দশটার পর নিশ্চিত হয়ে বাড়িতে কেউ নেই, ঢুকে নীলা তার নিজের সুটকেস গুছিয়ে নেয়। টেলিফোন বই দেখে খোঁজ করে হোটেলের। যেদিকে যে হোটেলেই ফোন করে, সব কমপ্লেত, নয়তো চড়া দাম। খুঁজে পেতে রু দ্য লা কভোঁসিওঁতে কোনও এক স্টুডিয়ো হোটেলে একটি ঘর পায় ফাঁকা, তিনশো ফ্রাঁ ভাড়া, ক্রেডিট কার্ডের ওপর ভরসা করে ওটিতেই যাবে ঠিক করে ট্যাক্সি ডাকে। ট্যাক্সি তিন মিনিটের মধ্যে দাঁড়াবে নীচে, বলে। জয় গোস্বামীর বইটি পড়ে ছিল মেঝেয়, সেটি কুড়িয়ে সুটকেস নিয়ে দরজার কাছে যেই পৌঁছয় সে ফোন বাজে। বেনোয়া ভেবে নীলা দৌড়ে ফোন ধরে, বেনোয়া নয়, ওপাশে দানিয়েল।
কেমন আছো ভাল আছি জাতীয় কথাবার্তার পর দানিয়েল বলে, তোমার একটি চিঠি এসেছে, মনে হচ্ছে জরুরি, ব্যাঙ্কের চিঠি।
চিঠিটি আমার দরকার, নীলা রীতিমতো উত্তেজিত।
তোমার স্বামীর বাড়িতে ফোন করেছিলাম, কেউ ধরেনি, তারপর রিভলিতে তোমার বন্ধুর বাড়িতে খবর দেব বলে করলাম। বললে, তোমার ওই বন্ধুর ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে পারি চিঠিটি।
না। আমার কোনও বন্ধু নেই। এ লোক আমার দাদার বন্ধু ছিল জানতাম, আসলে বন্ধু নয়, শত্রু। এ বাড়ি থেকে আমি এখন চলে যাচ্ছি।
দানিয়েল ঠাণ্ডা গলায় বলে, চিঠিটি তবে আমি ব্যাঙ্কের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিচ্ছি।
খুলে পড়বে? কী লেখা? নীলা কাঁপে, আবেগে, রাগে।
দানিয়েল খোলে। টাকা এসেছে ভারত থেকে। তোমার একাউন্টে এখন দু লক্ষ নব্বই হাজার সাতশো আশি ফ্রাঁ।
নীলা জানত যে এ টাকা আসবে, কিন্তু টাকা এসে সত্যিকার পৌঁছোনোর পর মনে হচ্ছে তার, এ টাকা হঠাৎ চমকে দেওয়া টাকা, লটারিতে জিতে পাওয়ার টাকা।
দানিয়েল তুমি আমাকে বাঁচালে। নীলার কণ্ঠে উত্তাপ, উত্তেজনা।
দানিয়েলের নিরুত্তাপ স্বর, তুমি তো মরছিলে না যে আমি বাঁচিয়েছি! তুমি বেশ ভাল বেঁচে আছ, অনেকের চেয়ে ভাল।
এরপর দানিয়েল নিজের কথা খানিক বলে, সে করের ঝামেলায় পড়েছে। ইদানীং অর্ধেক টাকাই বেরিয়ে যাচ্ছে কর দিতে গিয়ে, দিন দিন সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি সাহায্যগুলো কমে যাচ্ছে এ দেশে। কারণ সরকার ব্যস্ত গরিব দেশগুলোয় দান খয়রাত করতে। এ নাকি ধনী দেশেরই স্বার্থে, স্বার্থে না ছাই, দানিয়েল বলে, ধনী দেশের গরিবদের করের টাকা যায় গরিব দেশের ধনীদের হাতে। গরিব গরিবই থাকে।
খাবার টেবিলের ওপর চাবি রাখে নীলা, যেভাবে কিষানের বাড়িতে সে চাবি রেখেছিল। সেভাবেই পা বাড়ায় বাইরে, যেভাবে নতুন আরেকটি জীবনের দিকে আগেও পা বাড়িয়েছিল। সে জীবন অনিশ্চিত জেনে আগেও সে দ্বিধা করেনি, এখনও না।
.
আমি আকাশের নীলে, বাতাসের পাখায়,
সরোবরের জলে, ঘাসের শরীরে, ঘাসফুলে
তোমার নাম লিখি স্বাধীনতা।
-জেক্রি ত নম লিবার্তে।
স্টুডিয়ো হোটেলের ঘরে লম্বা একটি ঘুম দিয়ে পরদিন সকালে ওঠে নীলা। খিদেয় চোঁ চোঁ করছে পেট। হাতে তার কার্তে ব্লু, ব্যাঙ্কে টাকার অভাব নেই, সে বেরিয়ে পড়ে কোনও ভাল রেস্তোরাঁয় খেতে। কভোঁসিওঁ এলাকায় আগে সে কখনও আসেনি। ঘুরে ফিরে এলাকাটি তার মন্দ লাগে না, ক্যাফে রেস্তোরাঁ সিনেমা মেট্রো বাসস্টপ সারি বুলনজেরি সব হাতের কাছে। বৃহস্পতিবার। কভোঁসিওঁর দুপাশের ফুটপাতে বাজার বসেছে খাট পালঙ্ক, কাপড়চোপড়, বই, ভিডিও, মাছ মাংস, ফুল ফল সবজি, তিনশো রকম পনির, মদ সবই বিক্রি হচ্ছে। আস্ত আস্ত ভাজা মুরগি আর খরগোশ চেঁচিয়ে বিক্রি করছে একটি মেয়ে। গরম লোহার শিকে মুরগি আর খরগোশ ঘড়ির কাঁটার মতো ঘুরছে। নীলা একটি খরগোশ কেনে। বাজারি উৎসবে সে ভিড় কেটে কেটে হেঁটে দু বোতল ওয়াইন কেনে। কিছু কমলালেবু, কামেবেয়ার পনির আর একটি সেদিনের পারতিকুলিয়ে, বাড়িভাড়ার বিজ্ঞাপনের কাগজ। ও নিয়ে হোটেলে ফিরে ফোন করে বেনোয়াকে।
বেনোয়া ফোন করেছিল সুনীলের বাড়িতে বেশ কবার। নীলা নেই, কোথায় কেউ জানে। না জানিয়ে নীলার এমন হঠাৎ হাওয়া হয়ে যাওয়া বেনোয়ার ভাল লাগে না।
কোথায় তুমি রহস্যময়ী?
তুমি খরগোশ খেতে পছন্দ করো, বলেছিলে না?
তা করি। তুমি কি খরগোশ হয়ে গেছ? বলো, তা হলে নুন আর গোলমরিচের গুঁড়ো নিয়ে এসে যাই তোমার কাছে।
এসে যাও।
হোটেলের ঠিকানা দেয় সে বেনোয়াকে।
বেনোয়া না আসা তক নীলা পারতিকুলিয়ের বাড়ি ভাড়া যেগুলো পাঁচ থেকে সাত হাজারের মধ্যে, দেখে বাড়িঅলাদের ফোন করে। দুপুরের আগেই বেশির ভাগ বাড়ি ভাড়া হয়ে গেছে। বাকি কয়েকটি, যা এখনও ভাড়া হয়নি, কথা বলে সময় ঠিক করে নেয় কখন সে দেখতে যাবে।
বেনোয়া হোটেলের ঘরে ঢুকে ধপাস করে বসে চেয়ারে। নীলা কেন হোটেলে উঠেছে, এ তার কিছুতে মাথায় ঢুকছে না।
ও বাড়িতে কোনও অসুবিধে ছিল?
ছিল না। এমনি।
চমক কাটলে বেনোয়া জল খায়, নীলার হোটেলে ওঠার কারণ অনুমান করে বলে, অবশ্য নিজের স্বাধীনমতো থাকা যায় একা থাকলে।
হ্যাঁ। তোমার যেমন আছে। নীলা বলে।
খরগোশ ওয়াইন পনির পড়ে থাকে টেবিলে। বেনোয়া তৃষ্ণার্ত, সে ওয়াইন পান করে তার তৃষ্ণা মেটাবে না। চুমু খেয়ে মেটাবে। বেনোয়া ক্ষুধার্ত, তবে মৃত খরগোশে তার রুচি নেই, খাবে জ্যান্ত খরগোশ। দীর্ঘ দীর্ঘ সময় নিয়ে সে তার মধ্যাহ্নভোজন সারে।
