পারি, সে শিশু যদি চমৎকার হয়।
জ্যাকলিন যে চমৎকার নয় সে জানো কী করে?
জ্যাকলিন চমৎকার নয়, সে তো আমি বলছি না। জ্যাকলিন হয়তো খুব চমৎকার একটি মেয়ে, ওর সঙ্গে সম্ভবত ভাল বন্ধুত্ব হবে আমার। ওকে হয়তো ভালবাসব খুব। ভালবাসব ওকে, ও চমৎকার বলে, তোমার মেয়ে বলেই যে ওকে আমার ভালবাসতে হবে, এ ঠিক নয়। এ কৃত্রিমতা। জোর করে আর যাই হোক, ভালবাসা হয় না।
ধরো তোমার যদি একটা মেয়ে থাকত, তুমি কি চাইতে না ওকে আমি ভালবাসি, ওকে আমি আমার নিজের মেয়ের মতো ভালবাসি?
চাইতাম, কিন্তু তোমাকে জোর করতাম না।
আমি তাকে ভালবাসলে তোমার ভাল লাগত তো!
হ্যাঁ লাগত।
তবে বোঝো না কেন, জ্যাকলিনকে তুমি যদি ভালবাসো, তাহলে আমারও ভাল লাগবে। পরস্পরের কী ভাল লাগে, কী পেলে কী হলে আমরা খুশি হই, আমাদের তো তাই দেখতে হবে। তুমিও তো তাই দেখেছ! আমি হালকা সবুজ রং পছন্দ করি বলে, তুমি ওই রঙের জিনিস কিনেছ। কেনোনি? তোমাকে তো জোর করেনি কেউ!
নীলা বিছানা ছেড়ে যায়। তার মনে হয় বেনোয়া এরপর আবদার করবে পাসকালকে ভালবাসার জন্য। পাসকালকে নীলার ভালবাসতে হবে, কারণ পাসকাল বেনোয়ার বউ, ঈশ্বর যার সঙ্গে বেনোয়ার জুটি গড়ে দিয়েছেন, বেনোয়াকে ভালবাসলে পাসকালকেও ভালবাসতে হবে, না হলে নীলা হবে হিংসুটে কুচুটে একটি মেয়ে।
বেনোয়া হাত বাড়িয়ে নীলাকে কাছে টানে। বুকের ওপর নীলার মাথাটি রেখে দীঘল চুলের ঘ্রাণ নেয়, বলে, তুমি একটা বাচ্চা চাও না নীলা? একটা বাচ্চা, সারা ঘর জুড়ে খেলবে, আমরা দেখব, আমাদের বাচ্চা। ফুটফুটে, সুন্দর। তোমার জীবন পূর্ণ হবে, একটি শিশুর জন্ম দিয়ে। নিষ্পাপ একটি শিশু।
নীলা চোখ বোজে। একটি পুতুল পুতুল সাদা শিশু, সোনালি চুলের শিশু, মিষ্টি হাসির শিশু দৌড়ে আসছে নীলার দিকে মা মা বলে, শিশুটিকে কোলে তুলে নিচ্ছে সে, শিশুটি নীলার কোল থেকে ঝাঁপিয়ে বেনোয়ার কোলে যাচ্ছে, বুকে জাপটে ধরে বেনোয়া তাকে আদর করছে।
নীলার ইচ্ছে করে, এভাবে বেনোয়ার বুকের ওপর, এভাবে মাথা রেখে, দীর্ঘ বছর কাটিয়ে দিতে। বেনোয়া তার কানে কানে এভাবে একটি সন্তানের কথা বলবে। নীলাকে স্বপ্ন দেখাবে, যে স্বপ্ন নীলাকে বাঁচিয়ে রাখবে। নীলার আর আছে কী এ সংসারে!
তুমি ছেলে চাও?
যে কোনও, ছেলে হোক, মেয়ে হোক। বেনোয়া বলে। নীলার মুখটি তুলে চুমু খায়। বেনোয়ার নীল সাগরে নীলা হারিয়ে যেতে থাকে। কুল নেই কিনার নেই।
কিন্তু কী হবে সে ছেলে বা মেয়ের পরিচয়?
আমাদের ভালবাসার সন্তান। এই কি সবচেয়ে বড় পরিচয় নয়?
আমাদের তো বিয়ে হয়নি! বলে নীলা জানালায় তাকায়। জানালার ওপারে কিছু নেই, ঝাঁজালো রোদ্দুর শুধু।
তুমি তো একদিন বলেছ, তুমি বিয়েতে বিশ্বাসী নও, তুমি ভালবাসায় বিশ্বাসী। এখন হঠাৎ বিয়েতে বিশ্বাসী হয়ে উঠলে।
বেনোয়া নীলার মুখ নিজের দিকে ফিরিয়ে বলে, ভারতীয় রক্ষণশীলতা ঘৃণা করো বলেছ। এখন তো দিব্যি মেনে নিচ্ছ।
আমাকে কেন ভালবাসো বেনোয়া? তোমার বউ আছে বাচ্চা আছে, সুখের সংসার তোমার। খামোখা…নীলা ভাঙা কণ্ঠে বলে।
কেবল পাসকালকেই ভালবাসি তাই জানতাম। কিন্তু কী যে ঘটল আমার ভেতর। তুমি হঠাৎ আলোর ঝলকানি নিয়ে এলে। তুমি ছাড়া এখন আর উপায় নেই আমার, তোমাকে আমি চাই, তোমাকে আমার প্রয়োজন, তোমাকে আমি ভালবাসি। সারাদিন তোমার কথা ভাবি। রাতে ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠি তোমাকে স্বপ্ন দেখে। পাসকাল আজ সকালেও আমাকে বলেছে ঘুমের মধ্যে নাকি আমি নীলা নীলা বলে ডাকি।
বেনোয়ার দুবাহু থেকে আলগোছে নিজেকে সরিয়ে নীলা বলে, বলেছ, ও জানে আমার কথা!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেনোয়া, জানে। ও যে কী রকম কষ্ট পাচ্ছে এ আমি বুঝি। আমাকে কিছু বলে না। ওকে জানাবার পর আমাকে দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করেনি তোমার কথা। আমারও কষ্ট হয় ওর জন্য। কিন্তু কী করতে পারি আমি বলো। পাসকালকে ছাড়া আমার চলবে না, ও আমার জ্যাকলিনের মা। তোমাকে ছাড়াও আমার চলবে না, তুমি আমার বাঁধনছেঁড়া আবেগ। তুমি না হলে আমি একটি মৃত মানুষ।
নীলা উঠে রান্নাঘরে যায়।
নিবে যাওয়া কুঁচকে যাওয়া লাল চোখ বেনোয়ার উরুসন্ধিতে ঝুলে থাকে যখন সে রান্নাঘরে নীলার পেছনে দাঁড়ায়, কী হঠাৎ উঠে এলে যে!
চা করতে।
কিছু বলার নেই তোমার?
আমার মনে হয় বেনোয়া, আমাদের এই সম্পর্কটি বেশ জটিল হয়ে যাচ্ছে। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তুমি কাকে সত্যিকার ভালবাসো, কার সঙ্গে জীবন যাপন করতে চাও। অবশ্য তুমি বলছ যে দুজনকেই ভালবাসো। দুজনকেই তোমার চাই। কাল যদি দেখো যে আরও এক মেয়ে তোমার জীবনে হঠাৎ আলোর ঝলকানি নিয়ে এল, কী করবে? তাকেও নিশ্চয়ই চাই তোমার জীবনে, তাই না?
আমি আর কাউকে ভালবাসতে পারব না। বেনোয়ার উদাস স্বর।
আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে তো তুমি পাসকালকে তাই বলতে, বলতে না? নিশ্চয়ই বলতে যে ওকে ছাড়া আর কাউকে ভালবাসবে না। তারপর কী হল, আমাকে বললে আমাকে ভালবাসো। অবশ্য জানি না এ সত্যিই ভালবাসা না কি অভিনয়। বাড়তি একটি শরীর ভোগ করার সুযোগ তুমি ছাড়তে চাও না তাই। ভুলিয়ে ভালিয়ে…একটি বোকা মেয়েকে…
ছি নীলা ছি।
বেনোয়া দ্রুত সরে যায়, শোবার ঘরে ঢুকে কাপড়চোপড় পরে নেয়। নীলা যখন চা নিয়ে ঘরে ঢোকে, বেনোয়া জুতোর ফিতে বাঁধছে।
