পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে নীলা বলে, নিশ্চয়ই।
রান্নাঘরের দরজায় হেলান দিয়ে বলে, তবে কী জানো, কফি আমি বানাতে জানি না।
বেনোয়া নিজেই কফি বানাতে শুরু করে। নীলা পাশে দাঁড়িয়ে বলে, আমি হলাম চা খোর, তুমি তো জানোই।
নীলা শিখে নেয় কী করে মেশিনে কফি বানায়, বেনোয়া বলে বলে দেয়। প্রথম ফিল্টার দেবে, তারপর কফি, তারপর এদিকটায় জল, ফিল্টার চুঁইয়ে চুঁইয়ে কফি এসে তলে জমা হবে।
খাবার টেবিলে কফি নিয়ে বসে বেনোয়া, নীলা নিজের জন্য এক কাপ চা করে নিয়ে মুখোমুখি বসে। চোখ হাসছে তার, ঠোঁট হাসছে। বেনোয়া চামচে কফি নাড়তে নাড়তে বলে, আচ্ছা তুমি টম ক্লেন্সির বই পড়েছ?
না।
স্টিভেন কিং?
না।
এড ম্যাকবেইন? টরি ব্রুকস?
না।
তারপর ধরো, বেনোয়া সময় নেয়।
নীলা বলে, আসলে বিদেশি সাহিত্য আমি বেশি পড়িনি। বেশির ভাগই বাংলা।
এলমোর লেনার্ড?
না।
জর্জ সিমেনো?
না।
ডেভিড এডিংস?
না।
বেনোয়া কফিতে চুমুক দেয়।
টেরি প্র্যাটচেট পড়েছ?
নীলা শুকনো মুখে বলে, না পড়িনি।
তুমি টেরি প্র্যাটচেটের বই পড়নি?
না।
বলো কী? এত বিখ্যাত লেখকের বই পড়নি।
দু একটা নাম বলো তো!
জাদুর রং, পিরামিড, মজার সময়, আত্মার সংগীত।
নীলা মাথা নাড়ে।
নামও শোনোনি?
না।
বই পড়তে ভালবাসো, অথচ, ঠিক আছে ভেবো না, তোমাকে আমি টেরি প্র্যাটচেটের বই দেব কিছু।
বেনোয়া আরও কফি ঢেলে নেয় কাপে।
কী ধরনের উপন্যাস লেখেন তিনি? নীলা খালি চায়ের কাপ সামনে নিয়ে বসে থাকে।
সে কী বলব, তুমি যদি শুরু করো, শেষ না করে উঠতে পারবে না।
এমনই?
হ্যাঁ এমনই।
বেনোয়ার চোখ হাসে, গা হাসির দমকে কাঁপে, সে কাঁপুনিতে কফির কাপ নড়ে ওঠে, ছলকে কফি পড়ে টেবিল ভিজিয়ে দেয়। বেনোয়া খেয়াল করে না, বলে যায় পৃথিবী হচ্ছে, বুঝলে, চেয়ার সরিয়ে হঠাৎ উঠে যায়, দৌড়ে শোবার ঘরের দিকে, ফিরে আসে হাতে একটি সি ডি নিয়ে, বসে, হেসে, বলে, এর মতো দেখতে।
মানে?
পৃথিবীর আকার আকৃতি এর মতো। তবে এত ছোট নয়, অনেক বড়।
নীলা হাত বাড়িয়ে ফলের ঝুড়ি থেকে একটি কমলালেবু হাতে নিয়ে বলে, পৃথিবী তো জানি এটির মতো দেখতে।
ধ্যুৎ, নীলাকে থামিয়ে, শোনোই না তারপর। চারটে বিশাল হাতির কাঁধে এই পৃথিবীটা। চারটে হাতি আবার দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল কচ্ছপের ওপর, কচ্ছপটি শূন্যে ভাসছে।
কমলালেবুর খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে, বেনোয়ার তখনও শেষ হয়নি গল্প, নীলা বলে, তুমি এসব বিশ্বাস করো?
বিশ্বাসের কিছু নেই। এ গল্প, মজার গল্প।
এরকম মজার গল্প আমি অবশ্য ছোটবেলায় পড়েছি। ঠাকুরমার ঝুলি।
কী ঝুলি?
ঠাকুরমার ঝুলি!
এ আবার কী?
এ বাচ্চাদের গল্পের বই। অবশ্য বাংলায়।
বাংলায়, সে বলো। বেনোয়া জোরে হাসে। বাংলা বই সম্পর্কে জানার কোনও কারণ আমার নেই।
.
নীলা দুটো হাত টেনে নেয় বেনোয়ার। বলে, দেখবে না আর কী অপেক্ষা করছে তোমার জন্য?
বেনোয়া ঠাণ্ডা গলায় বলে, কী?
ময়েট এ শ্যানডন শ্যাম্পেন এনে সে হাতে দেয় বেনোয়ার।
নতুন বাড়িতে প্রথম যা করতে হয়, শ্যাম্পেনে ভেসে যাওয়া। কী বলো?
গাড়ি চালাতে হবে, এ সময় মদ খাওয়া ঠিক হবে না।
নীলা চমকায়। বেনোয়াকে এত সতর্ক হতে আগে কখনও দেখেনি সে।
তুমি তো মদ খেয়েও গাড়ি চালাও।
হয়তো চালিয়েছি, কিন্তু উচিত না।
আজ এ নতুন বাড়িতে, শ্যাম্পেন খুলতে গিয়ে উচিত অনুচিত দেখছ! আরে খোলো তো শ্যাম্পেন, কিছু হবে না।
নীলা দুটো শ্যাম্পেনের গেলাস সামনে রাখে।
বেনোয়া বড় শ্বাস ফেলে, তুমি চাইছ, খুলতে তো হবেই।
মলিন মুখে বেনোয়া শ্যাম্পেন খোলে। সশব্দে উপচে পড়ে ফেনা। নীলার উল্লাসধ্বনি সেই শব্দকে ম্লান করে দেয়।
শ্যাম্পেনের গেলাস হাতে নীলা বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। বেনোয়াও।
কী চমৎকার হাওয়া বইছে তাই না?
হ্যাঁ বইছে অথবা না বইছে না শব্দগুলোর আগে ফোনের শব্দ হয়, বেনোয়ার পকেটে। কথা বলতে সে ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। নীলা দাঁড়িয়েই ছিল, ফুরফুরে হাওয়ায় চোখ বুজে। ফিরে এসে বেনোয়া বলে, পাসকাল কাল প্যারিসে ফিরছে।
হাতে শ্যাম্পেনের গেলাস নড়ে ওঠে, নীলা দ্রুত চুমুক দেয় গেলাসে।
শ্যাম্পেনটা বেশ ভাল, তাই না?
নীলা, পাসকাল কাল প্যারিসে ফিরছে।
শুনেছি।
শুনেছ, কিছু বলবে না?
আমি কী বলব, বলো।
তুমি কি জানো পাসকালকে আমি আমাদের কথা সব বলেছি!
না তুমি বলোনি আমাকে।
এখন বললাম, পাসকাল আমাদের সম্পর্কের কথা জানে।
তো আমাকে কী করতে হবে, বলো।
তুমি কি জানো, আমার আর পাসকালের একটি মেয়ে আছে, নাম জ্যাকলিন?
জানি।
তুমি কি অনুমান করতে পারছ পাসকালের জন্য আমাদের এ সম্পর্ক মেনে নেওয়া অসম্ভব একটি ব্যাপার!
গেলাসে আরও শ্যাম্পেন ঢালতে নীলা ভেতরে যায়। পেছন পেছন বেনোয়া।
কী ব্যাপার উত্তর দিচ্ছ না যে!
নীলা শ্যাম্পেন ঢালে নিজের গেলাসে। বেনোয়ার গেলাসে ঢালতে গেলে, সরিয়ে নেয় সে গেলাস, টেবিলে শব্দ করে রেখে দেয়।
কাঁধ ধরে ঝাঁকায় সে নীলার, কিছু বলছ না কেন? তুমি কি বোবা হয়ে গেলে হঠাৎ, এতক্ষণ তো বেশ কথা বলছিলে? বাড়ি ঘর দেখালে, কত দামি জিনিস কী কী কিনেছ সব দেখালে। এখন বলো!
.
নীলা বসে ঢকঢক করে জল পান করার মতো শ্যাম্পেন পান করে, করে বেনোয়ার চোখে তাকায়। সেই চোখে, সেই নীল চোখে, তার ভালবাসার চোখে।
