নীলা বলে, যদি তোমার মা ফেলে দিয়ে থাকে তোমাকে ডাস্টবিনে, কেন ফেলেছে জানো?
মরুনি মাথা নাড়ে, তার কোনও রকম ধারণাই নেই।
নীলা বলে, ফেলেছে তুমি কালো ছিলে বলে। কালো মেয়েদের কেউ বিয়ে করে না। অথবা তোমার মায়ের বিয়ে হয়নি বলে, বিয়ে না হয়ে বাচ্চা জন্ম দেওয়া ভীষণ রকম অপরাধ, তোমার মার আর সমাজে জায়গা হত না বলে। অথবা তুমি মেয়ে ছিলে বলে, সমাজে মেয়ের জন্ম কেউ চায় না, মেয়ে হল খরচার জিনিস, বিয়ে দিতে পণ লাগে, সম্ভবত তোমার বাবা মা গরিব ছিলেন, হয়তো মেয়েও ছিল বেশ কটা, তাই।
মরুনি হাসে।
ভেবে তোমার রাগ হয় না?
মরুনি হেসে বলে, না।
মরুনির নির্লিপ্তি নীলাকে বিস্মিত করে।
তুমি ভারতীয় খাবার বুঝি পছন্দ করো?
হ্যাঁ, খুব করি।
আমার যদি আজ একটা বাড়ি থাকত এই প্যারিসে, আমি তোমার জন্য বাঙালি খাবার রাঁধতে পারতাম। ভারতীয় রেস্তোরাঁয় কিন্তু আসল ভারতীয় খাবার পাওয়া যায় না। আমার কাছে কলকাতার অনেক ছবি আছে, তোমাকে দেখাব। একটু একটু বাংলা শব্দ যদি শিখতে চাও শেখাব।
নীলার উচ্ছ্বাস দেখে মরুনি হাসে। নীলার মনে হয় না কলকাতার ছবি দেখার অথবা বাংলা শেখার কোনও রকম ঝোঁক মরুনির আছে।
মরুনি উচ্ছল প্রাণবান মেয়ে। দুঃখের একফোঁটা চিহ্ন কোথাও নেই। এমনকী নীলা তাকে বলার পরও কী কারণে তার মা নিজের হাতে নিজের মেয়েকে ডাস্টবিনে ফেলেছিলেন, তা শুনেও এক ফোঁটা দুঃখ এসে তাকে স্পর্শ করছে না।
ভারতীয় কাউকে চেনো এ শহরে?
না।
পরিচিত হতে চাওনি কোনওদিন?
মরুনি কাঁধ ঝাঁকায়। পরিচিত হতে চাওয়া বা না চাওয়ার প্রশ্নটি সে নিজেকে করেনি কোনওদিন।
নীলা অনুমান করে, একজন ভারতীয়র সঙ্গে আর একজন পর্তুগিজের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার মধ্যে মরুনি কোনও পার্থক্য দেখে না।
নীলা ভাবে, মরুনিকে যদি তার মা বা বাবা বা অন্য কেউ রাতের অন্ধকারে ভয়ংকর নিষ্ঠুরের মতো ডাস্টবিনে ফেলে না দিত, যদি সে কলকাতায় বড় হত, বাংলায় কথা বলত, শাড়ি পরত। বয়স সাতাশ ওর, কালো বলে ওর বিয়ে হত না, ওকে সম্ভবত গলায় ফাঁস লাগিয়ে মিতুর মতো মরতে হত।
তৃতীয় দফা চা কফি শেষ হবার পর এক সাদা ফরাসি ছেলে, মরুনিরই বয়সি, রেস্তোরাঁয় ঢুকে মরুনিকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে, ডান হাতে ওকে জড়িয়ে নিয়ে চলে গেল। যাবার আগে নীলাকে তার ফোন নম্বর দিয়ে গেছে মরুনি, নীলার আপাতত নম্বরটি নিয়েছে। কেবল বেঁচে আছে যে তা নয়, নীলা ভাবে, মরুনি সুখে আছে। ফরাসি ছেলেটি, নীলা অনুমান করে, চুমু খেয়ে খেয়ে দিন পার করবে। মরুনিও আর সব ফরাসির মতো রোদের তলে কচ্ছপের মতো শুয়ে থেকে কালো রং আরও কালো করবে, ও রোদ থেকে গা বাঁচাতে শেখেনি, গায়ে রূপটান মেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে রং সামান্য ফরসা করা শেখেনি। সাদা ফরাসি যুবকটি মরুনিকে নিশ্চয়ই শতবার বলেছে, কী চমৎকার রং তোমার মরুনি।
নীলা বাড়ি ফিরে শ্রুতিযন্ত্রে বারোটা কণ্ঠস্বরের এগারোটিই পেল বেনোয়ার। নীলা একবার ফোন করো। আমি তোমার কথা খুব ভাবছি। বাড়িতে এসো, আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
চৈতালি আর সুনীল দুজনের কেউই কাজ থেকে ফেরেনি। নীলা বেনোয়াকে মুছে ফেলে শ্রুতিযন্ত্র থেকে।
সন্ধেয় বাড়ি ফিরে দুজনের কেউই কে এই বেনোয়া, কী সম্পর্ক নীলার সঙ্গে এসব প্রসঙ্গ একেবারে ওঠায় না। টুম্পামণি খেলা করতে থাকে ঘরময়, আর পুজোতে দেশে যাবে নাকি প্যারিসেই থাকবে এ নিয়ে সুনীল চৈতালিতে আলোচনা শুরু হয়। প্যারিসে পুজোকমিটিতে দলাদলি শুরু হয়ে গেছে, দেশে যাওয়াই ভাল, চৈতালির মত। আর সুনীলের মত, গত পুজোয় দেশে যাওয়া হয়েছিল, এবার বরং ইয়োরোপের কোথাও যাওয়া হোক। কোথায়? সুনীলের এক কাকা থাকেন লন্ডনে, ওখানে। আর লন্ডনে পুজোও তো ঘটা করে হয়, কলকাতার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়।
তুমি কী বলল নীলা?
সুনীল নীলার মতামত জানতে চায়।
নীলা ঠোঁট উলটে বলে, সম্পূর্ণ আপনাদের ব্যাপার। তবে আমাকে যদি বলা হত লন্ডন যাবে না কলকাতা? আমি লন্ডন বেছে নিতাম।
চৈতালি বলল, আত্মীয়স্বজন কলকাতা থাকে, বছরে মাত্র একবার দেখা করার সুযোগ হয়, এ সুযোগ নষ্ট করার মানে হয় না। লন্ডন যেতে হলে, ইয়োরোস্টারে চড়ে বসলে তিন ঘণ্টায় চলে যাওয়া যায়। শুক্রবার গিয়ে দুদিন ছুটি কাটিয়ে আসা যায়, যে কোনও সপ্তাহে।
ঠিক আছে তা হলে বাক্স ভরে বাজার করো। আত্মীয়স্বজনের তো আর শেষ নেই।
বুঝলে নীলা, সবাই আশা করে থাকে। কারও যে অভাব আছে তা নয়। হাতে ছোটখাটো কোনও বিদেশি জিনিস পেলেই খুশি হয়। আত্মীয়স্বজনে বন্ধুবান্ধবে শহর ভর্তি। সবার জন্য তো নেওয়া সম্ভব হয় না। টুম্পার কাপড়চোপড়ই তো এক বাক্স যায়। কারও কারও শুকনো মুখ দেখতে হয়, এ কারণে কি কলকাতা যাওয়া বন্ধ করে দেব।
ঘণ্টা দুই চলে যায়, তখনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না ছুটিতে কোথায় যাওয়া হবে।
.
নীলা সে রাতে ঘুমোতে যাবার আগে, অভাবিত একটি ফোন পায়, মরুনির। প্যারিসে বা প্যারিসের বাইরে নীলার যদি কোথাও যেতে ইচ্ছে করে, কিছু দেখতে ইচ্ছে করে, ঘুরে বেড়াতে চায়, তবে সময় আছে তার, সে দিতে পারে, কারণ আগামী দুটো দিন তার কোনও ব্যস্ততা নেই। নীলা সোল্লাসে রাজি হয়, তার জিভার্নি যাওয়ার শখ, ক্লদ মনের বাগান দেখতে। কখন দুজনের দেখা হবে, কোথায়, মরুনি বলে দেয়। অনেক রাত অব্দি শুয়ে শুয়ে মরুনির কথা ভাবে নীলা। মরুনি তার সঙ্গে যোগাযোগ না করলেও পারত, কেউ তাকে মাথার দিব্যি দেয়নি, রেস্তোরাঁয় এক দুপুরের পরিচয়ের পর কেউ কাউকে এমন বন্ধু করে নেয়, নীলা অন্তত শোনেনি, কলকাতায় ঘটতে পারে এমন ঘটনা, প্যারিসে নয়। মরুনির স্বভাবে কলকাতার কিছু নেই, তা হলে কী কারণে মরুনির এই উদারতা নীলার প্রতি! তার মনে হয়, মরুনি স্বীকার না করলেও এক ধরনের আত্মীয়তা সে অনুভব করছে নীলার সঙ্গে। তার এও মনে হয়, যে মা মরুনিকে জন্ম দিয়েছিল, তার কথা মরুনি ভাবে হঠাৎ হঠাৎ, কেমন সে দেখতে, কী তার নাম।
