ে দুশো পঁচাশি বছর বড়।
বেনোয়া হো হো করে হাসে। নীলাও।
তো তাকে বিশ্বাস করার কারণ কী তোমার? বেনোয়া উদগ্রীব জানতে।
সে অনেক কারণ। ফ্রাসোয়া জীবনে ভুগেছেন অনেক। ফরাসি সরকারের সমালোচনা করে কবিতা লিখেছিলেন, সরকার তাঁকে বাস্তিলে বন্দি করে রাখল এগারো মাস। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি লিখতে শুরু করলেন। বেশ চলছিল। হঠাৎ একদিন তিনি এক নামকরা লোককে, সমাজের উঁচুতলার কোনও এক লোক হবে, বিষম অপমান করলেন। এর শাস্তি পেতে হবে ফ্রাসোয়াকে। হয় জেল নয় নির্বাসন। ফ্রাসোয়া নির্বাসন বেছে নিলেন। নির্বাসনে পাশের একটি দেশে গেলেন, নাম বলব না। সে দেশে বছর তিনেক ছিলেন, প্যারিসে ফিরে এসে সে দেশের বেশ গুণ গেয়ে একটি বই লেখেন। সে দেশের সঙ্গে ফ্রান্সের শত্রুতা বহুকালের…
বুঝেছি ইংলন্ড। আচ্ছা লোকটি কে? দ্ৰফুস? আলফ্রেড দ্ৰফুস?
দ্ৰফুসের চেয়ে দুশো পঁচাশি বছর ছোট হলে তুমি এখনও জন্ম নাওনি। আর ইংলন্ডে কোনও শয়তানের দ্বীপ নেই, যে দ্বীপে দ্ৰফুস ছিলেন। নীলা বলে যায়। যা বলছিলাম, তো ফরাসি সরকার তা মেনে নেবে কেন? ফ্রাসোয়ার শাস্তির ব্যবস্থা হল আবার। এবারও ফ্রাসোয়াকে নির্বাসনে যেতে হল। এবার তিনি দেশের খুব দূরে যাননি, কাছাকাছিই ছিলেন। মানে কোনও সমুদ্র পাড়ি দিতে হয়নি।
বেলজিয়ামে ছিলেন?
না।
ইতালিতে?
না।
স্পেনে?
না। সেই নির্বাসনে বসে তিনি প্রচুর বই লিখতে লাগলেন। অন্ধত্বর বিরুদ্ধে, যুক্তির পক্ষে। তারপর তিরাশি বছর বয়সে যখন তিনি দেশে ফিরে এলেন, তাঁকে বিরাট সংবর্ধনা দেওয়া হল। বয়স অনেক, মারা গেলেন প্যারিসে। কিন্তু কোনও গির্জার ভেতরে তাঁর কবর দেওয়া সম্ভব হয়নি, কারণ গির্জার বিপক্ষে তিনি বেশ সোচ্চার ছিলেন। শেষে যাই হোক শঁপাঁর এক অ্যাবিতে কবর দেওয়া হল। তারপর আঠারো শতকের শেষ দিকে তাঁকে প্যারিসে নিয়ে আসা হয়, অবশ্য বেশ সম্মানের সঙ্গেই।
