দানিয়েল বলে, সে আগামী সপ্তাহে নিকল আর মিশেলের সঙ্গে সুইডেন যাচ্ছে, রিতার যাওয়ার ইচ্ছে ছিল কিন্তু ছবি তৈরির কাজে তাকে ইজরাইল যেতে হচ্ছে বলে সম্ভব হচ্ছে না। মারিয়া সুয়েনসন তাদের নেমন্তন্ন করেছে ইউসতেরো দ্বীপে ওর নতুন বাড়িতে। নিজের হাতে বাড়িটি বানিয়েছে মারিয়া। বাল্টিক সমুদ্রের ধারে লাল কাঠের বাড়ি।
নিজে বানিয়েছে?
হ্যাঁ নিজে। ওখানে লোকেরা নিজেই নিজের বাড়ি বানায়।
মারিয়া ওদের নিয়ে উত্তরে যাবে, ল্যাপ জাতি যেখানে বাস করে। ওখানে মধ্যরাতের সূর্য দেখবে ওরা।
দানিয়েল একবারও জিজ্ঞেস করে না, নীলা যেতে চায় কি না মধ্যরাতের সূর্য দেখতে। মারিয়া যে নীলাকে ছাড়া সে রাতের আর সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, সে বেশ স্পষ্ট।
নীলাকে অবশেষে সৌজন্য করেই সম্ভবত, জিজ্ঞেস করে কেমন চলছে তার জীবন।
হোটেলের জীবন তার, ভ্যান গগ না হয় সাড়ে তিন ফ্রাঁএ ঘর পেয়েছিলেন, একশো বছর পার হয়েছে মাঝখানে, দামও একশো গুণ বেড়েছে।
তোমার আর চিন্তা কী, টাকা তো আছেই! অত টাকা আমার জীবনে আমি কখনও উপার্জন করিনি। দেখিওনি।
নীলা বলে, কলকাতায় যা দেখেছ, তা আমার বাবার আর দাদার। মা কিছু টাকা দিয়েছেন, এই আমার সারাজীবনের সম্বল। টাকায় শুনেছি বাঘের দুধও কেনা যায়, কিন্তু এই প্যারিসে একটি বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় না।
নীলা এরপর কাতর মিনতি করে, ভাড়া নেওয়ার কোনও একটা ব্যবস্থা করে দিতে।
বাড়ি ভাড়া কত?
ধরো, হ হাজার।
তা হলে যে চার ছয়ে চব্বিশ হাজার ফ্রাঁ মাসে আয় করে, তার কাছে যাও। আমি অত টাকা আয় করি না। আমি কোনও কাজে লাগব না তোমার।
তোমার ওই বন্ধুরা, নিকল, রিতা, মিশেল? কেউ যদি দেয়।
আমার মনে হয় না কেউ দেবে। তুমি তোমার ওই বাঙালি বন্ধুকে বলছ না কেন! সে তো ভাল কামায় বলেছিলে।
.
সুনীলের সঙ্গে কথা বলার কোনও ইচ্ছে তার হয় না। নীলা শুয়ে থাকে। বেনোয়া আপিস শেষে চলে আসে হোটেলে রাত কাটাতে। বেনোয়ার স্পর্শ তার স্বপ্নকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে, একটি বাড়ির একটি সংসারের স্বপ্ন। বেনোয়া যত জ তেম বলে, তার তত ইচ্ছে জাগে পায়ের নীচে মাটি পেতে, দাঁড়াতে, যেন প্রতিটি দিন প্রতি নিশ্বাসে সে বেনোয়ার জ তেম এর ঘ্রাণ আরও গভীর করে নিতে পারে। মলিনার মতো ভালবাসাহীন বেঁচে থাকতে তার ভয় হয়।
বেনোয়া যখন শিশুর মতো নীলাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে থাকে, নিদ্রাহীনতার কোলে শ্রান্ত মাথা রেখে নীলা তাকিয়ে থাকে অসহ্য সুন্দরের দিকে। মাঝে মধ্যে তার ইচ্ছে যে করেনি, বেনোয়াকে ধাক্কা দিয়ে নীচে ফেলে দিতে, ঘাড় ধরে ঘর থেকে বের করে দিতে, তা নয়। করে তার, কিন্তু তার পরের অন্ধকার জীবন সে দেখে চোখের সামনে, ভালবাসাহীন, আশাহীন, সুনীলের ভোগের শিকার হওয়া দিনের পর দিন, অসহায় অবলা মেয়েমানুষের মতো বাঁচা। বেনোয়া তাকে ভালবাসে ঠিকই, কিন্তু তাকে এখনও বিশ্বাস করে না। নিশ্চয়ই করে না। এক অবোধ অভিমান নীলাকে স্তব্ধ করে রাখে।
ইচ্ছের বাইরে সে নিজের মায়ের শ্রাদ্ধ করেনি, কিন্তু পরদিন সকালে সে সুনীলকে ফোন করে, কেবল তাই নয়, লা মারেতে সুনীলের ক্লিনিকে অব্দি যায় দেখা করতে।
ওভাবে চলে গেলে কেন? চৈতালিও বলছিল, এরকম না বলে যাওয়াটা ঠিক হয়নি। সুনীল, যেন অশোভন কোনও আচরণ সে নীলার সঙ্গে কোনওদিন করেনি, এমন ভালমানুষি সুরে জিজ্ঞেস করে।
চৈতালিকে বলেননি, আমার চলে যাওয়ার কারণ? নীলার তিক্ত বিরক্ত কণ্ঠ।
কী কারণ?
নীলা মুঠো শক্ত করে। লোকটির মুখ সে কোনওদিন দেখতে চায়নি, কণ্ঠ শুনতে চায়নি, দম টানা হাসির শব্দ সে পেতে চায়নি, কিন্তু আর কোনও উপায় নেই তার, নিজের একটি বাড়ি তার দরকার।
নিজের কণ্ঠস্বরে নীলা নিজেই চমকে ওঠে, যখন সে সুনীলকে অনুরোধ নয়, আদেশ করে জিম্মি হতে।
তুমি কি প্যারিসেই থাকবে ভাবছ? তবে আগে কাগজের ব্যবস্থা করো। কিষান ডিভোর্স দিলে কী করবে? অবশ্য তোমার তো আবার ফরাসি প্রেমিক আছে। তা বিয়ে টিয়ে করছ নাকি?
নীলা ধমকে থামায় সুনীলকে। আবারও সেই আদেশ কণ্ঠ।
.
শেষ অব্দি বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়। রু দ্য ভুইয়েতে বাহাত্তর বর্গমিটার, চারটে ঘর, ভাড়া সাত হাজার। দু মাসের অগ্রিম ভাড়া আর দালালকে সাত হাজার, মোট একুশ হাজার দিয়ে, সুনীলের কাগজপত্র আর মুচলেকা দেখিয়ে নীলা চাবি পায় দরজার। রু দ্য ভুইয়ের বাড়ির চারতলায় ঢুকে, বড় একটি শ্বাস নেয়, ফুসফুস ভরে স্বাধীনতার ঘ্রাণ নেয়। সুনীল বলেছিল, এত বড় বাড়ি দিয়ে একা মানুষ তুমি কী করবে। কোনও একটা স্টুডিয়ো ভাড়া নিলে পারতে। নীলা পারত অনেক কিছু, সরকারের অবাসযোগ্য ঘোষণা করে দেওয়া পোড়াবাড়িগুলোয় উদ্বাস্তুরা দখল করে যেমন বিনা ভাড়ায় দিব্যি বছরের পর বছর ধরে থেকে যাচ্ছে, গরমজল নেই, আলো নেই, তেমন থাকতে পারত সে। মোজাম্মেল যে এলাকায় থাকে, সেই বেলভিলে, সেই তাবৎ কালো বাদামি লোকদের এলাকায় সস্তায় কোনও ঘর ভাড়া নিতে পারত। নীলা হয়তো অনেক কিছু পারত, জিম্মির দরকার হয় না এমন কোথাও সে যেতে পারত, কোনও শহরতলির ভাঙাচোরা কোনও বাড়ি। নীলা করতে পারত অনেক কিছু করেনি। করেনি বলে তার কোনও অনুতাপ হয় না। সে ভাবতে থাকে চারটে ঘর সে কী করে সাজাবে, সাজানো বাড়িটিতে ঢুকে কেমন চমকাবে বেনোয়া, চমকে নীলাকে জড়িস রে কী করে চুমু খাবে আর বলবে তোমাকে যত দেখি তত মুগ্ধ হই। এত তুমি পারো কী করে!
