লুক্সেমবার্গ বাগান থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে উইলিয়াম এন্ড স্মিথ থেকে কিছু বই কিনে পাসাজ ব্রাদিতে ঢোকে, ভারতীয় খাবার খেতে। যাদের প্রেমিকের কপাল নেই, তাদের বই ছাড়াও গতি নেই, বাগানে ক্যাফেতে বাসে রেলে একা নিজের একাকিত্ব লুকোতেই বইয়ের আশ্রয়। পাসাজ ব্রাদির রেস্তোরাঁয় খেতে খেতে বইয়ে মন দেবে এই তার ইচ্ছে। সারাদিনে যে জিনিসটি সে এই প্রথম দেখে, একা একটি মেয়ে। মেয়েটির গায়ের রং ঘোর কালো, কিন্তু নাক ভোঁতা নয়, চুল কোঁকড়া নয়, আফ্রিকার মেয়ে সে নিশ্চয় নয়। রেস্তোরাঁয় আর কোনও খদ্দের নেই, কেবল মেয়েটিই। মেয়েটির পাশের টেবিলে বসে নীলা ভাবে, এ মেয়ে ভারতীয় না হয়ে যায় না। কিন্তু কোনও ভারতীয় ভাষায় রেস্তেরাঁর কারও সঙ্গে কথা বলার কোনওরকম চেষ্টা না করে মেয়েটি যখন বিশুদ্ধ ফরাসিতে রেস্তোরাঁর লোকের কাছে জল চায়, খাবার চায়, খাবারে ঝাল কম চায়, নীলা বই থেকে চোখ তুলে মেয়েটির আপাদমস্তক নতুন করে লক্ষ করে। দুজনের চোখাচোখি হয় বেশ কবার।
চোখাচোখি হলে এক ধরনের দায়িত্ব নীলা অনুভব করে, দুএকটি বাক্য বিনিময় করা। জিজ্ঞেস করে, আপনার মাতৃভাষা কী?
ফরাসি? মেয়েটি উত্তর দেয়।
নীলা প্রস্তুত ছিল শুনতে তামিল বা মালায়ালাম।
আপনি কি ভারতীয় নন?
মেয়েটি না বলল।
তা হলে কোন দেশি?
ফরাসি।
নীলার কৌতূহল বাড়ে।
কোথায় জন্ম আপনার?
ভারতে।
নীলা হাসে। বিদেশিরা এ দেশের নাগরিকত্ব পেয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের বলতে থাকে ফরাসি, নিজের দেশের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে। নীলা উমবার্তো একোর বই থেকে আঙুল সরিয়ে জিজ্ঞেস করে, ভারতের কোথায়?
সম্ভবত কলকাতায়।
কলকাতায়?
নীলার চোখে মুখে খুশি উপচে ওঠে, বাংলায় বলে, তা কতদিন এখানে আছেন?
মেয়েটি হেসে বলল, আমি ভারতীয় ভাষা জানি না।
আপনি কলকাতার মেয়ে, বাংলা জানেন না? আবারও বাংলায় বলে নীলা।
মেয়েটি ভাবলেশহীন তাকায়।
কম ঝালের খাবার এসে গেলে, মেয়েটি খাওয়ায় মন দেয়। নীলা ঠিক বুঝে পায় না মেয়েটির সঙ্গে সে কথা চালিয়ে যাবে না কি নিজের চরকায় তেল দেবে। চরকা বলতে যদিও কিছু নেই তার, ভবঘুরেদের কোনও চরকা থাকে না। মেয়েটির মায়াকাড়া মুখ, ডাগর চোখ দেখে নীলার বিশ্বাস জন্মে, এ মেয়ে তাকে ইচ্ছে করে এড়িয়ে যাচ্ছে না। আগ বাড়িয়ে বলে, আমি কলকাতার মেয়ে।
মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দেয়, আমি মরুনি ভেরনেস
। নীলার খাবারও এসে যায়। সাদা ভাত আর মুরগির ঝোল। সেও খাওয়ায় মন দেয়, কিন্তু টের পায় তার কৌতূহল কমেনি। কৌতূহলের কারণ নীলা কলকাতার মেয়ে জেনেও মরুনি কেন কোনও রকম উৎসাহ দেখাচ্ছে না কথা বলার।
খাওয়া শেষ করে মরুনি একটি সিগারেট ধরায়। কালো একটি টিশার্ট পরা, হাঁটুপকেটঅলা প্যান্ট, পায়ে সাদা কেডস, পিঠের ব্যাকপ্যাক পায়ের কাছে রাখা। উদাস তাকিয়ে আছে পাসাজে।
নীলা বলে, আপনি বোধহয় অনেক আগে এ দেশে এসেছেন তাই না? আপনার বাবা মা এখানেই থাকেন।
মরুনি হ্যাঁ বলে।
কিছু মনে করছেন না তো, জিজ্ঞেস করছি যে আপনাকে এত কথা।
না মোটেই না, মরুনি হাসে। মিষ্টি মুখে মিষ্টি হাসি।
কফি খেতে খেতে মরুনি এবার নিজে থেকে বলে, আসলে আমি ভাল ইংরেজি জানি না। কথা বলতে তাই সংকোচ হচ্ছে।
কে বলল জানেন না, বেশ ভাল তো বলছেন।
মরুনির সংকোচ দূর করতে নীলা ব্যস্ত হয়ে পড়ে, এর চেয়ে খারাপ ইংরেজি সে শুনেছে, মরুনির ব্যাকরণে কোনও রকম ভুল এখনও সে পায়নি, আর আজকাল ব্যাকরণ ঠিক করে কেউই ইংরেজি বলে না, ইত্যাদি।
আপনি কি এখানেই লেখাপড়া করেছেন? নীলা প্রশ্ন করে।
হ্যাঁ এখানেই।
কবে এসেছেন প্যারিসে?
সাতাশ বছর আগে।
এরপর মরুনি ভেরনেস ভাঙা ইংরেজিতে বলে যায়, কলকাতার মাদার তেরেসা আশ্রমে ছিল সে, যখন দু মাস বয়স, এক ফরাসি দম্পতি ওকে দত্তক নিয়ে আসে। সেই থেকে, সেই দু মাস বয়স থেকে সে প্যারিসে। আপাদমস্তক প্যারিসিয়ান। আশ্রমের লোকেরা ফুটপাতের ময়লা ফেলার ডাস্টবিন থেকে মরুনির যখন এক মাস বয়স, কুড়িয়ে এনেছিল। মরুনি নামটি ওই আশ্রম থেকেই দেওয়া।
নীলা গালে হাত দিয়ে মরুনির গল্প শোনে।
তারপর?
তারপর আর কিছু না।
তুমি জানো না তোমার বাবা মা কে ছিল?
নাহ।
মরুনি আরেক কাপ কফি নেয়। নীলাও আরেক কাপ চা।
এরপর আর যাওনি, কলকাতায়?
নাহ।
যেতে ইচ্ছে করে?
আর যে কোনও শহরের মতো কলকাতাও একটি শহর তার কাছে। এ শহরের জন্য তার আলাদা করে কোনও ভালবাসা নেই যে তার যেতে ইচ্ছে করবে।
তোমার কখনও কোনও কষ্ট হয় মরুনি? নিজের শহরে নিজের দেশেই তোমার থাকা হল না বলে?
নাহ। কেন হবে? বরং মনে হয়, যা হয়েছে বেশ ভাল, না হলে আমি ওই ডাস্টবিনেই তো মরে থাকতাম।
মরুনি ভুল বলেনি, কিন্তু নীলার বুকের ভেতর মিহি একটি কষ্ট পালকের মতো উড়ে এসে ঢুকে যায়।
কে ফেলেছিল তাকে ডাস্টবিনে, সে জানে না। তার জানার কথা নয়। তার এও জানার কথা নয়, তার কলকাতায় জন্ম বা কিছু। বড় হয়ে তার ফরাসি বাবা মার কাছে শুনেছে সে সব। আশ্রমের কাগজপত্রে শুধু তার নাম লেখা ছিল, জন্মস্থান বা জন্মতারিখের জায়গায় প্রশ্নবোধক চিহ্ন শুধু, বাবা ও মায়ের নামের পাশেও বড় প্রশ্নবোধক।
