ঘরগুলোর সব জানালা দরজা খুলে দিয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে থাকে নীলা। হু হু করে হাওয়া ঢোকে ঘরে, বারান্দার রেলিঙে একটি একা পাখি এসে বসে, পাখিটি বিষ্ঠা ত্যাগ করে উড়ে যায়। সুনীলের পাওনা সে মিটিয়ে দিয়েছে, নীলার মনে হতে থাকে, সুনীলও সম্ভবত তার পাওনা মিটিয়েছে। সুনীলকে অমনই দেখিয়েছে, দেনাপাওনা শোধ হবার পর লোকের ঠোঁটের কোণে প্রশান্তি ঝিলিক দেয় যেমন।
নীলার বমি হয়ে যায় যা খেয়েছিল শে লুলুতে।
৬. নতুন জীবন
জীবনের কী মূল্য আছে, জীবন যদি যে কোনও সময় ফুরিয়ে যায়, যে কোনও মুহূর্তে মলিনার মতো ফুরিয়ে যায়।
.
নীলা জানে জীবনের কোনও অর্থ নেই। জেনেও সে হাবিতাত থেকে, ফন্যাক, বি এইচ ভি থেকে, গ্যালারি লাফায়েত থেকে ঘর সাজাবার জিনিস কেনে। প্রয়োজনের তো বটেও, প্রয়োজনের বাইরেও অনেক। টাকা থাকলেও বাড়ি ভাড়া হয়তো পাওয়া যায় না, কিন্তু বাড়ি সাজাবার যা কিছু আছে, সবই পাওয়া যায়। বালিগঞ্জের বাড়িটি মলিনা কখনও পছন্দ মতো সাজাতে পারেননি। সোফা কোথায় বসবে, বিছানাগুলো জানালার কাছে না কি দেয়ালের কাছে, কোন আলমারি কোনদিকে, খাবার টেবিল এদিকে না কি ওদিকে, এসব সিদ্ধান্ত সব অনির্বাণই নিতেন। এমনকী রান্নঘরের সিদ্ধান্তও। আজ খিচুড়ি হবে নাকি সাদা ভাত হবে, মাংস হবেনা মাছ হবে, মাছ হলে মাছের সঙ্গে কি আলু যাবে না পটল, তাও। মলিনা ছিলেন আদেশ পালন করার জন্য। অনির্বাণ বুঝিয়ে দিতেন, এ বাড়ি মলিনার নয়, বাড়ি অনির্বাণের, সুতরাং অনির্বাণ যেভাবে ইচ্ছে করেন, সেভাবেই এ বাড়ির প্রতিটি প্রাণী, বাড়ির প্রতিটি কীটপতঙ্গ, ইটপাথর, গাছপাতা, লতাগুল্ম অব্দি সে ভাবে চলবে। চলেছেও সেভাবে। ততদিন পর্যন্ত চলেছে, যতদিন না নীলা দেশ ছাড়ল আর মলিনা জগৎ।
বিকেলে দোকানের লোকেরা এসে বাড়িতে জিনিসপত্র রেখে যায়, নীলা যেভাবে যেখানে চেয়েছে রাখতে, ঠিক সেখানেই। আরও দুদিন যায় তার বাড়ি পুরো সাজাতে। বারান্দায় নানা রঙের ফুলের টব বসিয়ে দেয়। খাবার টেবিলের ওপর অর্কিড, সোফা-টেবিলের ওপর লিলি আর যে টেবিলটিতে কম্পিউটার রেখেছে, বেনোয়ার কখনও যদি প্রয়োজন হয় কম্পিউটার, সে টেবিলের ফুলদানিতে রাখে দশটি তাজা লাল গোলাপ।
বাড়ি সাজিয়ে নীলা নিজেই ঘরে ঘরে হাঁটে আর মুগ্ধ হয়। একটি শোবার, একটি বসার, একটি লেখাপড়া করার, আর একটি অতিথির শোবার। এরপর কী নীলা? সব তো হল! নীলা নিজেকেই বলে। নিজেকেই উত্তর দেয়, সব কই হল। একা লাগছে তো!
.
স্নান সেরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তার লোক দেখতে দেখতে নীলা ভাবে কাকে তার চাই। কে হলে তার এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ভাল লাগবে। এরকম যদি হত, দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ, দরজা খুলে সে দেখবে মলিনা দাঁড়িয়ে আছেন! প্যারিসে কেমন আছে নীলা, মলিনা দেখতে এসেছেন। মলিনাকে জড়িয়ে ধরে, নীলা বলবে, তোমাকে আমি ভালবাসি মা, যা কোনওদিনই তার বলা হয়নি। মলিনাকে বিছানায় শুইয়ে নিজেও সে শোবে পাশে, তারপর জগতের নিষ্ঠুরতার কথা সে বলবে, সব বলবে মলিনাকে। আর কাউকে তো বলা হয় না, নিজের ভেতর জমিয়ে রাখতে রাখতে, মাঝে মাঝে তার বুক এমন ভারী হয়ে থাকে যেন নিতে কষ্ট হয়।
সব আয়োজন শেষে, স্নান শেষে, ক্লান্ত নীলা মলিনার সঙ্গে মনে মনে কথা বলে। ভুলে যায় বেনোয়ার জন্য তার অধীর ব্যাকুলতার কথা। দিন পার হয় ভুলে থেকে, আর রাত যখন শকুনি শরীরে করে ঝুপঝুপ অন্ধকার নিয়ে আসতে থাকে, এ ঘর ও ঘর একা একা হাঁটে নীলা আর নিজের ছায়াটিই দীর্ঘ হতে হতে যখন তার দিকেই এগোতে থাকে, বেনোয়াকে সে তার নতুন জীবনের নতুন ঠিকানা জানায়।
তুমি কী করছ না করছ, আমাকে জানাবে না, আমি কি তোমার কেউ হই না নাকি?
বেনোয়ার অভিযোগের কোনও উত্তর নীলা দেয় না।
বেনোয়া বাড়িতে ঢুকে থতমত খায়, কার বাড়ি এটি?
কী মনে হয়?
আমি জানি না কার বাড়ি এটি। তুমি খুলে বলো।
আমার। নীলা হাসে।
তোমার? বেনোয়া সোফায় বসে চারদিক দেখতে দেখতে ভ্রূ কোঁচকায়।
হ্যাঁ আমার।
তুমি আবার বাড়ি পেলে কোথায়? তুমি না ভাড়া নেবার জন্য বাড়ি দেখছ! আমি তোমাকে সাহায্য করছি ভাড়া নিতে!
তুমি সাহায্য করছ?
করছি না? তোমাকে এমিল জোলার বাড়ি দেখাতে নিলাম, ভজিরায় নিলাম।
ও।
আর কে কে থাকবে এই বাড়িতে।
আমি।
আর?
আর তুমি।
আমি? আমি থাকব কী করে?
নীলা বলে, যদি না চাও, থাকবে না। আমি একা থাকব। ব্যাস।
একার জন্য এত বড় বাড়ি নিয়েছ?
আসলে কী জানো, কলকাতায় বড় বাড়িতে থেকে অভ্যেস। রক্তে কোথাও সম্ভবত অভ্যেস এখনও কিলবিল করে।
চাকরি বাকরি করছ না, এত ভাড়া দেবে কী করে!
তোমাকে আগেও বলেছি চাকরি না করেও আমার চলবে। ভয় পেয়ো না।
হুম।
বেনোয়া মুখ শুকনো করে বসে থাকে।
নীলা বেনোয়ার শুকনো মুখের সামনে নিজের হাসি মুখ তুলে ধরে, তুমি খুশি হওনি?
খুশির কী আছে বলো?
খুশির কিছু নেই? এতদিন দেখেছ আমি এক উদ্বাস্তু ছিলাম, এর বাড়ি ওর বাড়ি থাকতাম। দানিয়েল, আমার সেই বান্ধবী, আমাকে ওর বাড়ি থেকে দূর দূর করে তাড়িয়েছে। ভাল আমি সুনীলের বাড়িতে ছিলাম না। লোকটি আমাকে যাচ্ছেতাই ভাবে অপমান করেছে। আমার আসলে সত্যিকার কোনও আশ্রয় ছিল না। এমনকী উপায় না দেখে হোটেলে উঠেছি। এখন নিজের একটি বাড়ি হল, নিজের বাড়ির স্বাদ কেমন, তুমি তো জানো, তোমার নিজের বাড়ি আছে, তুমি তো বোঝো। বোঝ না, নিজের একটি বাড়ি থাকা কী ভীষণ প্রয়োজন! কী শান্তি এতে। ধরো যতই আমরা পরস্পরকে ভালবাসি না কেন, তুমি যদি বলো তোমার বাড়িতে যেতে এবং থাকতে, তবেই আমার অধিকার আছে তোমার বাড়িতে যাওয়ার এবং থাকার। তুমি যদি রাত তিনটের সময় আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলল, এখন বেরিয়ে যাও, আমার বেরিয়ে যেতে হবে। হবে না, বলো?
