নীলার কালো একটি টিশার্ট গায়ে, আর সাদা প্যান্ট। চুল বাঁধেনি, মুখে রং লাগায়নি, ঠোঁট গাঢ় বাদামি। এ রং ঢাকতে নাকে পাউডার লাগানোর ছুতোয় সে আজ যাচ্ছে না কোথাও। উদাস চোখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থেকে মাঝে মাঝে চায়ে চুমুক দেয়।
কী করেছ আজ সারাদিন?
শুয়ে শুয়ে বই পড়েছি।
বাইরে বেরোওনি?
না।
ফোন ধরোনি, সারাদিন ফোন করলাম।
তার খুলে রেখেছিলাম।
আমার সঙ্গে যেন কথা বলতে না হয়! তাই না! তো কী মনে করে মনে করলে আমাকে?
জানি না।
নীলা, আমার দিকে তাকাও।
তাকায় সে বেনোয়ার গভীর নীল চোখদুটোয়।
এ চোখে কিছু দেখো না?
না।
তুমি কি অন্ধ?
না।
নীলার হাত বেনোয়া তার উষ্ণ হাতে নিয়ে হাতের পিঠে চুমু খায়।
একটি কথা রাখবে?
কী কথা?
রাস্তায় কী দেখছ? আমাকে দেখো।
নীলা আবার তাকায় বেনোয়ার চোখে।
তোমার মন খারাপ?
না।
কী হয়েছে বলো!
কিছু হয়নি।
সেদিন ওই অত রাতে তুমি ওভাবে চলে গেলে, সারারাত আমি ঘুমোত পারিনি।
নীলা নির্বিকার। বেনোয়ার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে আবার তার চোখ রাস্তায়, রাস্তার ওপারে লা কুপলে লোকের ভিড়। প্রতিটি ক্যাফে রেস্তোরাঁ ভিড়ে উপচে পড়ছে। চা কফি না ফুরোতেই ক্যাফের লোক কাপ উঠিয়ে নিয়ে যায়।
নীলার হাত ধরে বেনোয়া হাঁটতে থাকে ফুটপাত ধরে। নীলার ভাল লাগে বিকেলের এই ফুরফুরে হাওয়ায় এভাবে হাঁটতে। এভাবে পাশাপাশি। নীলার ইচ্ছে করে বেনোয়া এভাবেই তার হাত ধরে থাকুক, না ছাড়ুক। রু দ্য রেনে শাঁ প্লাসিদের মোড়ে পাঁচতলা বাড়ির চারতলায় বেনোয়ার এপার্তোমো। ঘরে ঢুকে নীলাকে বসিয়ে, না চুমু না কিছু, বেনোয়া রান্নাঘরে ঢোকে। নীলা নিশ্চিত গেলাসে লাল ওয়াইন নিয়ে ঢুকবে বেনোয়া, উলঙ্গ করে সে ওয়াইন ঢালবে তার শরীরে, পান করবে। সে যেমনই হোক, সুনীল দ্বারা ধর্ষিতা হওয়ার চেয়ে এ ঢের ভাল। ইচ্ছের বাইরে বেনোয়া নীলার সঙ্গে কোনও যৌনসম্পর্কে যায়নি।
নীলাকে চমকে দিয়ে বেনোয়া দু কাপ চা নিয়ে ঘরে ঢোকে।
চা তো তোমার ঘরে নেই জানতাম।
আর্ল গ্রে কিনে রেখেছি, তোমার জন্য। এতে চলবে? শান্ত সুন্দর স্বর বেনোয়ার।
নীলা হাসে, চলবে।
বেনোয়া উঠে আসে নীলার পায়ের কাছে। নীলার কোলের ওপর মাথা রাখে।
কোলের মাথাটিকে সে ঠিক বুঝে পায় না কী করবে।
কিছুই করে না সে। চা পান করতে থাকে। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে আবার জিভ পোড়ায় সে। হঠাৎ অসচেতনে উহ মাগো শব্দ বেরিয়ে আসে, বুক কেঁপে ওঠে তার, এই বুঝি বেনোয়া এখন পোড়া জিভ দেখার ছলে লম্বা লাল জিভ নিয়ে এগোবে।
বেনোয়া মাথা তোলে, কী হয়েছে?
কিছু না।
জিভ পুড়েছে কি না জিজ্ঞেস করে না। নির্নিমেষ তাকিয়ে থেকে নীলার চা খাওয়ার দিকে, বলে, জ তেম।
চায়ের কাপটি কেঁপে ওঠে, ওটিকে দুহাতে ধরে, জিজ্ঞেস করে, কী বললে?
জ তেম। তোমাকে ভালবাসি।
অদ্ভুত শান্ত স্বর বেনোয়ার। আগের সেই অস্থিরতা নেই বেনোয়ার মধ্যে। নীলাকে হাতের কাছে পেয়ে শরীরী আনন্দে মেতে ওঠার সেই মাতলামো নেই। এ কদিনে সে অনেক বেশি পরিণত, অনেক ধীর স্থির। কাঁপা চায়ের কাপটি টেবিলে রাখতে নীলা ওঠে, আসলে চমক সামলাতেই ওঠে সে। উঠে জানালার কাছে যায়, রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রাস্তার মানুষ দেখে কিছুক্ষণ, আবার ফিরে আসে। বেনোয়া থেকে দূরে বসে। চায়ের কাপটি আবার হাতে নেয়, যেন সে যেমন চা খাচ্ছিল, তেমনই খাচ্ছে, মাঝখানে জ তেম বলে কোনও শব্দ সে শোনেনি।
নীলার ভয় হতে থাকে, সুনীল যা করে গেছে তার শরীরে আজ, জেনে, বেনোয়া এই জ তেম আর বলবে না। চোখ বুজে দাঁতে দাঁত চেপে মুঠো শক্ত করে অন্তস্থ করে সে তার একাকিত্ব, অসহায়ত্ব, তার গোপন সব যন্ত্রণা। বেনোয়ার ভালবাসা তার সবচেয়ে বড় অহংকার। বেনোয়াকে সে নিজের কোনও গ্লানির গল্প শোনাবে না। নীলা সব হারিয়েছে, হারাতে হারাতে হারিয়েছে হারাবার সব বেদনাকে। বেনোয়াকে সে হারাতে চায় না। এক বেনোয়ার ভালবাসাই যদি তাকে বাকি জীবন বাঁচিয়ে রাখে। নীলা প্রাণপণ বাঁচতে চায়। এই নিষ্ঠুর কুৎসিত পৃথিবীতে নীলা সুন্দরের হাত ধরে হেঁটে যাবে তার এতকাল লালন করা স্বপ্নের দিকে।
পা পা করে এগিয়ে এসে সে বেনোয়ার পেছনে হাঁটু গেড়ে বসে। একটি হাত রাখে বেনোয়ার কাঁধে, সেই হাতটির ওপর বেনোয়া আলতো করে নিজের একটি হাত রাখে।
দুটো হাতের স্পর্শ শুধু, বেনোয়ার ওই আলতো করে রাখা হাতটি থেকে সুখ নেমে আসে নীলার হাতে, হাত থেকে ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত শরীরে।
সত্যি ভালবাসো?
বেনোয়া ঘুরে তাকায়। স্বপ্নালু দুটো চোখ তার। গভীর নীল।
নীলাকে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে জড়িয়ে ধরে গভীর করে চুমু খেয়ে বলে, জ তেম, জ তেম।
এখন সে বেশ জানে ফরাসিরা ভালবাসি শব্দটি সহজে বলে না। ভালবাসলেই কেবল উচ্চারণ করে শব্দটি। দূরের এক ছাদে দাঁড়ানো কোনও মেয়েকে দেখেই এক পলকে যেমন বাঙালি ছেলেরা ভালবেসে ফেলে, ভালবেসে রাত জেগে একশো পদ্য লিখে ফেলে, চেনা নেই জানা নেই, বোঝা নেই, ভালবেসে জীবন দিয়ে দেয়, এরকম এখানে নয়। এদের ভালবাসা সত্যিকার ভালবাসা। আর এ সত্যিকার ভালবাসা নীলার জন্ম সার্থক করে। অর্থহীন জীবনকে অর্থময় করে।
বেনোয়ার কোল থেকে উঠে গিয়ে বিছানায় শোয় নীলা। ভালবাসা তাকে পালকের মতো নরম করে তুলছে, জানালা দিয়ে তার উড়ে যেতে ইচ্ছে করছে, শহরের প্রতিটি লোককে তার বলতে ইচ্ছে করছে, সে আর একা নয়, তাকে আর লোকে ভোগ করার জন্য ভোগ করছে না, কেউ তাকে ভালবাসে, কেউ তার প্রেমে সত্যিকার পড়েছে। বেনোয়া নীলার পাশে শুয়ে বলে, তুমি ফরাসি ভাষা শিখতে চাইছিলে না? জানো এ ভাষা কী করে শিখতে হয়?
