একা একা চা খাচ্ছ! আমার জন্য এক কাপ হবে কি! সুনীল ঠোঁট ফুলিয়ে বলল।
যেন এ বাড়ির অতিথি নীলা নয়, যেন সুনীল। নীলা চা করে আনল, সুনীলের জন্য তো বটেই, নিজের জন্যও আরেক কাপ। এবার আর বিছানায় নয়, চেয়ারে বসে, সুনীলের নাগালের বাইরে, বসে, বলল, বাড়ি কবে ঠিক হবে বলুন!
এত তাড়া কীসের?
তাড়া নেই! তবে এভাবে অন্যের বাড়ি আর কদিন থাকা যায়!
কেন, তোমার কি অসুবিধে হচ্ছে?
আমার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না। ঘর দখল করে রেখে আমিই বরং আপনাদের অসুবিধে করছি।
আমাদের এত পর ভাবো কেন শুনি?
নীলা জানে, সুনীল ছাড়া এ শহরে আপন তার কেউ নেই। ওকে পর ভাবলে এ বাড়িতে সে নিজের বাড়ির মতো করে থাকতে পারত না।
কোনও একটা চাকরি পেয়ে গেলে স্বস্তি পেতাম। নীলা বলে।
হয়ে যাবে, হয়ে যাবে। নারায়ণকে বলেছি, ও ব্যাটা বেশ কাজের লোক। চাকরি খুঁজছে। তবে ভাষাটা ভাল জানলে ভাল চাকরি পেতে।
আমার ভালর দরকার নেই। যেমন তেমন হলেই হয়।
.
নীলা হঠাৎ গরম চায়ে চুমুক দিয়ে উহু মাগো বলে কুঞ্চিত করে ঠোঁট, গাল, কপাল চোখ। ছলকে পড়ে চা, কোলের ওপর জয়ের বই, আর বইয়ের ওপর কাপ, আঙুল সরিয়ে নিয়ে কাপের হাতল থেকে তাকায় সুনীলের চোখে। সুনীলের চোখ হাসছে।
কী জিভ পুড়ল তো!
সুনীলের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নীলা মেঝেয় রাখে চোখ, দাবার ছকের মতো মেঝে, সাদা কালো, কালো সাদা। এ পারে হাতি ঘোড়া রাজা মন্ত্রী কিছু নেই, কেবল এক নিরস্ত্র সৈন্য, ওপার থেকে ঘোড়া এল আড়াই ঘর হেঁটে, দেখি পুড়েছে কতটা, জিভ বের করো তো…
সুনীলের লম্বা লাল জিভ নীলার পুড়ে যাওয়া জিভের দিকে যেই এগোয়, নীলা জিভ ঢুকিয়ে নেয় ভেতরে। চেয়ার পেছনে হেলিয়ে সুনীলের জিভের নাগাল থেকে নিজেকে বাঁচায়।
কী হচ্ছে কী! সুনীলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নীলা উঠে দাঁড়ায়।
দাঁড়িয়ে ওঠা নীলাকে বিছানায় এক ঝটকায় টেনে আনে সুনীল। নীলার হাত থেকে ছিটকে পড়ে চায়ের কাপ, জয়ের বই। নীলার শরীর চেপে রাখে নিজের শক্ত শরীরে, এক হাতে তল থেকে নীলার পাজামার ফিতে খুলে নীচে নামিয়ে, নিজের প্যান্টও হাঁটু অব্দি নামিয়ে নীলার ভেতর ঠেসে ধরে নিজেকে। বাকহীন শক্তিহীন পড়ে থেকে কুৎসিত এই দৃশ্য দেখে নীলা। সারা বাড়িতে আর কোনও শব্দ নেই, কেবল সুনীলের গোঙানো, ও নীলা ও নীলা।
সুনীল কয়েক মুহূর্ত পর নেতিয়ে পড়ে নীলার শরীরের ওপর।
নীলা সুনীলকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য স্পর্শ মাত্র করে না। এক দৃষ্টে সাদা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে।
সুনীল নিজেকে দ্রুত গুছিয়ে দেখে চোখ থেকে জল গড়িয়ে বালিশ ভিজছে নীলার।
কী ব্যাপার কাঁদছ তুমি?
সুনীল আঙুলে চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলে, কাঁদছ কেন?
ওই সাদা দেয়ালে তাকিয়ে থেকেই সে ভাঙা গলায় বলে, আমি কাঁদছি না। আমি কাঁদি না। আমার মা আমাকে একা রেখে চলে গেছেন, আমি কাঁদিনি। কোনও কষ্টই আমার কাছে কষ্ট মনে হয় না। জীবন এরকমই সম্ভবত…এরকমই কুৎসিত। আমার কেবল মনে হল, আমার দাদা নিখিল এইমাত্র আমাকে ধর্ষণ করল।
আমি তোমার দাদার বন্ধু, আপন দাদা তো নই।
আমরা তো দাদার বন্ধুদের দাদাই ভাবতে শিখি সেই ছোটবেলা থেকে।
সেই দাদার বন্ধুদের সঙ্গে তো আবার বিয়েও হয়, হয় না?
হয়, কিন্তু আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়নি। কিষানের সঙ্গে মেলে না বলে ওকে ছেড়ে এসেছি, ওকে কখনও আমার আপন বলে মনে হয়নি, এ শহরে আপনিই ছিলেন আমার আপন। এসব অসম্মান সওয়ার চেয়ে আমার সম্ভবত ওর বাড়ি ফিরে যাওয়াই ভাল। শরীর ভোগ করবে করুক, যত হোক স্বামী সে, দাদা তো নয়।
সুনীল ভারী গলায় বলে, আমি তো জানতাম তোমার সায় ছিল। জয়ের ওই কবিতা পড়তে পড়তে তুমি আমার দিকে কেমন চোখে তাকাচ্ছিলে, তাকাচ্ছিলে না? বলো!
.
সুনীল বেরিয়ে যেতেই নীলা স্নানঘরে গেল। অনেকক্ষণ ধরে স্নান করল, আস্ত সাবান ফুরোল ঘষে, শরীর তো নয়, যেন শেয়াল শকুনের ভাগাড় এটি। নীলা থুতু ছুড়ে দেয় নিজের শরীরে। সাবান ঘসে ঘসে লোভ, ঘেন্না, কফ, থুতু বীর্য, রক্ত যা আছে শরীরের অলিগলিতে, সরায়। নিজেকে বারবার সে বলে, না কোনও ঘটনা ঘটেনি, সে এমনিতে সাবান ফুরোচ্ছে, এ তার নিজের কুৎসিত মনের কল্পনা। সুনীল অসময়ে বাড়ি ফেরেনি, তার বিছানায় শোয়নি, তাকে স্পর্শ করেনি, যদি কেউ করেও থাকে, সে অন্য লোক, অথবা নীলা ঘুমিয়েছিল দুপুরে, এ তার নিতান্তই স্বপ্নের মধ্যে ঘটেছে। স্বপ্নদোষ। অথবা প্রতিবেশী কোনও লোক, কোনও দুষ্ট কালোলোক বাড়ি লুঠ করতে এসে নীলাকে একা পেয়ে ধর্ষণ করেছে, অথবা ধর্ষণ করেনি, নীলাই চেয়েছে ধর্ষিতা হতে। সুনীল সন্ধেয় ফিরবে, প্রতিদিনকার মতো। প্রতিদিনকার মতো সন্ধের পর সুনীল চৈতালি আর নীলাকে নিয়ে গল্পের আসর বসাবে, মাছ ভাত খাবে, আর নীলার মনে হতে থাকবে, কেবল এ শহরে নয়, এ জগতে সুনীলই তার সবচেয়ে কাছের আত্মীয়।
স্নানঘর থেকে বেরিয়ে নীলা ফোন করে বেনোয়াকে।
বেনোয়ার ব্যাকুল কণ্ঠস্বর শোনে, এক্ষুনি সে নীলার সঙ্গে দেখা করতে চায়। কোথায় দেখা হবে? কোথায় দেখা করলে তোমার জন্য সুবিধে?
সুবিধে? শব্দটির নীলা অর্থ জানে না।
.
সাড়ে পাঁচটায় মোপারনাসের সিলেক্টে বেনোয়ার সঙ্গে দেখা হয় নীলার। বেনোয়া চা বলে নীলার জন্য, নিজের জন্য কফি। তেরাসে রাস্তার দিকে মুখ করে পাশাপাশি বসে দুজন।
