মরুনি নীলার হাতখানা ছাড়িয়ে নিয়ে মিরার বাগানে হাঁটে, পাশে হাঁটতে হাঁটতে নীলা বলে যায় রবীন্দ্রনাথ ছবি আঁকতেন বটে, তবে তাঁর ছবির চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান তাঁর গান, কবিতা, তাঁর ছোটগল্প। বাঙালির কাছে, তিনি অনেকটা ঈশ্বরের মতো। আজও বাঙালির ঘরে ঘরে রবীন্দ্রসংগীত বাজে, কত নতুন নতুন সংগীতের উদ্ভব হয়, ঝরেও যায় কদিন পর, কেবল রবীন্দ্রসংগীত থেকে যায়। কোনও গীতিকার বা সুরকারের সাধ্য নেই রবীন্দ্রনাথের মতো শিল্পীকে ডিঙিয়ে যাওয়া। তাঁর সংগীত হাজার বছরেও এতটুকু মলিন হবে না।
মরুনি বলে, তুমি কি মিরোর কাজ দেখেছ?
বারসেলোনায় মিরোর শিল্পকর্ম দেখে মরুনি কীরকম মুগ্ধ হয়েছিল, সে কথা পাড়ে। বারসেলোনায় যদি কখনও যায় নীলা, তবে মিরোর কাজ যেন অবশ্যই দেখে আর কিছুতেই যেন গাউদির স্থাপত্য, বিশেষ করে গির্জাটি দেখতে ভুলে না যায়, বলে।
আমি তোমাকে রবীন্দ্রনাথের একটি বই দেব ফরাসি ভাষায়, পড়ে দেখো। আরও পড়তে চাইবে। নীলা বলে।
মরুনি গাড়ির দিকে যেতে যেতে বলে, সে নিৎসের ওপর একটি বক্তৃতা লিখছে, লেখাটি নিয়ে ইদানীং ভীষণ ব্যস্ত সে। রবীন্দ্রনাথের কিছু পড়ার এখন সময় নেই মোটে। সময় হলে সে নীলাকে জানাবে।
.
নীলার বুকের মধ্যটা হঠাৎ হু হু করে ওঠে, অকারণে।
.
জ তেম জ তেম জে তেম
নীলা ব্যাঙ্কে খোঁজ নিয়েছে, টাকা এখনও আসেনি।
নিজে সে কলকাতার ব্যাঙ্কে ফোন করে টাকার খোঁজ নিয়েছে। ওরা সাফ বলে দিয়েছে। টাকা পাঠানো হয়ে গেছে।
একটা অসহ্য অস্থিরতার মধ্যে নীলা দিন কাটাচ্ছে।
শ্রুতিযন্ত্র থেকে বেনোয়ার প্রতিদিনকার আকুল কণ্ঠ মুছে ফেলছে।
সুনীলকে বেশ কবার তাড়া দিয়েছে, ভাড়া নেওয়ার জন্য একটা বাড়ি খুঁজতে।
সুনীল খুঁজি খুঁজি করেও খুঁজছে না।
কিন্তু যে সকালে সুনীল বেরিয়ে যাবার আগে নীলা আবার আবদার করল বাড়ি খোঁজার, চৈতালি পাশেই ছিল, বলল সুনীলের এত সময় কী করে হবে!
সুনীল হবে বলল। সামনের সপ্তাহেই হবে।
চৈতালি বলল, ভাড়া নেওয়া কি মুখের কথা। জিম্মাদার হবে কে!
নীলার আবদার, সেও সুনীলকে হতে হবে।
চৈতালি ঝাঁজালো গলায় বলে, সুনীল জিম্মাদার হলে, কী হতে আবার কী হয়। ফরাসি কেউ হলে ভাল। তোমার তো ফরাসি বন্ধু আছেই।
না, আমার কেউ নেই। নীলা বলে।
এত বড় ঝুঁকি কী করে নেবে সে? আগের ঝাঁজালো সুরেই বলে চৈতালি।
ঝুঁকির প্রশ্ন আসছে কেন? বাড়িভাড়া দিতে কি আমি বাকি রাখব? টাকা পৌঁছলে সুনীলদা দেখেই না হয় দেবেন! যদি বিশ্বাস না হয়।
সুনীল চোখ টেপে নীলার দিকে। নীলাও টেপে। পাক্কা।
.
সেদিন দুপুর পার হয়, আর নীলা গরমে হাঁসফাঁস করে ঘরের ভেতর। কোনও পাখার বংশ নেই চালাবে। ঘরের বাইরে গনগনে আগুনের চুল্লি জ্বলছে। জানালায় তাকিয়ে কিছুক্ষণ সে বাইরের উৎসবের ঢেউ দেখে। সারাবছর রোদ না পাওয়া লোকগুলো অর্ধউন্মাদ হয়ে গেছে, রোদ যতক্ষণ আছে, ততক্ষণ এর প্রতিটি কণা ওদের ভোগ করা চাই। নীলার এই সমস্যা নেই, সে জন্ম থেকে রোদে ভুগে আসছে, রোদ তাকে টানে না।
সারাদিনই ঘরে থেকে সুকুমারী ভট্টাচার্যের লেখা নিয়তিবাদ : উদ্ভব ও বিকাশ বইটি শেষ করেছে। শেষ করে চা খেতে খেতে আধশোয়া হয়ে জয় গোস্বামীর কবিতা পড়তে শুরু করে, জোরে। কবিতা সে সশব্দেই পড়ে, নিজেকে শুনিয়ে। এও অভ্যেস তার। কবিতা তার কাছে পড়ার যেমন জিনিস, শোনারও।
নীলর সামনে যখন গরম চা, জয়ের কবিতা, আর মনে অমল আনন্দ, সুনীল ঢোকে বাড়িতে। একেবারে নীলার শোবার ঘরে। দুর্গার ঘরে, কালীর ঘরে, সরস্বতীর ঘরে।
কী ব্যাপার! এই অসময়ে বাড়ি ফিরলেন! নীলা বলে।
বিছানায় গা এলিয়ে একটি বালিশ টেনে নিয়ে বুকে, সুনীল বলে, আর বোলো না, কিছু ভাল লাগছিল না। কাজ কাজ আর কাজ।
নীলার হাত থেকে কবিতার বইটি নিয়ে চোখের সামনে মেলে সুনীল বলে, তুমি কবিতা পড়ছ! কতদিন আমার কবিতা পড়া হয় না! সেই দিনগুলি কোথায় যে গেল! সেই আমার সোনা রঙের দিনগুলি…
দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না। গানটি গুন গুন করে গাইতে থাকে নীলা।
সুনীল উঠে বসে, বাহ। বাহ, তুমি যে এত ভাল গান করো, তা তো জানতাম না!
নীলা ভুরু নাচায়, মোটেও না, এককালে ভাল গাইতাম। এখন না গাইতে গাইতে গলা আর নেই।
সুনীল আবার হেলে পড়ে, কবিতার বইটি নীলার দিকে ঠেলে দিয়ে বলে, একটা কবিতা শোনাও তো। জয় গোস্বামী চমৎকার কবিতা লেখে শুনেছি।
নীলা বইয়ের পাতা ওলটায় পড়ার মতো কবিতা পেতে, ডান হাতে। বাম হাতটি রাখা ছিল কোলে, সেটি তুলে নেয় সুনীল। হাতের রেখায় তাকিয়ে বলে, দেখি তো তোমার কটা বিয়ের কথা লেখা আছে।
বিয়ে? আরও? একটি করেই যন্ত্রণা পোহাচ্ছি কত। সুরে বলে নীলা।
আলগোছে হাতটি সুনীলের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, কবিতায় মন দেয়।
নিঃশ্বাস নিতে দেব না,
তোমাকে নিঃশ্বাস নিতে দেব না।
একবার যদি পাই, পুনরায়
আরবার যদি পাই,
পাঁজরে পাঁজর গুঁড়ো করে দেব–ছাই!
গুড়গুড় করে মনে করে মুচিরাম
জয় রাম বলে জয়রাম বলে
নিইনি কখনও তার নাম মুখে
ভবিষ্যতেও নেব না–
কিন্তু লিখব একবার যদি হাতে পাই একা ছাতে পাই
কিছুতেই ছেড়ে দেব না।
সুনীল মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে নীলার দিকে। সুনীল আধশোয়া, নীলাও।
