ক্লজারি দ্য লিলায় ভারতীয় রূপসী নেমে এলে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা ফরাসি সুদর্শন বিস্ফারিত চোখে সে রূপ দেখে প্রায় উড়ে এসে রূপসিকে বুকে গাঢ় আলিঙ্গনে পিষে গভীর চুমু খেল। চোখে চোখে নয়, কথা হল জিভে জিভে। অমৃতের মতো পান করল একে অপরের প্রেমার্দ্র জিভজল।
ফরাসি চুমুর এমন গা বিবশ করে দেওয়া স্বাদ পেয়ে রূপসি শরীর কাঁপে।
তুমি আমাকে পাগল করে দেবে নীলা। বেনোয়া বলে।
এত যত্নে রাখা ঠোঁটের রং উবে গিয়ে গাঢ় বাদামি রঙের ঠোঁট বেরিয়ে আসে নীলার, সেটি ঢাকতে ঠোঁট বিযুক্ত করে নীলা নাকে পাউডার লাগাতে যায়। ফিরে আসে রক্তাভ ঠোঁট নিয়ে, নিশ্চিন্ত।
বেনোয়ার মুখোমুখি বসে নীলা বলে, এত লোকের সামনে তুমি এই করলে?
কী করলাম?
জানো না বুঝি কী করলে, নীলার ঠোঁটে কামড়, ঠোঁটে হাসি, চোখে শরম।
অন্যায় কিছু করেছি? বেনোয়া ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল, নীল তারায় নীলা নিজের মুখটি দেখে।
চুমু খেলে যে!
বেনোয়া হো হো হেসে বলল, তোমার আপত্তি ছিল কি!
নীলা মেনু টেনে নিয়ে মুখ ঢাকল। মেনু সরিয়ে চোখে চোখ, আপত্তি ছিল?
হেসে নামিয়ে নিল চোখ, চিবুক, চিবুকের কালো তিল।
এই, আমার চুমু আমি খেয়েছি, এতে অন্য লোকের কী!
রাস্তায়, পার্কে, মেট্রোয় ছেলেমেয়েদের অহর্নিশি চুমু খেতে দেখে নীলা, দেখতে দেখতে চুমু ব্যাপারটি তার কাছে অনেকটা মেপেল গাছের পাতা অথবা গাছে ঝুলে থাকা আপেল দেখার মতো। কিন্তু চুমু নিজের ঠোঁটে এসে পড়লে সেটি যেন অন্য কিছু, সেটি আর দেখা নয়, অনুভব করা কেবল। শরীরের প্রতি কোষে অনুভব করা। আর সেটি অন্যরকম নিশ্চয়ই, সে চুমু যদি সোনালি চুলের নীল চোখের কোনও সুঠাম সুদর্শন যুবকের হয়, সে চুমু যদি ফরাসি চুমু হয়।
কী খাবে বলো! ফোয়া গ্রা?
এ আবার কী জিনিস?
হাঁসের কলিজা, হাঁসকে খুব করে খাইয়ে তারপব কলিজা বের করে নিয়ে এ জিনিস তৈরি করা হয়।
বর্ণনায় নীলার রুচি চলে যায়।
তাহলে সালাদ নেবে? মোৎজারেলা আর টমাটো?
পনির তো! পছন্দ করি না।
খাবে কী তা হলে?
মাছ টাছ নেই? আমি আবার মাছের দেশের মেয়ে।
সামুদ্রিক মাছ আছে, নিতে পারো!
ধুত, সমুদ্রের মাছে স্বাদ নেই, পুকুরের মাছ নেই?
মেনু দেখতে দেখতে বেনোয়া মাথা নাড়ে, নেই।
এনত্রোকোত নেবে? ও এ তো তুমি খাবে না।
কেন খাব না? আগে একদিন খেয়েছি।
গোরু তো তোমাদের দেবতা।
নীলা হাসি সামলে বলল, ওই এনত্রোকোতই নেব।
তুমি ধর্ম মানো না?
আমার ধর্ম আমার কাছে।
বেনোয়া চোখ নাচিয়ে বলে, তোমার ধর্মে তা হলে গোরু খাওয়া আছে।
নীলা গম্ভীর মুখ করে বলে যায়, হিন্দু ধর্মে গোরু খাওয়া নিষেধ কে বলেছে? বৈদিক যুগে গোরু খাওয়া হত। তারপর ব্রাহ্মণরা নিজেদের উঁচু জাতকে আলাদা করতে কিছু নিষেধের আয়োজন করল, ব্রাহ্মণ গোরু খাবে না। এরপর ব্রাহ্মণের নীচে যে জাত, সে জাতও গোরু খাওয়া বন্ধ করল, তার নীচের জাতের সঙ্গে নিজেদের আলাদা করার জন্য। এভাবেই যে যত জাতে উঠতে চায়, গোরু না খাওয়া এক ধরনের রীতি করে তুলল।
এখানে কিন্তু জাতে উঠতে গেলে গোরু খেতে হয়। বেনোয়া বলে।
নীলা কপট বিস্ময় কণ্ঠে বলে, এখানেও জাত আছে? ফরাসি বিপ্লব তা হলে কি জাত ফাত দূর করতে পারেনি? ধনী এলাকা গরিব এলাকা একাকার করতে পারেনি?
বিপ্লব বিষয়ে বেনোয়ার আগ্রহ নেই। সে আগ্রহ প্রকাশ করে বরদো ওয়াইনে, পুরো বোতল বরদো দিতে অনুরোধ করে।
খেতে খেতে নীলা বলল, সে বান্ধবীর বাড়িতে থাকছে না, থাকছে রু দ্য রিভলিতে।
বেশ ধনী এলাকা তো রু দ্য রিভলি। কোনও ফরাসির বাড়ি?
না। বলে নীলা থামে, অপেক্ষা করে বেনোয়া তাকে জিজ্ঞেস করবে যদি ফরাসির নয়, তবে কার। বেনোয়ার এতে, নীলা দেখে, কোনও আগ্রহ নেই। অতঃপর নিজেই বলে, বাঙালির। শুনে বেনোয়ার চোখ হঠাৎ মাছের চোখের মতো গোল।
কেন বাঙালিরা বুঝি ধনী এলাকায় থাকতে পারে না?
না সে কথা বলছি না।
বেনোয়া তবে কোন কথা বলছে, তা অবশ্য বলে না।
লাল বরদোর গেলাস উঠিয়ে বেনোয়া সঁতে বলল, নীলাও সঁতে।
ক্লসারি দ্য লিলায় যাঁদের আড্ডাখানা ছিল, পান করতে করতে যাঁরা রাতকে সকাল করতেন, সেই অগুনতি লেখক শিল্পীদের নাম, থালার তলায় কাগজে লেখা। বোদেলেয়ার থেকে শুরু করে এজরা পাউন্ড, এফ স্কট ফিৎজেরাল্ড, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, জর্জ অরওয়েল, স্যামুয়েল বেকেট! কাগজটিতে চোখ বুলিয়ে নীলা উচ্ছ্বসিত। আচ্ছা, এটা কি সেই রেস্তোরাঁ, যেখানে লেনিন আসতেন, ট্রটস্কি আসতেন!
আমার মনে হয় না। বেনোয়া আশপাশ তাকিয়ে বলে।
খানিক ভেবে নীলা বলে, আমার মন বলছে এটা সেই রেস্তোরাঁ যেখানের তেরাসে বসে হেমিংওয়ে তাঁর সান অলসো রাইজেস লিখেছিলেন, মাত্র ছ সপ্তাহে। কাছেই তো ছিলেন, পিকাসোও আসতেন তাঁর কবিবন্ধু এপোলেনিয়েরকে নিয়ে।
পিকাসো! বেনোয়ার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
হ্যাঁ পিকাসো, কিন্তু হেমিংওয়ের ব্যাপারটা আমি বুঝি না। প্রচণ্ড দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেছেন এই প্যারিসে, যখন চুয়াত্তর কার্দিনাল লেমোয়াঁয় থাকতেন। ঠাণ্ডা ঘরে, ঘরে কোনও গরম জল ছিল না। ঘর গরম করার জন্য জ্বালানি কাঠ কেনার টাকা ছিল না। কোনও তয়লেত ছিল না বাড়িতে। একটি বালতি ব্যবহার করতেন, ব্যাস। আর ঠিক ঠিকই ক্যাফে বারে রেস্তোরাঁয় যেতেন, প্লাস শাঁ মিশেলে ক্যাফে দেসামেচ্যুওর-এ বসে ক্যাফে ও লে পান করতেন। এমনকী ঘোড়দৌড়ের বাজিও খেলতেন। কী করে? একটু খটকা লাগে তাই না?
