বেনোয়াকে লক্ষ করে নীলা, অন্যমন।
এই দালানটা দেখো। বিশাল একটা বাড়ির দিকে চিবুক তুলে বেনোয়া বলে, এটা আমার ইস্কুল। একোল নরমাল সুপেরিয়ের। ফ্রান্সের সবচেয়ে নামকরা ইস্কুল। এই ইস্কুলের সার্টিফিকেট পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তুমি যদি পড়ার সুযোগ পাও, তোমাকে নব্বই হাজার ফ্রাঁ করে বছরে দেওয়া হবে। আমিও তা পেয়েছি। এখানে লেখাপড়া করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছে অনেকে। তুমি লুই পাস্তুরের নাম শুনেছ?
নীলা মাথা নাড়ে, শুনেছে।
মিশেল ফুকো? জ পল সার্ত্র? রমা রলাঁ? আঁরি বারগসন?
নীলা এঁদের নামও শুনেছে।
সব এই ইস্কুলের ছাত্র ছিলেন। বেনোয়া নীলাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। খুব সুখী দেখায় তাকে।
খাকির ওপর হালকা সবুজ টিশার্ট পরেছে বেনোয়া। গরমের পোশাকই এমন, যত পাতলা হওয়া যায়, যত ছোট হওয়া যায়। নীলার পরনে ছোট একটি স্কার্ট, অর্ধেক উরু খোলা, আর একটি আঁটসাঁট কালো জামা। চুল পিঠে গড়াচ্ছে। পায়ে উঁচু জুতো, উঁচু পরেও বেনোয়ার কাঁধের নীচেই পড়ে থাকে তার কাঁধ। ভরা বুক। পেটে চিকন মেদের ভাঁজ, এই মেদ নিয়ে নীলার শরম ছিল, বেনোয়াই বলেছে, ওটুকু মেদ না থাকলে মেয়েদের ভাল দেখায় না। আজকালকার মেয়েরা যে হারে না খেয়ে থাকে মেদ কমাতে, না খেয়ে না খেয়ে কঠিন অসুখ বাধিয়ে ফেলে, মরেছেও তো অনেক এই করে। স্তন বলতে কিছু নেই, উরুতে মাংস নেই, জীবিত কঙ্কাল সব। শুনে মনে জোর পেয়েছে নীলা। নিজে সে এমন আঁটো জামা পরে উরু খুলে বেশ নিশ্চিন্তে বাইরে বেরোয়। ফরাসি পুরুষেরা, নীলা লক্ষ করে, মেয়েদের পা আর উরুর দিকে তাকায় বেশি, যদি তাকায়। ভারতীয় ছেলেদের চোখ পড়ে মেয়েদের স্তনে। স্তন শাড়ির আড়ালে থাক কি ওড়নার আড়ালে থাক, বা ঢিলে পোশাকের তলে থাক, চোখ আগে যাবেই ওদিকে। পা, সে যত সুডোল হোক, মসৃণ হোক মেয়েদের, ভারতীয় পুরুষের কাছে এ বিদঘুটে বিশ্রী জিনিস। পুরুষের যৌনবোধ দু দেশে ভিন্ন রকম। নীলা মাঝে মাঝে ভেবে পায় না, কেন। ভারতে যে মোটা তাজা শরীরকে ভাল স্বাস্থ্য বলা হয়, তা এখানে অসুস্থ বলে বিবেচিত। অসুস্থ কারণ মেদহীন নয় শরীর। নীলাকে কলকাতার লোকেরা বলে, হাড়গিলে মেয়ে। আর প্যারিসে, দিব্যি তাকে বলা হয় ভাল স্বাস্থ্যের মেয়ে, অবশ্য ক্যাথারিন নীলাকে এক বা দু কিলো ওজন কমালে ভাল দেখাবে বলেছিল।
দুপুরের খাবার খেতে দুজন কার্তে লাতায় এক ব্রাসারিতে ঢোকে। এই এক মজা প্যারিসে, যেখানেই হাঁটো, যে রাস্তাতেই, ক্যাফে পাবেই, রেস্তোরাঁ পাবেই। রেস্তোরাঁয় নীলা শুধু সালাদ চাইল খেতে।
কী ব্যাপার, তুমি ওই হাড়গিলে মেয়েদের মতো হতে চাও নাকি?
খানিকটা যে চায় না নীলা তা নয়। পেটের ওই চিকন মেদ, মাঝে মাঝে আশঙ্কা হয়, না আবার বেড়ে যায়। রাস্তায় বেটপ আকারের শরীর দেখেনি সে তা নয়। বেশির ভাগই, নীলা দেখেছে, একা। বোধহয় বেনোয়া একদিন বলবে, ধুর কী শরীর বানিয়েছ বলো তো। পাসকালের ওজন, কম করে হলেও নীলার চেয়ে পাঁচ কিলো কম, নীলার বিশ্বাস।
রেস্তোরাঁয় বসে ওই সালাদই খেতে খেতে নীলা জিজ্ঞেস করে, তুমি এমন ভাল বিজ্ঞানের ইস্কুলে পড়েছ, তুমি গণককে বিশ্বাস করো কেন? লোকটি তো ভণ্ড।
না জেনে মানুষকে ভণ্ড বোলো না নীলা। কী করে সে আমার বয়স, পাসকালের নাম, জ্যাকলিনের অসুখের কথা জানল বলো?
নিশ্চয় কারও কাছ থেকে খবর নিয়েছে।
না। আমার এক সহকর্মীর ভাইয়ের বন্ধুর বোন গিয়েছিল জঁ জ্যাকের কাছে। সহকর্মীটি কোনওদিন যায়নি। সে কেবল ঠিকানা জোগাড় করে দিয়েছে। আর ওর ভাই বা ভাইয়ের বন্ধু কেউ আমাকে চেনে না।
রাদেভুঁ নেওয়ার সময় তোমার নাম তো বলেছ। সে এই নামের লোকের তথ্য কোথাও থেকে বের করেছে।
প্যারিসে সম্ভবত কয়েক হাজার বেনোয়া দুপঁ আছে। জঁ জ্যাক পারিসের লোকও নয়। দেখলে না মারসেই-এর উচ্চারণে ফরাসি বলছিল সে। বেনোয়া নীলাকে ঠকিয়ে দিয়ে বলে।
এদের চর থাকে, জানো তো! চর খোঁজ দেয় কে আসছে দেখা করতে, কোথায় বাড়ি, কী করে, কী অসুবিধে সব। আর অন্য উচ্চারণে কথা বলা, এ তো কোনও ব্যাপারই নয়।
বেনোয়া সবেগে মাথা নাড়ে দুপাশে। না।
বাইবেলেই আছে এসব কথা। এলিশা সিরিয়ার রাজার যুদ্ধ পরিকল্পনা জানতে তার শোবার ঘরে ঢুকেছিলেন। জনদার্ক কে তো জানো, তার তো অশরীরী কিছুর সঙ্গে দেখা হত। অশরীরী কিছুই আগাম বলে দিয়েছিল, কোন তরবারি দিয়ে যুদ্ধ করলে সে ইংরেজদের তাড়াতে পারবে। শাঁ আলফোনসুসের নাম শুনেছ? তিনি বলেছিলেন, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এই এই হবে, ঠিক তাই তাই হয়েছে, রোমে পোপের মৃত্যুশয্যায় তাঁর শরীর পাওয়া যাবে বলেছিলেন, পাওয়া গেছে। তুমি তো আবার সাহিত্য নিয়ে মাথা ঘামাও, হ্যামলেটের ব্যাপারটা দেখো, হ্যামলেটের সঙ্গে কি অপার্থিব কিছুর দেখা হয়নি? হয়েছে। আজ প্যানথিওঁতে ভিক্টর উগোর কফিন দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলে, জানো ভিক্টর উগো কী করতেন? অশরীরী আত্মার সঙ্গে দেখা করতেন। মস্ত মস্ত খাতায় লিখে রেখেছেন, ওদের সঙ্গে সংলাপগুলো। কিছু একটা কোথাও আছে। তা না হলে জগতের বড় বড় মনীষী, বিজ্ঞানী অলৌকিক ব্যাপারগুলোকে উড়িয়ে দিতেন, দেননি কিন্তু।
