বেনোয়াকে কোনও প্রশ্ন করার কোনও সুযোগ পায় না সে। হাসিমুখের লোকটি দুটো আসবাবহীন ঘর পেরিয়ে ছোট একটি প্রায় অন্ধকার ঘরে ওদের নিয়ে যায়, দুটো মোড়া মতো পাতা, আর একটি সোফা। সোফায় লোকটি বসে, অন্ধকারে তার লাল নাকের ডগা আর লাল দেখাচ্ছে না। মুখের হাসি নিবিয়ে ভারী গলায় বলে, আপনি তো বেনোয়া দুপঁ।
ঠিক।
জন্ম অরলেওঁয়।
ঠিক।
উনআশির অক্টোবরে।
ঠিক।
ছোটবেলা থেকেই গাঁট্টাগোট্টা ছিলেন।
ছিলাম।
এই মেয়েটির সঙ্গে দেখা হঠাৎ।
ঠিক।
মেয়েটিকে ভালবাসেন।
বাসি।
অথচ বউ আছে।
একটি কন্যাও।
কন্যার বয়স তো বেশি নয়।
তিন।
যান্ত্রিক স্বর বেনোয়ার।
জ্যাকলিনের তো একটা অসুখ আছে, না? জঁ জ্যাক একটি কলম মুখে নিয়ে মাথাটি কামড়াতে থাকে।
তীক্ষ্ণ চোখ। হঠাৎ বেনোয়ার মাথার ওপর আলো জ্বলে ওঠে। তীব্র আলো। সবুজ আলো। বেনোয়ার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে।
বেশ পুরনো অসুখ। জঁ জ্যাক আবার বলে।
হ্যাঁ, কানে।
কানে কম শুনছে তো!
বেনোয়া বলে, হ্যাঁ মাঝে মাঝে এরকম হচ্ছে।
বেনোয়াকে উদ্বিগ্ন দেখায়।
আপনার বউয়ের নাম কী? ফাবিয়ান? ফ্রাসোয়াজ? পাসকাল?
পাসকাল।
এই মেয়েটি, নীলার দিকে ফেরে জঁ জ্যাক, হবে এর সঙ্গে হবে, চালিয়ে যান। মেয়ে ভারতীয়, ভারতীয় মেয়েদের কাণ্ডজ্ঞান থাকে। যা করে বুঝে শুনেই করে। হুজুগে চলে না। হা হা।
জঁ জ্যাক হাসছে আর বেনোয়ার মাথার ওপর আলো নিবে যাচ্ছে।
একেবারে অন্ধকার হয়ে গেলে ঘর, বোমা ফাটার মতো শব্দ হয়।
বলুন কী অসুবিধে? হঠাৎ সেই তীব্র আলো আবার, এবারের আলোর রং লাল।
লাল আলোর নীচে বেনোয়াকে শ্মশানের ভূতের মতো দেখায়। গলার স্বর আরও যান্ত্রিক হতে থাকে।
বেনোয়ার একটি হাত নীলা নিজের হাতে নেয়। ঠাণ্ডা হয়ে আছে হাতটি।
আলকাটেল লোক ছাঁটাই করছে, তাই তো?
তাই।
এরিকসনএও তো চাকরি নেবার কথা ভাবছেন।
আবেদন করেছি।
আলকাটেলেই থাকতে চাচ্ছেন, তাই তো?
তাই। আমার পদোন্নতি হওয়ার কথা এখানে।
কিন্তু এখনও হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখছেন না। তাই না?
তাই।
লোকটি শার্টের বুক পকেট থেকে এক প্যাকেট তাস বের করে। সাফল দিয়ে টেবিলের ওপর উলটো করে বিছিয়ে দেয়।
বেনোয়াকে একটি তাস তুলতে হবে। কাঁপা হাতে তোলে সে ইস্কাপনের ছয়। তাসটি জঁ জ্যাকের দিকে বাড়াতেই বাতি নিবে যায়। ঘর শীতল নৈঃশব্দ্যে ডুবে যেতে থাকে। বেনোয়ার খাসের শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই ঘরে।
নীলা বলে, এসব কী হচ্ছে, চলো বেরোই।
বেনোয়া নীলার হাতে শক্ত চাপ দিয়ে শব্দ করে শশশশশশ।
লাল নয়, সবুজ নয়, অন্য একটি আলো জ্বলে ধীরে ধীরে। বেনোয়ার মাথার ওপর নয়, এবারের আলোটি জঁ জ্যাকের পায়ের কাছে জ্বলছে। কাঠের মেঝের ফাঁক দিয়ে। আগরবাতির গন্ধ ঘরের বাতাসে।
নীলার অস্বস্তি হতে থাকে।
বেনোয়া কপালের ঘাম মুছে আগের চেয়ে স্বাভাবিক হয়।
জঁ জ্যাক বেনোয়ার চোখে তীক্ষ্ণ তাকিয়ে বলে আজ সন্ধেয় এক কিলো ভুট্টার গুঁড়ো কোনও একটি জঙ্গলে ছড়িয়ে দেবেন। আর ঠিক এক সপ্তাহ পর, দু কিলো ভুট্টার গুঁড়ো একই রকম ভাবে অন্য এক জঙ্গলে ছড়াবেন। প্যারিসের ভেতরে জঙ্গলে চলবে কি না ভাবছেন তো? না, তা হবে না, যেতে হবে প্যারিসের বাইরে।
.
দু হাজার ফ্রাঁ লোকটির হাতে দিয়ে বেরোয় বেনোয়া। সিঁড়ির কাছে পৌঁছতেই নীলা হেসে গড়িয়ে পড়ে।
কী ব্যাপার হাসছ কেন?
তুমি গণকের কাছে গেছ?
বেনোয়া দ্রুত সিঁড়ি পেরিয়ে রাস্তায় নামে।
নীলা পেছন পেছন।
কী ওরকম চেঁচাচ্ছিলে কেন সিঁড়িতে। আর বোকার মতো হাসছিলে। বেনোয়া বিরক্ত কণ্ঠে বলে।
দু হাতে হাসি আড়াল করে নীলা বলে, তুমি এসবে বিশ্বাস করো?
নিশ্চয়ই। বেনোয়ার গম্ভীর স্বর।
মজা করছ। নীলা হাসে।
মজা না নীলা। অনেকে এই লোকের কাছে গেছে। ফল পেয়েছে।
তুমি বিশ্বাস করো যে তুমি ভুট্টার গুঁড়ো ছিটোলে আলকাটেল থেকে ছাঁটাই হবে না?
হয়তো হব না। বেনোয়া হাঁটা শুরু করে।
সামনে দাঁড়িয়ে পথ আগলে আবার জিজ্ঞেস করে নীলা, তুমি ছিটোবে গুঁড়ো?
পাশ কেটে হেঁটে যায় বেনোয়া, নিশ্চয়ই।
নীলা দাঁড়িয়েই থাকে, গলায় রঙিন স্কার্ফ জড়ানো ছিল, ঢিলে হয়ে খসে পড়ে।
হঠাৎ খেয়াল হয় যে বেনোয়া একা এগিয়ে যাচ্ছে, দৌড়ে বেনোয়ার কাছে পৌঁছে ওর হাতটি হাতের মুঠোয় নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলে কোথায় যাচ্ছ?
চলো তোমাকে প্যানথিওঁ দেখাব।
বেশ তো। আমি আবার ভাবছিলাম, তুমি বুঝি গুঁড়ো ছিটোতে যাচ্ছ।
বেনোয়া এর উত্তর দেয় না। তবে বলে তুমি এত বেখেয়ালি, কী বলব! যখন মাদমোজেল মাদমোজেল ডেকে পেছনে এক ভদ্রলোক নীলার স্কার্ফটি দু আঙুলে ধরে এগোতে থাকে।
প্যানথিওঁ। সতেরোশো চুয়াল্লিশ সনে পঞ্চদশ লুই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে, জীবন ফিরে পেয়ে এমনই উচ্ছ্বসিত ছিলেন যে শাঁ জনোভিভের উদ্দেশে একটি গির্জা বানাবেন বলে স্থির করলেন। নয়া ক্লাসিক্যাল ধরনে ফরাসি স্থপতি জ্যাক জার্মা কুড়ি বছর পর গির্জার কাজ শুরু করে দিলেন, কাজ শেষ হতে পঁচিশ বছর লাগল। কাজও শেষ হল, ফরাসি বিপ্লবও শুরু হল। বিপ্লবীরা তখন দেশের গির্জা ভেঙে দিচ্ছে সব, তবে এই শাঁ জনোভিভ গির্জাটিকে না ভেঙে, করা হল প্যানথিওঁ, যেখানে ফরাসি মনীষী আর দার্শনিক ফরাসি জাতির গৌরব, ঘুমোবেন। যাঁরা আগে থেকেই ঘুমিয়ে আছেন, কেবল তাঁরাই। ভিক্টর উগো, এমিল জলা, ভলতেয়ার, রুশো, মাদাম কুরি, পিয়ের কুরির কফিন মাটি খুঁড়ে তুলে এনে রাখা হল প্যানথিওঁতে। নেপোলিয়ন এটিকে আবার গির্জা করে দিয়েছিলেন, আঠারোশো ছয় সালে। আশি বছর প্যানথিওঁকে অপেক্ষা করতে হল, পুরোপুরি প্যানথিওঁ হতে। আশি বছরে আরও একবার অগির্জা হয়েছিল এটি, আরও একবার গির্জা। প্যানথিওঁর মেঘছোঁয়া উঁচু ডোম থেকে একটি দীর্ঘ পেণ্ডুলাম ঝুলছে, ফরাসি পদার্থবিদ লিও ফুকো উনিশ শতকের মাঝামাঝি যে পেণ্ডুলাম দেখিয়ে বলেছিলেন পৃথিবী নিজের অক্ষপথে ঘুরছে। মেঝের তলায়, পাতালে গেলে মন ধাধাঁনো সব ফরাসি গৌরব।
