বেনোয়া গলা উঁচু করে, তুমি কি পাগল হয়েছ? আমি তোমাকে বেরিয়ে যেতে বলব কেন?
বলোনি, বলতে তো পারো। আমিও পারি। পারি না?
তুমি কি আমাকে চলে যেতে বলছ?
সোফার হাতলে বসে বেনোয়াকে জড়িয়ে ধরে বলে সে
না। মোটেই না। আমি সারাক্ষণ তোমাকে চাই। দিনেও যেমন চাই, রাতেও চাই। জেগে যখন থাকি, চাই, ঘুমোই যখন, চাই।
বেনোয়া চারদিক তাকিয়ে বলে, তুমি কি লটারি জিতেছ নাকি?
হালকা সবুজ পর্দা জানালায়, হালকা সবুজ সোফার রং, বিছানার চাদরও হালকা সবুজ রঙের।
তোমারও বুঝি হালকা সবুজ রং পছন্দ।
নীলা হেসে বলল, না, আমার পছন্দ নীল রং।
তবে সব হালকা সবুজ কেন?
সে তোমার পছন্দ বলে।
বেনোয়া ঠোঁট কামড়ে মিষ্টি হাসি হাসে।
তর্জনীতে বেনোয়ার ঠোঁট ছুঁয়ে নীলা বলে, বাসলে আমি এভাবেই বাসি ভাল, একশো ভাগ।
তুমি কি জাদু জানো নাকি! এই কদিনে কী কাণ্ড করে ফেললে বলো তো।
নীলা তুড়ি বাজায়। তুড়ি বাজালেই সব হয়।
অবশ্য টাকা থাকলে দুদিনে কেন দু মিনিটে সব হয়। বেনোয়া বড় শ্বাস ফেলে।
উঠে সে শোবার ঘরে যায়, কোমরে হাত রেখে হালকা সবুজ বিছানা, বিছানার দু কিনারের দুটো টেবিল, টেবিলের ওপর দুটো ঢাকনাঅলা বাতি, দেয়াল জুড়ে কাঠের আলমারি দেখে আর জিভে চুক চুক করে, ইকিয়া থেকে কিনলে খুব সস্তায় কেনা যেত। অপেক্ষা করলে পারতে। আমি তোমাকে নিয়ে যেতে পারতাম ইকিয়ায়।
টোকা মেরে খাটের, টেবিলের, চেয়ারের, আলমারির কাঠ পরখ করেও চুক চুক করে, এসব তো ভাল কাঠের দেয়নি। তুমি রীতিমতো ঠকেছ। কোত্থেকে কিনেছ?
হাবিতাত।
হাবিতাত কোনও দোকান হল? বাজে জিনিসপত্র সব। এসব কেনার আগে আমাকে জিজ্ঞেস করবে না! উফ। কী যে বোকামো করো তুমি!
বেনোয়ার হাত টেনে আলমারির কাছে এনে নীলা বলে, খোলো এটা, দেখো। বেনোয়া খুলে বলল, এটা কত দিয়ে কিনেছ? নিশ্চয় এ টাকায় অন্য দোকানে আরও ভাল পেতে।
ভেতরে দেখো কী আছে?
বেনোয়া দেখল, ছেলেদের জামাকাপড়, এমনকী জুতো, শেভিংএর জিনিসপত্র, অডি তয়লেত।
কার এসব?
অনুমান করো তো!
কিষানের?
প্রশ্নই ওঠে না।
তা হলে কার?
অনুমান করো।
সুনীলের?
সুনীলের জিনিসপত্র এখানে থাকবে কেন?
তবে কার?
অনুমান করো।
পারছি না।
নীলা হাসে, বেনোয়ার বুকে আঙুল বুলিয়ে নিবিড় কণ্ঠে বলে, তোমার।
নীলা, তোমার কি মাথা টাথা খারাপ হয়েছে? খেঁকিয়ে ওঠে বেনোয়া।
কেন?
আমার তো সব আছে এগুলো। ধপাস করে সে বসে বিছানায়। হালকা সবুজ বিছানায়। তার পছন্দের রঙের বিছানায়।
তাতে কী! তবে জুতো নিয়ে খানিকটা সন্দেহ আছে। দেখো তো এ জুতো পায়ে লাগে কি না। কালো একজোড়া ইতালিয়ান জুতো প্যাকেট খুলে বেনোয়ার পায়ের কাছে রেখে বলে নীলা।
জুতো? মাপ কী?
মাপ জানি না, চোখের অনুমানে মনে হল এ হবে তোমার।
বেনোয়া জুতোর পেছনে নম্বর দেখে সরিয়ে রাখে জুতো, না এ আমার মাপের নয়।
এসব তুমি আমার জন্য কিনেছ? কেন? বেনোয়ার প্রশ্ন, পনেরো ভাঁজ কপালে, চোখে।
বেনোয়ার পাশে ঘন হয়ে বসে কাঁধে মাথা রেখে নীলা বলে, তোমাকে ভালবাসি, তাই।
.
আরও একটি চমক এখনও বাকি। নীলা যখন শেষ ঘরটিতে বেনোয়াকে নিয়ে গেল, বইয়ের তাকে সারি সারি বই, টেবিলে কম্পিউটার।
বেনোয়া চোখ নাচিয়ে বলে, তুমি বুঝি কম্পিউটারও ব্যবহার করবে?
না, যন্ত্রে আমি মোটেও অভ্যস্ত নই, এ তোমার জন্য।
আমার জন্য? আমার তো কম্পিউটার আছে। বেনোয়া শব্দ করে হাসার চেষ্টা করে।
তা জানি, আছে।
রিভলভিং চেয়ারে বসে বৃত্তাকারে নিজেকে ঘোরাতে থাকে বেনোয়া। গোলাপের কিনার থেকে দুটো কালচে পাতা সরিয়ে নিতে নিতে নীলা বলে, এ বাড়িতেও যদি ইচ্ছে হয় তোমার কম্পিউটার ব্যবহার করতে!
কত গিগাবাইট এতে?
তা জানি না।
র্যাম কত আছে তা জানো?
তাও জানি না। বেনোয়া আবারও জিভে চুক চুক শব্দ করে।
নীলা চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে বেনোয়ার চুলে আঙুল ডুবিয়ে দেয়, চুমু খায় ঘন সোনালি চুলে।
তোমার পছন্দ হয়নি?
আচ্ছা তুমি যে এটি কিনলে, বোতাম টিপে কম্পিউটার চালু করে, বলে বেনোয়া, তুমি কি আমার চেয়ে কম্পিউটার ভাল জানো?
আমি তো তা বলছি না আমি তোমার চেয়ে বেশি জানি। তুমি ব্যবহার করবে বলে কিনলাম। নীলা মিষ্টি হেসে বলে।
আমি তো এই ধরনের কম্পিউটার ব্যবহার করি না। খামোকা টাকা খরচ করলে। আবার চুক চুক।
টাকা খরচের কথা ভেবো না। কোন ধরনের পছন্দ করো বলো, আমি এটা পালটে নেব।
তুমি বললেই ওরা পালটে দেবে নাকি? বেনোয়ার কপালে চোখের কোণে সেই পনেরো ভাঁজ।
ঠিক আছে কম্পিউটার তোমার পছন্দ হয়নি, ফুলগুলো?
নীলা ঘ্রাণ নেয় গোলাপের। ফুলগুলো দেখতে ভাল, বেনোয়া বলে কিন্তু ঘ্রাণ নিতে এগোয় না। ফুল পশ্চিমিদের কাছে বেশির ভাগই দেখার জিনিস, ঘ্রাণ শোঁকার নয়, নীলার মন বলে।
এসব বই প্যারিস থেকে কিনেছ? বইয়ের তাকের কাছে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে বেনোয়া।
কিছু এখান থেকে, কিছু কলকাতা থেকে আনা।
সব তো দেখছি ক্লাসিক।
সব নয়। কিছু। নিজের একটি বাড়ি হবে, নিজের একটা বইয়ের ঘর হবে, এ শখ আমার অনেক দিনের।
ইউলিসিস-এর দিকে আঙুল তুলে, ওটা পড়েছ।
নীলা ঠোঁট ওলটায়, কোনওদিনই কুড়ি পাতার বেশি পড়তে পারি না, সম্ভবত পারবও না।
বেনোয়া উঠে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলে, কফি খেতে হবে আমার, আছে?
