.
বিকেলে ঝরনার জলে লুটোপুটি করে স্নান করে বেরোয় দুজন। এভিন্যু এমিল জোলায় একটি বাড়ি দেখতে যায়, ভাড়া আট হাজার। নীলার বেশ পছন্দ হয় বাড়িটি।
নেব নাকি? জিজ্ঞেস করে বেনোয়াকে।
বেনোয়া কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, তোমার ইচ্ছে।
ঠিক বলেছে সে, নীলা বাড়ি নেবে, নীলার ইচ্ছেতেই হতে হবে, এতে বেনোয়ার কিছু যায় আসে না, কিছু বলার নেই তার।
নীলার ইচ্ছে হলেই যে সব হবে তা নয়। বাড়িঅলা নাকচ করে দেয়, কারণ নীলা কোনও চাকরি করে না।
ব্যাঙ্কে টাকা আছে। বাড়িঅলা বলে, তাতে কী?
নাকচ।
রু দ্য ভজিরায় আরেকটি বাড়ি দেখে পছন্দ হওয়ার পর কবে নতুন বাড়িতে উঠবে তা জানতে চাইলে, নীলার মাসিক আয়ের কথা জিজ্ঞেস না করে বাড়িঅলা জিজ্ঞেস করে, জিম্মাদার হওয়ার লোক আছে কি না।
নীলা করুণ চোখে তাকায় বেনোয়ার দিকে।
বেনোয়ার নির্লিপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে নীলা মাথা নাড়ে, নেই।
নাকচ।
বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠে বেনোয়া বলে, গ্যারান্টি না পেলে বাড়ি ভাড়া পাবে না প্যারিসে।
এমন কী আমি লাখপতি হলেও না?
না।
কোটিপতি হলেও না?
না।
কী করতে পারি তবে?
নীলা আশা করে বেনোয়া বলবে, জিম্মি সে হবে। বলে না বেনোয়া। নীলার কেবল আশায় বসতি।
তোমার তো চেনা আছে ভারতীয়, ওদের বলো।
না, ওদের কাছে চাইতে ইচ্ছে করে না।
রিভলিতে তোমার বন্ধুকে বলো।
সে আমার বন্ধু নয়।
তার বাড়িতে এতদিন ছিলে, সে বন্ধু নয়। এ কেমন কথা!
নীলার জিভে এসে যায়, তুমি জিম্মি হও বেনোয়া। তুমি তো আলকাটেলে ভাল বেতনের চাকরি করো।
বলে না, কারণ আশঙ্কা হয় তার, বেনোয়া বুঝি ভাবছে, এ মেয়ে আজ এখানে, কাল সেখানে করে বেড়াচ্ছে, কখন আবার বাড়ি ভাড়া না দিয়ে পালাবে, তখন বিপদ হবে আমার।
যদি এরকম কোনও দুর্ভাবনা উঁকি দেয় বেনোয়ার মনে, দূর করতে নীলা বলে, যে, তার মা তাকে প্রচুর টাকা দিয়ে গেছে। তিন বছর কোনও চাকরি বাকরি ছাড়াই সে প্যারিসে বেশ স্বচ্ছন্দে চলতে পারবে। বেনোয়া শোনে। কেবল শোনেই।
নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমার মা চাননি আমি বিদেশে থাকি। কলকাতায় থাকলে বাড়ি ভাড়া পেতে কোনও অসুবিধে হত না। ওখানে এরকম জিম্মির প্রশ্ন ওঠে না। ভাড়াটের টাকা থাকলে কোনও বাড়িঅলা না করে না।
বেনোয়া বলে যায় প্যারিসে এ নিয়ম অনেকদিনের। বাড়িঅলারা কেন এ নিয়ম করেছে, তাও সে বলে।
বাড়িভাড়া নেওয়ার এবং দেওয়ার একশো নিয়ম গড়গড় করে বলে যায়। রু দ্য রেনের বাড়িটি সে কিনেছে, না কিনলে তারও ভাড়া নেওয়ার সমস্যা হত, বলে।
বেনোয়াকে স্বস্তি দেয় নীলা কোনওরকম প্রশ্নে না যেয়ে। বেনোয়াও কিছু জিজ্ঞেস করে না নীলা কী করে বাড়ি ভাড়ার ব্যবস্থা করবে।
.
পিগালের রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে সন্ধের আলো ঝলমল রাস্তায় হেঁটে হেঁটে বারবার বলে সে জ তেম।
রাস্তার দুপাশে লাল নীল রঙের বাতি জ্বলছে নিবছে, যৌনখেলনার দোকানগুলোয় কৃত্রিম শিশ্ন, কৃত্রিম নারীযোনি দেদার বিক্রি হচ্ছে। সঙ্গম প্রদর্শনী চলছে ছবির নয়, পুতুলের নয়, মঞ্চে রক্তমাংসের নারীপুরুষের।
একা এই রাস্তায়, নীলা জানে, তার পক্ষে সম্ভব হত না হাঁটা। ভয় এবং লজ্জা তার পা সম্পূর্ণ অচল করে দিত। বেনোয়া আছে বলে সে নির্ভাবনায় পিগালের রাস্তায় হাঁটে। ভয় লজ্জা পেছনে নিশ্চল পড়ে থাকে।
চলো মুলা রুজে যাই। নীলা বলে।
ওরে বাপ। ওখানে খরচা করার টাকা নেই আমার।
আমার আছে, চলো। তুলুজ লট্রেস কী নাচ দেখতেন দেখে আসি।
সেই নাচ কি আর আছে!
সেই নাচ নেই জেনেও নীলা-ঢোকে ভেতরে। জেনেই ঢোকে যে মূলা রুজ পর্যটক ধরার ফাঁদ ছাড়া কিছু নয়। নীলার ইচ্ছে করে বেনোয়াকে দেখিয়ে মোটা টাকার লাদেসিওঁর মেটাতে তার কার্তে ব্লু বের করতে। সে দেখুক, নীলা কোনও পথের ভিখিরি নয়, সে যা বলেছে, তাকে প্রচুর টাকা দিয়েছে তার মা, এ কথা মিথ্যে নয়।
বেনোয়া বুঝুক, নীলা মিথ্যে বলে না।
মুলা রুজ থেকে বেরিয়ে উৎফুল্ল বেনোয়া বলে, জানো, এত মেয়ে দেখেছি, তোমার মতো প্রাণবন্ত কাউকে দেখিনি। জীবন কী করে উপভোগ করতে হয়, তুমি জানো। তোমার মতো হৃদয়াবেগ আর কারও নেই। তোমার তুলনা তুমিই। ফরাসি মেয়েরা বিষম হিসেবি।
ফরাসি ছেলেরা নয়? নীলা জিজ্ঞেস করে।
বেনোয়া নীলার স্তুতিতে এতই বিভোর ছিল, শোনেনি নীলার প্রশ্ন।
সে রাতে বেনোয়া নীলার হোটেলঘরে রাত কাটায়। রাত কাটে ভালবেসে, আদরে আহ্লাদে, চুমুতে সঙ্গমে। সকালে বেনোয়া আপিস চলে গেলে, নীলা বেরোয়। বাড়ির দালালেরা যে ঝকঝকে দোকান পেতে বসে ব্যবসা করছে, ওসবে ঢুকে সে জিজ্ঞেস করে, বাড়ি পাওয়া যাবে কি না। বাড়ি পাওয়া যাবে, চাও তো এক্ষুনি নাও, তবে লোক কে আছে তোমার, যে জিম্মি হবে! প্লাসদিতালি আর রু দ্য ভুইয়ে-তে দুটো বাড়ি দেখে এসে সে হোটেলে শুয়ে থাকে অসহায়, বাড়ির দালালদের তার মোটা টাকার কাগজ দেখিয়ে কোনও লাভ হয়নি। যে বেনোয়া তার হৃদয় জুড়ে, সে নীলার অসহায়ত্ব দেখছে, কিন্তু সহায় হওয়ার কোনও আশা দিচ্ছে না। যে বেনোয়া তার সমস্ত জীবন জুড়ে, সে নীলার ধ্বসে পড়া জীবন দেখছে, কিন্তু ধ্বস থামাতে এতটুকু হাত বাড়াচ্ছে না।
.
যেহেতু দানিয়েল ব্যাঙ্কের চিঠি আসার খবর নীলাকে দিয়েছে, যেহেতু সে ইজেল আর ছবির মতো ডাস্টবিনে ফেলে দেয়নি চিঠি, রাগ তার পড়েছে, এই ভরসায় আর আশায় সে ফোন করে দানিয়েলকে।
