বলছ কী?
দেখোই না।
নীলা ঘন ঘন পেছন ফেরে।
ঘটনা সত্যিই ঘটে। বয়সে বড় মহিলারা বয়সে ছোটর হাত ধরে মহা সুখে বেরিয়ে যায়, যেন মা বেরোচ্ছে ছেলের হাত ধরে।
এখন কী হবে?
মহিলা তার বাড়িতে নেবে ছেলেটিকে। তারপর আনন্দ করবে। ছেলেটিকে উপহার টুপহার কিনে দেবে, খাওয়াবে। একসঙ্গে নাচবে। শোবে। ছেলেটি টাকা পয়সা চাইলে টাকা পয়সা দেবে।
নীলা জিভে কামড় দেয়। ও মা কী কাণ্ড।
শাঁজ এলিজের এক মাথা থেকে আরেক মাথা অব্দি, অর্ক দ্য ট্রয়ম্ফ থেকে কনকর্ডের ঘুরন্ত চাকা অব্দি যায়, আবার ঘুরে আসে, পরস্পরের কোমর জড়িয়ে, যেন স্বর্গের উদ্যানে হাঁটছে, দুজন হাঁটে। কখনও আবার আইসক্রিম খেতে বা কফি চা, কোনও ক্যাফের তেরাসে বসে, আবার হাঁটে। টুকরো টুকরো হালকা কথা তুলোর মতো হাওয়ায় ওড়াতে থাকে দুজন, কার কোন রং পছন্দ, নীলার নীল, বেনোয়ার হালকা সবুজ, কার কী খেতে পছন্দ, রুইমাছ ভাত, ক্যানার আর আলু, কোন শহর কার সবচেয়ে পছন্দ, নীলার প্যারিস, বেনোয়ার রোম, রোম কি গেছে কখনও সে, যায়নি। বৃষ্টি ভাল লাগে? নীলার লাগে, বেনোয়ার লাগে না। আকাশ? মেঘলা আকাশ, নীলাকাশ। ছোটবেলার দুঃখের স্মৃতি? ইস্কুলের পরীক্ষায় খারাপ করার পর অনির্বাণ পিটিয়ে তাকে আধমরা করেছিলেন। মাদাম দুপঁ বলেছিলেন চকোলেট এত খেয়ো না, খেলে দাঁত নষ্ট হয়ে যায়। সুখের স্মৃতি? পরীক্ষায় ভাল করলে সে একটি লাল ফ্রক উপহার পেয়েছিল। বেনোয়ার সুখের স্মৃতি যখন সে বারো বছর বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে অস্ট্রিয়ার স্কি করতে গিয়েছিল।
ফুটপাত ধরে হাতে হাত ধরে হাঁটছে সব বয়সের ছেলেমেয়ে, কেবল ছেলে মেয়েও নয়, মেয়ে মেয়ে, ছেলে ছেলেও। চুমু খাচ্ছে, ঝরনায় স্নান করছে। গান গাইছে। প্রাণ খুলে হাসছে। কারও ইচ্ছে হল ঢুকে যাচ্ছে সিনেমায়। হাতে হাতে বিয়ারের কৌটো। বেনোয়া যখন ঢোকে ভারজিন নামের এক দোকানে, রাত তখন তিনটে। কড়া আলোয় ভেসে যায় নীলা, ভারজিনে চড়া স্বরে গান বাজছে, বেনোয়া জ্যাক ব্রেলের একটি সি ডি কিনে নীলাকে দিয়ে বলে, এই সিডির একটি গান শুনবে, ভাববে যে আমি গাইছি এটি।
কোনটা?
ন মে কিত পা।
ন মে কিত পা, আমাকে ছেড়ো না। বেনোয়াকে নীলা ছাড়বে কেন! বাঁচতে গেলে যে হাওয়া দরকার হয় শ্বাস নেবার, নীলার জন্য বেনোয়া সে হাওয়া। বেনোয়া ছাড়া, নীলা কল্পনা করে, তার জীবন ধুলোর মতো, ধুলোয় পড়ে থাকা এক টুকরো দুর্গন্ধ মল।
.
নীলা যখন ক্লান্ত, যখন ঘুমে চোখ ঢুলে আসছে, বেনোয়া জিজ্ঞেস করে, বাড়ি যাবে তো!
যাব। মনে মনে বলে, বাড়ি গিয়ে তোমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোব। নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে ঘুমোব।
নীলা ভেবেছিল, প্রাস দ্য লা কনকর্ড থেকে সেইন পার হয়ে বুলোভার্ড শাঁ জার্মা ধরে রু দ্য রেনে যাচ্ছে বেনোয়া। কিন্তু অনেকটা দূর চলে এলেও নীলা দেখে সেইন পড়ছে না সামনে, কনকর্ড থেকে সোজা সে রু দ্য রিভলির রাস্তায়। ডানে জারদা দ্য কুয়েরি, ডানে ল্যুভর।
নীলা জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাচ্ছ?
তোমাকে পৌঁছে দিতে।
ও।
ওরা তোমাকে খুব ভালবাসে, তাই না?
নীলার বলতে ইচ্ছে করে, ওরা আমাকে একটুও ভালবাসে না। বলতে ইচ্ছে করে আমাকে তোমার বাড়িতে নিয়ে যাও, চরম লাঞ্ছনা থেকে রক্ষা করো আমাকে, আমাকে বাঁচাও। নীলা বলতে চায়, কিন্তু কে যেন তার কণ্ঠনালী শক্ত করে চেপে রাখে, কণ্ঠে কোনও স্বর ওঠে না।
নিশ্চয়ই খুব ভালবাসে, না হলে এতদিন ধরে কি ওরা রাখছে নীলাকে। এ যুক্তির কথা বটে।
ওদের ঘুম নষ্ট হবে না তুমি ঢুকলে?
না, আমার কাছে চাবি আছে। নীলা বলে।
তাহলে পা টিপে টিপে ঢুকে যেয়ো আমার বেড়ালসোনা।
নীলাকে নামিয়ে চুমু খেয়ে, বেশ কবার জ তেম বলে, মনে করিয়ে দিয়ে কবে কোথায় আবার দেখা হচ্ছে, বেনোয়া চলে যায়।
বড় দরজায় তিন শূন্য এ পাঁচ নয় দুই টিপলে বন্ধ দরজা খুলে যায় ভেতর থেকে, দোতলা অব্দি উঠে আর উঠতে ইচ্ছে করে না নীলার। ইচ্ছে করে না ও বিছানায় গিয়ে আবার শুতে। দোতলার সিঁড়ির কাছে শুয়ে পড়ে সে, শুয়ে শুয়ে বাকি রাত পার করে ভেবে, বেনোয়া কেন তাকে বলেনি চলো আমার বাড়ি চলো। এমন তো নয় যে বেনোয়ার বউ, পাসকাল, অদৃশ্য প্রেতের মতো ঘুরে বেড়ায় ও বাড়িতে! শরীরের ও মনের ক্লান্তি নীলার আপাদমস্তক আবৃত করে রাখে। শেষ রাতে কিছু পায়ের শব্দে সে ধড়ফড়িয়ে ওঠে, এই বুঝি কেউ ধর্ষণ করতে আসছে তাকে। ভয়ে সে কুঁকড়ে যেতে থাকে। সারারাত হল্লা করে ভোরবেলা বাড়ি ফিরতে সে আগেও দেখেছে ফরাসিদের। তাকে দেখে কেউ কোনও প্রশ্ন করে না, কেন সে এখানে শুয়ে আছে, কোথায় তার বাড়ি, ইত্যাদি। এ কারণেই প্যারিসে তার এক ধরনের স্বস্তি হয়, কারও ব্যক্তিগত জীবনে কেউ নাক গলায় না। কারও ইচ্ছেতে বাধা দেওয়া কারও স্বভাব নয়। নীলার ইচ্ছে করছে এখানে শুয়ে থাকতে, যেখানে শুয়ে আছে, শুয়ে থাকার অধিকার তার একশো ভাগ আছে, যতক্ষণ না অন্যকে সে বিরক্ত করছে।
ভোরের রাস্তায় শীতল স্নিগ্ধ হাওয়ায় নীলা একা একা হাঁটে। পৃথিবীর সব দেশে, ভোরই বুঝি সবচেয়ে সুন্দর সময়। এ সময় প্রত্যেককে দেখতে বড় শিশুর মুখের মতো নির্মল দেখায়। ক্যাফেতে চা খেয়ে সকাল দশটা পার করে নীলা। প্যারিসে এ তার ভাল লাগে, সাতসকালে সব ক্যাফে খুলে যায়, ভোরবেলা আপিসে যাবার পথে লোকেরা সার সার দাঁড়িয়ে ক্যাফেতে কফি খেয়ে দিন শুরু করে। নীলার দিন শুরু করার কিছু নেই। কোনও আপিস নেই তার, কোথাও যাবার নেই, দিনের কোনও শুরু নেই, শেষ নেই। দিন আসে দিন যায়, নীলা নীলাই থেকে যায় কেবল বেনোয়াই যা তরঙ্গ তোলার তোলে তার নিস্তরঙ্গ নীরস জীবনে। তার মলিনাহীন জীবনে। বেনোয়ার সঙ্গে দেখা হলে তার দিন শুরু হয়, বিচ্ছিন্ন হলে শেষ হয় সে দিন। বাকি যে সময় পড়ে থাকে, তা কেবল অন্ধকার। বিচ্ছিরি অন্ধকার। যে অন্ধকারে শেয়াল শকুন ওত পেতে থাকে অন্যের সর্বনাশ করার আশায়। যে অন্ধকারে চুপচাপ মরে যায় মানুষ।
