নীলা তাকায় বেনোয়ার দিকে। রামস্টেক চিবোতে চিবোতে সে বড় বড় চোখে নীলাকে দেখছে। নীলার চোখের সামনে গেলাসের টুং টাং শব্দ, চোখের সামনে পাঁড় মাতালের হুল্লোড়, আর তাজা তাজা শব্দাবলি, গদ্য পদ্য। শতাব্দীর শুরুতে আমেরিকায় মদ নিষিদ্ধ হওয়ার পর মদারু লেখকেরা রাগ করে আমেরিকা ছেড়ে প্যারিসে এসে মদ্যাশ্রয় নিয়ে এই রেস্তোরাঁয় রাতভর চেঁচাতেন, শব্দের ফুলকি ওঠাতেন, দৃশ্যটি নীলার সামনে স্থির হয়ে থাকে, তার চোখের তারাও স্থির হয়। ঢকঢক করে বেনোয়ার বরদো গেলার শব্দে সংবিৎ ফেরে, হেমিংওয়ের ব্যাপারটা দেখো, তার টাকা সবসময় ফুরিয়ে যায় খাবার কিনতে যাবার সময়। অবশ্য বই কেনার সময়ও। যত বই পড়েছেন, বইয়ের দোকান থেকে ধার করে। খালিপেটে পল সেজানের ছবি দেখে চমৎকার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার পরামর্শও দিয়েছেন। আমি একদিন সালভাদর দালি মিউজিয়ামে খিদেপেটে ঢুকেছিলাম, মাথা চরকির মতো ঘুরছিল। কাছে কোনও গাছ পেলে ওর ডালে আমি দালির ঘড়ির মতো ঝুলে পড়তাম, আমাকে বেরিয়ে আসতে হল, মোমার্তের ওসব পর্যটক ভোলানো রেস্তোরাঁয় আগে খেতে হল। খেয়ে তারপর দালি দেখলাম। খিদেপেটে সেজান দেখলেও ওই হবে আমার।
ওয়াইন ফুরোলে, বেনোয়া আবার ঢেলে দেয় দুটো গেলাসেই, এক চুমুকে অর্ধেক শেষ করে, নীলা বলে, তবে যাই বলো বেনোয়া, হেমিংওয়ে একটি খুব ভাল কথা বলেছেন, প্যারিসে থাকা কখনও বৃথা যায় না। যা কিছুই তুমি প্যারিসকে দাও, প্যারিস তোমাকে তার বিনিময় দেয়। অবশ্য এসব পুরনো সময়ের কথা। প্যারিস পুরনো আমলে এমনই ছিল, এবং হেমিংওয়েরা খুব গরিব ছিলেন এবং খুব সুখী ছিলেন। আজকাল অন্যরকম, আজকাল হাতে কাঁড়ি কাঁড়ি ফ্রাঁ না হলে তুমি দ্বারে দ্বারে ঘোরো, আশ্রয় চাও, ভিক্ষে চাও, তুমি ভোগো, তুমি মরো।
নীলার চোখদুটো কি ভিজে উঠছে! ভিজে উঠছেই তো। ভিজে উঠছে।
না ভিজে উঠছে না, এনত্রোকোতে সে গোলমরিচটা বেশি ঢেলেছে ভুল করে, তাই। বেনোয়া পরিমাণ মতো নুন আর গোলমরিচ নিয়েছে, ওর চোখ খরার মাটির মতো, শুকনো। ওর চোখ, কান কিছুই জ্বালা করছে না, রং বদলে লাল হচ্ছে না, নাকের অগ্রভাগ সামান্য লালচে যদিও, অত্যধিক বরদো পানের কারণে।
হঠাৎ বান্ধবীর বাড়ি থেকে চলে গেলে কেন নীলা? বেনোয়া জিজ্ঞেস করে।
নীলা উত্তর দেয় না, দানিয়েলের বাড়ি থেকে চলে এসে, নীলার মনে হয়, একরকম ভালই হয়েছে। নাতালির সঙ্গে দানিয়েলের সম্পর্ক হওয়াতে তার মুক্তি হয়েছে প্রতি রাতের ওই লকলকে জিভের কবল থেকে। চোখের সামনে জিভটি ঝুলতে থাকে, সে জিভ ঠেলে সরিয়ে নীলা জিজ্ঞেস করে, ভাল না বেসে কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্কে যেতে পারো তুমি?
বেনোয়া বলে, নির্ভর করে।
কীসের ওপর?
পরিবেশ, আর…
আর কী?
আবেগ ইত্যাদি ইত্যাদি। বেনোয়ার অস্পষ্ট উত্তর শুনে, নীলা তার না-লালচে নাকটি তুলে স্পষ্ট করে বলে, আমি পারি না।
ভালবাসার উতল হাওয়া নীলাকে কলকণ্ঠ করে, ভালবাসা কখন যে আচমকা আমাকে এমন গ্রাস করে নিল। হঠাৎই, চোখের পলকে। যখন হাঁটি, চলি, কারও সঙ্গে কথা বলি, একা বসে থাকি, যখন ঘুমোই, যখন জেগে উঠি, আমি স্পষ্ট টের পাই যে কাউকে আমি ভালবাসি।
তুমি যে তোমার এনত্রোকোত খেলে না!
চেষ্টা করেছি খেতে, কিন্তু এক নম্বর, মশলা ছাড়া রান্না মাংস খেয়ে অভ্যেস নেই, দু নম্বর, গোরুর মাংস খেয়ে অভ্যেস নেই।
আর তিন নম্বর, বেনোয়া বলে, দেবতা খেয়ে অভ্যেস নেই। হা হা।
নীলা হাসে।
আইসক্রিমে দেবতা নেই, সেটা নিশ্চয়ই পারো।
আইসক্রিম খেতে খেতে নীলা তার ইচ্ছের কথা বলে, যে সে একটি বাড়ি ভাড়া নেবে, ভাল একটা চাকরি নেবে। স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন তার বহুদিনের।
কোথায় ভাড়া নেবে?
সে এখনও ঠিক করিনি। বাড়ি ভাড়া নিতেও তো শুনেছি মহা ঝামেলা। ধনী লোককে জিম্মাদার হতে হয়।
বেনোয়া বলে, আমার বাড়ির কাছাকাছি ভাড়া নিয়ো, তা হলে বেশ হবে।
বেনোয়া হাত বাড়িয়ে দেয় নীলার হাতের দিকে। সে হাতে, সে জানে, হাত রাখতে হবে। হাত রাখলে, নীলার সরু আঙুলগুলো আঙুলে বুলোতে থাকে বেনোয়া।
কী চমৎকার করে এরা ভালবাসতে জানে, নীলা ভাবে।
রেস্তোরাঁর লোক লাদিসিয়োঁ দিয়ে যায় বেনোয়ার সামনে। নীলা সেটি ছোঁ মেরে তুলে নেয়।
বেনোয়া হাঁ হাঁ করে ওঠে, করছ কী করছ কী এ তো আমি দেব, আমি তোমাকে নেমন্তন্ন করেছি।
তাতে কী!
সাড়ে আটশো ফ্রাঁ টেবিলে রেখে বলে, গরিব দেশ থেকে এসেছি বলে কি ভিখিরি নাকি!
বেনোয়া বাধা না দিয়ে বলে, ঠিক আছে এর পর আমি খাওয়াব তোমাকে।
লাদিসিয়োঁ বেনোয়ার সামনে দিয়েছে লোকটি, নিশ্চয়ই ভেবেছিল, নীলার দাম মেটাবার যোগ্যতা নেই। একে কালো, তার ওপর মেয়ে! নীলার এক ধরনের গৌরব হয় খাবারের দাম মিটিয়ে।
গৌরবের মূল্য আছে বটে, এটি ঘাড়ে থাকলে বেনোয়ার তৃষ্ণার্ত গোলাপি ঠোঁটে নীলা খুব সহজে ঠোঁট রাখতে পারে।
রেস্তোরাঁ থেকে উঠে কফি খেতে রেনোয়ার রু দ্য রেনের বাড়িতে যেতে হয়; যথারীতি। আবারও সেই কফি খাব না, চা খাব ব্যাপার।
আর চা যদি না দিতে পারি? অন্য কিছু যদি দিই! চায়ের তৃষ্ণা মিটবে তো। দেখো তো মেটে কি না!
বেনোয়া উঠে গানের যন্ত্রটি চালিয়ে দিয়ে, গেলাসে লাল ওয়াইন ভরে চুমুক দিতে দিতে গানের তালে তালে পা বাড়ায় নীলার দিকে! হোয়েন ইউ ওয়ান্ট ইট, হোয়েন ইউ নিড ইট, ইউ উউল অলওয়েজ হ্যাভ দ্য বেস্ট অব মি, আই কান্ট হেল্প ইট, বিলিভ মি…
