কী ব্যাপার চললে নাকি? আমি তোমার জন্য রান্না করেছি। বাঙালি খাবার। বরগোন ওয়াইনও কিনেছি, তুমি পছন্দ করো বলে।
তুমি খাও ওগুলো।
তুমি না খেয়ে যাবে? ক্ষিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই তোমার। কী খেয়েছিলে দুপুরবেলা?
স্যান্ডুইচ।
স্যন্ডুইচে সারাদিন? এসো খাবে। নীলা হাত ধরে টানে বেনোয়ার। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বেনোয়া বলে, খাওয়া দাওয়া আমার কাছে বড় কোনও ব্যাপার নয়, এ তোমার কাছে বড় ব্যাপার। না খেয়ে মরে তো তোমার দেশে সব, তাই ভাতের চেয়ে মূল্যবান তোমার কাছে আর কিছু নেই।
.
বেনোয়া বেরিয়ে যাবার পর নীলা বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে। যে তীব্র সুখ তার জীবনে হঠাৎ এসেছিল, সে অনুভব করে, দূরে সরছে তা, নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
রাতে ঢাউস একটি বই নিয়ে সে সোফায় বসে। বেনোয়ার কথা আজ রাতে সে আর ভাববে না, নিজের জীবনের জটিল অঙ্কের কোনও সমাধান সে জানে না, তার চেয়ে হোমার ওয়েলসই ঢের ভাল, এতিমখানায় জীবন শুরু করেছিল হোমার, অস্পৃশ্য অদ্ভুত হোমার। নীলার নিজেকেও হোমারের মতো এতিম মনে হয়, কেউ তাকে নেয় না, কোথাও তার জায়গা হয় না।
অনেক রাতে ফোনের শব্দে নীলা লাফিয়ে ওঠে। এতিমখানা, হোমার ওয়েলস গড়িয়ে পড়ে মেঝেয়।
জ তেম নীলা।
এপাশে নীলা থামিয়ে রাখে জিভের ডগায় এসে যাওয়া মুয়া উসি।
কী করছিলে?
পড়ছিলাম।
কী পড়ছিলে?
তেমন কিছু না। আপেলের মদ বানায় এক বাড়িতে, সেখানে অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটে—
জানো, কী ঘটেছে আজ রাতে? বেনোয়া এমন স্বরে বলে, যেন পাসকালের সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।
কী ঘটেছে? উত্তেজিত নীলা।
আমি খাইনি।
ও।
আমার ইচ্ছে ছিল তোমার সঙ্গে খাব।
নীলা মেঝে থেকে এতিমখানার গল্প তোলে। শেষ পাতায় চোখ বুলিয়ে বইটি বন্ধ করে রাখে।
তুমি কি আমাকে ভালবাসো নীলা? বেনোয়া জিজ্ঞেস করে।
তুমি কি জানো না?
জানি। তবু শুনতে ভাল লাগে।
বেনোয়ার শুনতে ভাল লাগে বলে নীলাকে জ তেম বলতে হয়।
.
পরদিন সকালে বেনোয়ার স্পর্শে ঘুম ভাঙে নীলার। সাতসকালে বাড়িতে ঢুকেছে বেনোয়া। তার ইচ্ছে করে বেনোয়াকে বলতে, চলে যাও। তার একার জীবন সে একাই যাপন করবে। বেনোয়ার জিভ যখন খুঁজতে থাকে নীলার জিভ, খুঁজতে খুঁজতে গভীরে যেতে থাকে, খুঁজতে থাকে চেরিফল, ছাই সরিয়ে অমূল্য ধন পাবার মতো সে ফল মুখে নেয়, বেনোয়ার রোদ জ্বলা শরীর যখন উন্মাদের মতো খুঁজতে থাকে নীলার অতল সরোবর, সে সরোবরের জল যেন অমৃত পান করছে এমন করে পান করে, আর বেনোয়ার মেদহীন মাংসল শরীরের নীচে যখন নীলা সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে যায়, একার জীবন একা যাপন করার শক্তি লোপ পায় তার। নীলার মনে হতে থাকে কেবল পাসকালকে কেন, একশো মেয়েকে বেনোয়া এমন করে ভালবাসুক, ক্ষতি নেই। যদি বেনোয়ার শতভাগের একভাগ নীলা পায়, ছিটেফোঁটা সামান্য, এইই তার জন্য অনেক। যার কিছু নেই, তার যদি কিছু জোটে তবে আর পুরোটা পাইনি কেন বলে অভিমান করার অর্থ হয় না। বেনোয়াকে পুরোটা নিজের করে পাওয়ার যোগ্যতা তার নেই, সে জানে।
বেনোয়া সারাদিন নীলার সঙ্গে কাটাবে। কারণ পাসকাল চলে গেছে সারাদিনের জন্য তার এক বন্ধুর বাড়ি, গাড়ি নিয়ে গেছে, বেনোয়া মেট্রো করে এসেছে, রু দ্য রেন থেকে কভোঁসিওঁ, ওখান থেকে পরিচ্ছন্ন হাওয়ায় হেঁটে হেঁটে এখানে, রু দ্য ভুইয়েতে, পথে বুলনজেরি থেকে একটি বাগেতও নিয়ে এসেছে কিনে। বগলে একটি বাগেত আর হাতে একটি ওয়াইনের বোতল নিয়ে ফরাসিরা হেঁটে বাড়ি যায়, ঘামের গন্ধঅলা বাগেত ছিঁড়ে ছিঁড়ে বাড়িসুদ্ধ লোক খায়, এরকমই অভ্যেস এদের। মদ আর রুটি, প্রভু যিশুর রক্ত আর মাংস, এ না খেলে ধর্ম থাকে না, অন্তত ফরাসি ধর্ম।
বাইরে সূর্যকিরণ রেখে যারা ঘরে বসে থাকে, তাদের মতো হতভাগা আর নেই কেউ, বেনোয়া মনে করে। সুতরাং চলো চলো। বেনোয়ার সঙ্গে মহা আনন্দেই নীলা বেরোয়। কথা, প্রথম কার্তে লাতা, তারপর টইটই। কার্তে লাতার বাড়িতে কে থাকে? জঁ জ্যাক। জঁ জ্যাক মাত্র কদিনের জন্য এসেছে প্যারিসে, থাকে মারসেই-এ, মারসেইলেস, ফরাসি উচ্চারণে মারসেই। ফরাসিরা বেশির ভাগ অক্ষরই, বিশেষ করে লেজের দিকের অক্ষরগুলো উচ্চারণ করে না, গিলে ফেলে। এদের ভাষায় বর্ণ কম নেই, কিন্তু অর্ধেক বর্ণই খামোখা। বর্ণগুলো মুখে ব্যবহার করে না, কিন্তু শব্দের শেষে বসিয়ে দেয়, সম্ভবত বর্ণগুলো দিয়ে কী করবে তা বুঝে পায় না বলেই বসিয়ে দেয়, বর্ণে জং ধরল না, রইল। রইল কিন্তু রইল না। জঁ জ্যাক খুবই গুণী লোক। গুণী লোকের অভাব নেই এ দেশে, সুতরাং নীলা আর খুঁটিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করে না জঁ জ্যাকের গুণের কথা। বাড়ি থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি করে সোজা কার্তে লাতায় রু পিয়ের-এ মাদাম কুরির ছ তলা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থেকে ঘড়ি দেখে ঠিক এগারোটা পাঁচ বাজলে বেনোয়া ওপরে উঠে তিন তলার দরজায় কড়া নাড়ে। একটি লম্বা চুল দাড়িঅলা লোক দরজা অল্প খুলে বড় বড় চোখ করে আগন্তুকদের দেখে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়। মিনিট দুই পর অন্য একটি লোক, এ লোকের হাসি মুখ, দরজা হাট খুলে বিনীত ভঙ্গিতে বেনোয়া আর নীলার সঙ্গে হাত মেলায়। বেনোয়া নিজের পরিচয় দেয়। নীলা অনুমান করে এ বাড়ির কাউকে চেনে না বেনোয়া, জানে না কোন লোকটি জঁ জ্যাক। হাসিমুখের লোকটি আগন্তুকদের আমন্ত্রণ জানায় ভেতরে ঢুকতে। বেনোয়া নীলার হাত শক্ত করে ধরে আছে, নীলার হাতের ভেতর ঘামছে তার হাত। নীলার কৌতূহল হয় জানতে কী কারণে এই অচেনা লোকের বাড়ি এসেছে বেনোয়া।
