বেনোয়া চোখ খোলে, আলতো চুমু খেয়ে নীলার ঠোঁটে বলে, তোমাকে খুব ভাল লাগে আমার, খুব খুব ভাল লাগে।
নীলা বলে, আমাকে ভালবাসো না?
এখনও না।
চকিতে উঠে বসে নীলা।
কী বললে, আমাকে তুমি ভালবাসো না?
না। শান্ত স্বর বেনোয়ার।
তুমি আমাকে ভালবাসো না, তা হলে কী করে তুমি পারলে এমন নিষ্ঠ প্রেমিকের মতো এত সব করতে! যাকে ভালবাসো না, তাকে দেখে তোমার শরীর কী করে জাগে?
বেনোয়া বলে, ভাল লাগে তোমাকে, ভাল লাগলে শরীর জাগবে না কেন?
আমার নিজের ওপর ঘেন্না হচ্ছে আমার, ছি!
কী বলছ এসব? বেনোয়া উঠে বসে।
ভেবেছ, এ গরিব দেশ থেকে এসেছে, খেতে পায় না পরতে পায় না, একে দুকথা বলে পটিয়ে বিছানায় নিয়ে যাওয়া খুব সহজ!
ভাঁজ জমতে থাকে বেনোয়ার কপালে, চোখে। নীলা তার জামা কাপড় যত দ্রুত সম্ভব পরে নেয়।
তুমি কি বোকা নাকি? এত শিগরি কি ভালবাসা হয়? হয়তো একদিন বাসব। বেনোয়া বলে।
হয়তো বাসবে না।
তুমি কি যাচ্ছ নাকি!
হ্যাঁ যাচ্ছি।
অনেক রাত হয়েছে নীলা। থেকে যাও এখানে।
থেকে যাব? কেন, ভয় পাও না? পাসকাল, যাকে তুমি ভালবাসো, হঠাৎ এসে পড়তে পারে।
.
উলঙ্গ বেনোয়া তার তৃপ্ত ঘুমন্ত শিশ্নখানা নিয়ে হতভম্ব বসে থাকে, নীলা বেরিয়ে যায়।
.
অপমান নীলার পেছন পেছন যায়, অপমান নীলার সামনে সামনে হাঁটে, অপমান নীলার ডানে বাঁয়ে। নীলাকে দেয়ালে সেঁটে অপমান নীলার ভেতর বাহির তছনছ করতে থাকে। নীলা স্পষ্ট বুঝতে পারছে, যা ঘটিয়েছে বেনোয়া, ও কোনও সুখের কোনও ব্যাপার ছিল না, সে ভোগ করেছে নীলার শরীর, যেমন করে যে কোনও কামুক ধর্ষক ভোগ করে কোনও অসহায় বেকুব মেয়েকে। ছি! নীলা ছি! তুই মর। তুই মিঠুর মতো গলায় ফাঁস লাগিয়ে মরে যা।
এ কলকাতা নয়, প্যারিস। প্যারিস সারারাত জেগে থাকে। হাত ওঠালেই ট্যাক্সি। হাত বাড়ালেই প্রেমিক।
.
মরুনি ভেরনেস
নীলা বাড়ি ফিরলে, সুনীল ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করে, কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
এক বন্ধুর বাড়ি।
বেনোয়া নামে এক লোক দুবার ফোন করেছে। তুমি ফিরলে ফোন করতে বলেছে, বলে সুনীল চলে যায় শোবার ঘরের দিকে।
নীলাও যায় তার শোবার ঘরে। বাতি নিবিয়ে যখন শুতে যাবে, টেলিফোনের শব্দ, টুম্পার মা মা বলে কেঁদে ওঠার শব্দ, আর সুনীলের শব্দ, নীলা ফোন ধরো।
ফোনে বেনোয়া।
এত রাতে ফোন করেছ কেন? লোক ঘুমোচ্ছে তো।
তোমার সঙ্গে আমার কথা বলা জরুরি।
এখন, এই রাতে?
হ্যাঁ।
না। আমার ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমোব।
কাল দেখা করবে?
না।
নীলা ফোন রেখে দিল।
ফোন রেখে শোবার ঘরের দিকে যেতে আবার ফোন। নীলা এবার ফোনের তার খুলে রেখে শুতে যায়।
.
সাতসকালে উঠে নীলা বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে, জানে সে বাড়ি থাকা মানে একশো প্রশ্নের সামনে পড়া, কে এই বেনোয়া, কেন সে গভীর রাতে ফোন করে ঘুম ভাঙাচ্ছে অন্যের, তার সঙ্গে যা কথা আছে, নীলা কেন বাইরেই সেরে আসেনা সব। ইত্যাদি ইত্যাদি। বেরিয়ে, নীলা এলোমেলো ঘুরে বেড়ায়, মানুষের ভিড় চারদিকে, মেয়েরা লোম কাটা মসৃণ পা দেখিয়ে হাঁটছে, পেট পিঠ খোলা এমন জামা গায়ে, হাঁটছে আর ওদের স্তন দুলছে, নিতম্ব দুলছে। সারা শীত সালাদপাতা চিবিয়ে চকচকে শরীর বানিয়েছে, যত মেদ ছিল, ঝরিয়েছে, ঝরিয়ে এই গরমে শরীর প্রদর্শন করছে রাস্তাঘাটে বাগানে…। গরমকাল এখন, সুখের কাল এদের। অসহ্য গরমে নীলা ঘামে, ছায়া ধরে হাঁটে, আর অন্যরা হাঁটে রোদে। কুলকুল করে ঘামছে ওরা, তবু রোদ চাই। সাদা ত্বক রোদে পুড়ে লাল হয়ে ওঠে, তবু রোদ চাই। গরমকালে, সূর্য যখন থোকা থোকা আগুন ঢালতে শুরু করে, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে সব। সিনেমা থিয়েটারে ভিড় নেই। চার দেয়াল আর মাথার ওপর ছাদ এ জিনিস শীতকালের, গরমকালের নয়। ক্যাফে রেস্তোরাঁর ভেতরে কেউ বসে না, সব তেরাসে, বাইরে চেয়ার পেতে। বাইরে বসেই রোদ তাপাতে তাপাতে আড্ডা দিচ্ছে, পান করছে, খাচ্ছে। মধ্যাহ্নের গা ঝলসানো রোদে, নীলা দেখে, জারদা তুয়েরিতে একশো ছেলে মেয়ে প্রায় উলঙ্গ শুয়ে আছে। নিজে সে গরম দেশের মেয়ে হয়ে এত গরম সইতে পারে না, কিন্তু শীতের দেশের মানুষ গোগ্রাসে রোদ খাচ্ছে, যেন রোদের চেয়ে সুস্বাদু খাদ্য আর জগতে নেই। হাজার মানুষের ভিড়ে নীলাই একা, বাকিরা জোড়ায় জোড়ায়। চুমুতে শৃঙ্গারে ব্যস্ত জোড়া। তুয়েরি থেকে হেঁটে জারদা দ্য লুক্সেমবার্গেও একই দৃশ্য। ঘাসের ওপর তোয়ালে বিছিয়ে কচ্ছপের মতো শুয়ে শত শত সাদা রোদ তাপাচ্ছে, প্রতিটি লোমকূপে রোদ ঢোকাচ্ছে। গাছের ছায়ায় নীলা ছাড়া আর কেউ নেই বসা। বাগান রঙিন হয়ে আছে ফুলে, এই বাগানের রূপ বদলে যায় প্রতি ঋতুতে, গরমকালে এ সবচেয়ে বেশি রূপবতী হয়ে ওঠে, তখন ভিড় বাড়ে বাগানটিতে, রূপোন্মত্তদের ভিড়।
গরমে প্যারিস কানায় কানায় ভরে ওঠে পর্যটকে। আমেরিকান বুড়ো বুড়ি লম্বা ঢিলে শর্টস পরে, প্যারিস গাইড আর ম্যাপ হাতে নিয়ে শহরের আনাচ কানাচ ঘুরে বেড়ায়। পর্যটকের ভিড়ে অতিষ্ঠ হয়ে প্যারিসবাসী গরমের শেষ মাসে লম্বা ছুটি নিয়ে শহর ছেড়ে দূরে চলে যায়, দক্ষিণের দিকে, আরও গরমের দিকে, ইতালি বা স্পেন বা গ্রিসের দিকে। সমুদ্রতীরের বালুতে কচ্ছপের মতো পুরো গরমকাল শুয়ে থেকে রোদে গা পুড়িয়ে তামাটে করে তবে দেশে ফেরে, নিজের শহরে ফেরে, এই নিয়ম। যে যত কালচে, যত তামাটে, যত বাদামি করতে পারে রং, তত তার অহংকার। নীলার কোনও অহংকার হয় না তার কালচে রং নিয়ে। সে জানে, এই রংটিকে বেনোয়া ভাল লাগে বলেছিল কেবলই শরীর পেতে। যৌনাঙ্গ কালো হোক সাদা হোক, আনন্দ যেহেতু একই দেয়, আপত্তি করেনি বেনোয়া।
