কলকাতার কোথাও নিশ্চয়ই এখনও বেঁচে আছে মরুনির নিজের মা, নিজের নিষ্ঠুরতার জন্য নিজেকে কি কখনও সে ক্ষমা করতে পারে? সে কি কখনও রাতে রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে না! একই সঙ্গে মানুষগুলো কী ভয়ানক নিষ্ঠুর হয়, আবার কোমল কাদার মতো নরম হয়। কোন চরিত্রটি মানুষের সত্যিকার চরিত্র নীলার কখনও জানা হয় না।
.
মরুনি পরদিন নীলাকে তার মার্সেডিজে করে জিভার্নি নিয়ে যায়। যখন একশো আশি কিলোমিটার বেগে মরুনি বড় রাস্তায় গাড়ি চালাতে থাকে, মোবাইল বার বার বেজে ওঠে, ডান হাতে মোবাইল, বাঁ হাতে স্টিয়ারিং, পাশে বসে নীলা প্রকৃতি দেখার চেয়ে মরুনিকেই দেখে বেশি। ক্লদ মনের বাড়ির বাগানে ছোট্ট সরোবরটির কাছে দাঁড়িয়ে তিরতির জলের ওপর পদ্মপাতার ভেসে থাকা দেখতে দেখতে সে মরুনিকে ভাবে। মরুনি এখানে ধনী বাবা মার আদরে বড় হওয়া মেয়ে। সরবনে দর্শন পড়েছে, নিজে হয়তো বড় একজন দার্শনিক হবে একদিন। কলকাতায় থাকলে, হয়তো তার অ আ ক খ পড়ারই সুযোগ হত না, হয়তো একবেলা খাবার জুটত না, অনাহারে অর্ধাহারে, অসুখে অভাবে তাকে হয়তো অল্প বয়সে মরে যেতে হত, অথবা সোনাগাছির বেশ্যা হতে হত। বেশ্যা হয়েও সম্ভবত সে খদ্দের বেশি পেত না, কারণ রং তার কালো।
জিভার্নিতে ঘণ্টা দুই কাটিয়ে মরুনি নীলাকে নিয়ে রুয়োতে যায়, রুয়োর সেই বিখ্যাত গির্জাটি দেখায়, ক্লদ মনে সকাল বিকেল, সন্ধ্যার আলো পড়া যে গির্জার ছবি এঁকেছেন। জনদাকর্কে পুড়িয়ে মারার জায়গাটিও দেখায়, অন্য এক গির্জার পিছনে। গির্জা দেখায় বটে, কিন্তু বলে, ধর্মে সে বিশ্বাস করে না। নীলা ভাবে মরুনি যদি কলকাতায় বড় হত, সে নিশ্চয় ধর্ম মানত, শিবপুজো করত, কালীঘাটে যেত, গঙ্গার নোংরা জলে স্নান করত।
.
শিল্পসাহিত্যে নীলার আগ্রহ আছে জেনে পরদিন মরুনি তাকে নিয়ে প্যারিসের বাইরে কুড়ি কিলোমিটার দূরে উভের সুর ওয়াসিতে যায়। ওয়াসি নদীর পারে উভের নামের ছোট্ট শহর। ছোট্ট এই শহরটিতে তখনকার নামী সব শিল্পী, দবিনি, কামিল, পিসারো থাকতেন। পল সেজানও থাকা শুরু করেছিলেন আর ডাক্তার গসেত নামের এক শিল্পবোদ্ধার আমন্ত্রণে ভ্যান গগও। জীবনের শেষ কটা দিন এখানেই কাটিয়েছেন তিনি, রাভোস ইন নামের এক ক্যাফের দোতলায় একটি ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন ভ্যান গগ। যে ঘরটিতে বসে সত্তর দিনে সাতাত্তরটির মতো ছবি এঁকেছিলেন। সব ছবিই ঘরে বসে আঁকা নয়, তখন প্রকৃতির নেশা তাঁর খুব। উভেরের গির্জার পাশে দাঁড়িয়ে নীলা রোদ পড়া গির্জাটির রং দেখে নীলাভ, ভ্যান গগের ছবির মতো। ফসল উঠে যাওয়া ভুট্টাখেতের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নীলা দেখে হলুদে ছেয়ে আছে খেত, কাক উড়ছে মাথার ওপর। হেঁটে ভুট্টাখেতের পাশে কবরখানায় ঢুকে সবুজ লতাগুল্মে ঢাকা ভ্যান গগের বাঁধানো কবরটির কিনারে বসে নীলা, মরুনি বসে ভ্যান গগের ভাই থিওর কিনারে। বসে নীলা বলে, কারও কি সব স্বপ্ন সাধ পূরণ হয় এক জীবনে?
হয় না। হলে বেঁচে থাকার আকর্ষণ নষ্ট হয়ে যায়, মরুনির ধারণা।
জীবন খুব ছোট, মানুষের আয়ু অন্তত দুশো বছর হওয়া উচিত। নীলা বলে। মরুনির তা মনে হয় না, তার মনে হয় না মানুষের এত দীর্ঘ বছর বাঁচার কোনও প্রয়োজন আছে।
হঠাৎ একটি উদ্ভট প্রশ্ন জাগে নীলার মনে, জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা মরুনি, যদি দেখো দুজন মেয়ে জলে পড়ে মারা যাচ্ছে, আমি আর আরেক জন ফরাসি মেয়ে, তুমি একজনকে বাঁচাতে পারো, সে সুযোগ তোমার আছে, কাকে বাঁচাবে?
মরুনি বলে, তোমাকে।
কেন?
কারণ তোমাকে আমি চিনি।
ধরো ফরাসি মেয়েটিকেও চেনো। ওর সঙ্গে তোমার পরিচয় আছে।
মরুনি হেসে বলে, সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হবে।
ধরো আমার চেয়ে বেশি চেনো ওকে। ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব আছে তোমার!
তা হলে ওকে। মরুনি উত্তর দেয়।
ধরো কাউকেই চেনো না। কাউকেই কখনও দেখোনি আগে।
তবে যার বয়স কম, তাকে।
বয়স সমান।
মরুনি উত্তর না দিয়ে হেসে ওঠে। নীলা লক্ষ করে মরুনি বলছে না, ভারতীয় মেয়েটিকে বাঁচাবে সে।
.
ভুট্টাখেত থেকে লু হাওয়া এসে ওড়াতে থাকে মরুনির একমাথা ঘন কালো চুল। সেদিকে তাকিয়ে লতাগুল্মের ওপর নিজের শরীরটি বিছিয়ে দিয়ে, আকাশের দিকে মুখ করে নীলা গাইতে শুরু করে, ধীরে ধীরে ধীরে বও ওগো উতল হাওয়া।
মরুনি তন্ময় হয়ে শোনে গানটি।
নীলা জিজ্ঞেস করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম মরুনি শুনেছে কি না। শোনেনি সে।
সে কে?
মরুনি বাঙালি মেয়ে, পশ্চিমি সব শিল্পীসাহিত্যের খবর তার নখদর্পণে, অথচ রবীন্দ্রনাথের নাম শোনেনি। ত্বরিতে উঠে নীলা বলে, চলো তোমাকে একটি জায়গায় নিয়ে যাব।
উভের ছেড়ে প্যারিসে এসে এভেনিউ দেতালির দিকে যেতে বলে মরুনিকে। ওখানে একটি ছোট্ট রাস্তায় থেমে মরুনির হাত চেপে ধরে উত্তেজনায়, নীলা বলে দেখো, এ রাস্তার নাম, রু টেগোর, টেগোর—যাঁর গান আমি গাইছিলাম। রাস্তা থেকে নেমে গেলেই স্প্যানিশ শিল্পী মিরোর নামে একটি বাগান, অপর পাশের রাস্তা রুশ শিল্পী মার্ক শাগালের নামে।
মরুনি জিজ্ঞেস করে, টেগোরও কি শাগাল বা মিরোর মতো শিল্পী ছিলেন?
নীলা বলে, ওঁর নাম টেগোর নয়, শুদ্ধ উচ্চারণ হচ্ছে ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ইংরেজরা তাঁর নামের উচ্চারণ করতে পারত না বলে টেগোর বলত।
