.
পাসকাল নামের এক অদৃশ্য আততায়ীর উত্তপ্ত শ্বাস নীলার সারা গা পোড়াতে থাকে।
.
পাঁচটা থেকে সাতটা
পরের সপ্তাহে প্রতিদিনই বেনোয়া বিকেল পাঁচটায় আসে নীলার বাড়িতে, সাতটায় চলে যায়। যেতে হয়, কারণ পাসকালের সঙ্গে তার রাতের খাবার খেতে হবে। যেতে হয়, কারণ জ্যাকলিনের সঙ্গে তার ভূত ভূত খেলতে হবে। কোনওদিন আবার ওদের নিয়ে রেস্তোরাঁয় যেতে হয়, কোনওদিন বন্ধুর বাড়ি নেমন্তন্ন।
নীলা সারাদিন বাড়িতেই থাকে। কোথাও যাবার নেই তার। বেনোয়া পাঁচটায় আসবে এই অপেক্ষায় তার সারাদিন কাটে। আর সন্ধেয় বেনোয়া চলে যাবার পর সারা শরীরে বেনোয়ার গন্ধ স্পর্শ আগলে রেখে বাকি রাত কাটায় সে।
শুক্রবার বিকেলে বেনোয়া এসে যখন প্রতিদিনকার মতো চুমু খেতে যায়, নীলা সরিয়ে নেয় নিজেকে।
কী ব্যাপার, হল কী তোমার?
পাসকালকে কি এভাবেই চুমু খাও?
এসব জিজ্ঞেস করছ কেন? তুমি তো সব জেনেই আমাকে ভালবেসেছ। তুমি তো জানতেই যে আমি বিবাহিত।
নীলা অস্বীকার করতে পারে না। সে অস্বীকার করতে পারে না সব জানার পরও তার ইচ্ছে করে বেনোয়ার চুমুতে অবশ হতে, ইচ্ছে করে বেনোয়ার বেনো জলে ভাসতে, ডাল পাতা ভেঙে নেওয়া ভীষণ ঝড়ের কবলে পড়তে।
আর বেনোয়া সেই ঝড়ের দূত হয়ে নীলার শরীরে ঝুঁকতেই নীলা সরে যায়। জিজ্ঞেস করে, তুমি কি পাসকালের সঙ্গে এসব করো?
বেনোয়া দুহাত ছড়িয়ে চিত হয়ে শুয়ে পড়ে। ওর নীল চোখ দুটো পাপড়িতে ঢাকা, কেবল শিশ্নের লাল চোখ আকাশপানে।
নীলা অপেক্ষা করে বেনোয়ার উত্তরের।
তুমি কি জানো না যে আমি পাসকালকে ভালবেসে বিয়ে করেছি?
জানি।
তবে কেন এসব জিজ্ঞেস করো।
তোমাকে কারও সঙ্গে ভাগ করতে আমার কষ্ট হয়।
নীলা, এত স্বার্থপর তুমি!
নীলা দমে যায়। সে টের পায় নিজের স্বার্থপরতা।
একবার পাসকালের কথা ভাবো, ও আমাকে ভালবাসে।
তুমিও তো ওকে ভালবাসো, তাই না?
শোনো নীলা, আমি মিথ্যে বলি না। অন্য যে কোনও বিবাহিত পুরুষ তার প্রেমিকাকে বলে আমি আমি আমার বউকে ঘেন্না করি, কেবল তোমাকেই ভালবাসি। কিন্তু, নীলা, আমি এ নিয়ে ভেবেছি অনেক, কাকে আমি ভালবাসি, তোমাকে না পাসকালকে। আমি, সত্যি কথা, দুজনকেই ভালবাসি।
দুজনকে ভালবাসা যায়?
যাবে না কেন? নিশ্চয়ই যায়।
আমি তো কল্পনা করতে পারি না অন্য কোনও পুরুষকে ভালবাসার, তার সঙ্গে শোয়ার!
কিছু কিছু বাস্তবতার মুখোমুখি না হলে সেগুলো কল্পনারও অতীত থেকে যায়। লাল চোখ জানালাপানে। তুমি বুঝবে না নীলা, তুমি ভালবেসে বিয়ে করোনি, তোমার কোনও সন্তান নেই। তোমার পক্ষে বোঝা সম্ভবও নয়।
বেনোয়া ওভাবেই উলঙ্গ উঠে গিয়ে মেঝেয় ফেলা প্যান্টের পকেটে থেকে ওয়ালেট বের করে আনে।
ওয়ালেটের ভেতরের খোপ থেকে চারটে রঙিন ছবি বের করে, জ্যাকলিন আর পাসকাল, জ্যাকলিন চুমু খাচ্ছে পাসকালের গালে, আর একটিতে বেনোয়া পেছন থেকে পাসকালকে জড়িয়ে ধরে আছে, পাসকাল হাসছে, পাসকালের কোলে বসে হাসছে জ্যাকলিন। আর একটিতে পাসকাল আর বেনোয়া। আরেকটি একা জ্যাকলিন, দু বছর আগের। ছবিগুলো নীলা দেখে, নীলার চেয়ে বেশি সময় নিয়ে দেখে বেনোয়া। লাল চোখ বুজে আসতে থাকে।
দেখো, জ্যাকলিন দেখতে ঠিক আমার মতো হয়েছে, ঠিক না?
নীলা অনেকক্ষণ দেখেও সামান্য মিল খুঁজে পায় না দুটি মুখে।
দেখো, ওর নাক, একেবারে আমার নাক যেন বসিয়ে দেওয়া।
তাই কি? ওর নাক তো ছোট। নীলা আস্তে বলে।
তা ছোট! কিন্তু বড় হতে কদিন।
কানদুটো দেখো তো! কান প্রসঙ্গে নীলা আর কিছু বলে না, জ্যাকলিনের কান বড় হয়ে বেনোয়ার কানের মতো হতে আর কতদিন।
তোমার চুল তো সোনালি, ওর চুল কেমন লালচে লাগছে না!
পাসকালের চুল লাল তো, তাই। কিন্তু পাসকাল বলেছে, জ্যাকলিনের চুলের রং নাকি লাল আর থাকছে না, ধীরে ধীরে সোনালি হচ্ছে।
ও।
কী অদ্ভুত সুন্দর জ্যাকলিন, দেখেছ!
নীলা ছবিটি হাতে নেয়, লাল ফুটিতে গাল ভর্তি, ফিনফিনে কটি লাল চুল মাথায়, হাসিতে লাল মাড়ি বেরিয়ে আছে, আর দুটো পোকা খাওয়া দাঁত।
হ্যাঁ দেখেছি। নীলার নিরুত্তাপ স্বর।
পৃথিবীতে এত সুন্দর আর কোনও শিশু নেই নীলা, নেই।
ছবিটি বুকের ওপর নিয়ে বেনোয়া তৃপ্তির হাসি হাসে।
আমার বেঁচে থাকার কারণ হচ্ছে জ্যাকলিন। আমার জীবনের যদি কোনও অর্থ থাকে সে জ্যাকলিন।
চকিতে উঠে, বেনোয়া প্রশ্ন করে, জ্যাকলিনকে তোমার দেখতে ইচ্ছে করে না?
নীলা ঠিক বুঝে পায় না কী উত্তর সে দেবে। জ্যাকলিন তার কাছে আর যে কোনও শিশুর মতো। দল বেঁধে সাদা শিশুদের নীলা প্রায়ই দেখে বাসে চড়ে মাস্টারদের সঙ্গে জাদুঘর দেখতে যাচ্ছে। এদের যে কোনও একটি শিশুই জ্যাকলিন।
জ্যাকলিন আমার অস্তিত্বের একটি অংশ নীলা, আমাকে যদি ভালবাসো, জ্যাকলিনকেও তোমার ভালবাসতে হবে।
জ্যাকলিনের সঙ্গে আমার কখনও দেখা হয়নি। ভালবাসা তো আকাশ থেকে গড়িয়ে নামে না, যে কোনও সম্পর্কই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। নীলা শান্ত কণ্ঠে বলে।
একটি দুধের শিশুকে তুমি ভালবাসতে পারো না নীলা, ছি। মানুষ তো যে কোনও শিশুকে ভালবাসে। তুমি হিংসে করো জ্যাকলিনকে!
বাজে কথা বোলা না তো। জ্যাকলিনকে আমি হিংসে করতে যাব কেন!
তাই তো অবাক হচ্ছি, একটি শিশুর সঙ্গে তো তোমার কোনও বিরোধ নেই। তুমি তো অনায়াসে একটি শিশুকে ভালবাসতে পারো। পারো না?
