নীলা বলে, আমি কলকাতা থেকে কিষানের বাড়ি যাবার জন্য আসিনি।
তবে কী?
না, এখানে থাকার জন্যও আসিনি। আমি একটি বাড়ি ভাড়া নেব শিগরি। কলকাতা থেকে আমার টাকা এসে না পৌঁছোনো পর্যন্ত এখানে থাকব। আমাকে অন্য কোথাও যেতে বোলো না।
.
চৈতালি আবার ফোন করতে ওঠে সুনীলকে। চৈতালির বিষাদ নীলাকেও কুরে খাচ্ছে, সে দ্রুত সুটকেসদুটো তুলে নিয়ে বেরিয়ে যায়। ফিরে যাওয়ার জন্য পেছনে চৈতালির কোনও ডাক সে শোনে না। রাস্তায় নামলে একেবারে গা ঘেঁষে গাড়ি থামাল সুনীল।
কোথায় যাচ্ছে নীলা? সে জানে না সে কোথায় যাচ্ছে। কিষানের বাড়ি যেতে চাইলে, সুনীল প্রস্তাব দেয়, সে পৌঁছে দিয়ে আসতে পারে। কিষানের বাড়িতে নীলা যাচ্ছে না। তবে কি সেই বান্ধবীর বাড়িতে যাচ্ছে? যেতে চাইলে সুনীল ওখানেও পৌঁছে দেবে। না, সে বাড়িতেও নীলা যাচ্ছে না। তবে সে যাচ্ছেটা কোথায়? সে কোথাও কারও বাড়িতে যাচ্ছে না, যে কোনও রাস্তাই তার ঠিকানা, এর চেয়ে নিরাপদ আপাতত তার সামনে কিছু নেই, রাস্তা থেকে তাকে অন্তত কেউ তাড়িয়ে দেবে না। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নীলাকে সুনীল টেনে ওপরে তোলে। তারপর ধীরে সুস্থে, মাথা ঠাণ্ডা করে যে প্রশ্নের উত্তর সুনীল নীলাকে দিতে বলে, তা হল কিষানের বাড়িতে সে কেন যেতে চাইছে না।
কিষানের বাড়িতে তার যেতে ইচ্ছে করছে না। ঠাণ্ডা মাথা উত্তর।
ইচ্ছের বাইরে মেয়েদের অনেক কিছু করতে হয় নীলা! চৈতালি কঠিন স্বরে বলে।
চৈতালির মতে ইচ্ছের বাইরে নীলাকে কিষানের বাড়ি গিয়ে নিজের সংসার গুছিয়ে নেওয়া উচিত। সুনীলের মতে নীলার উচিত কলকাতা ফিরে যাওয়া।
কিন্তু নীলা কিষানের সঙ্গে সংসার করবে না, কলকাতায়ও ফিরবে না। ওই নোংরা সমাজে সে আর ফিরতে চায় না। বালিগঞ্জের বাড়িতে ফিরে গেলে অনির্বাণের মুখে চুনকালি পড়বে, ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে যদি সে শহরে কোথাও একা থাকতে চায়, লোকে ছি ছি করবে। চাকরি বাকরি করে সে একা থাকার ব্যবস্থা নিশ্চয় করতে পারে, কিন্তু সে জীবন এক দুর্বিসহ জীবন, এ সে জানে। স্বামী ছেড়ে এসেছে যে মেয়ে, সে মেয়ে নষ্ট, সে মেয়ে পচা, সে মেয়ে পতিতা, তার ওপর বিনা দ্বিধায় ঝাঁপিয়ে পড়বে যত কামুক পুরুষ।
আবার বিয়ে করার প্রসঙ্গ ওঠে।
একবার বিয়ে হওয়া মেয়েকে বিয়ে করতে কে আসবে? কেউ না। যদি কেউ আসে, সে হবে সত্তর বছরের বুড়ো, নয়তো চরিত্রহীন, নয়তো পাগল, নয়তো…
চৈতালি মাঝখানে আসল প্রশ্নটি করে, বিমানবন্দরে কার হাত ধরে যাচ্ছিলে, কে সে?
নীলার গলা শুকিয়ে আসে। জল চেয়ে নয়, এবার নিয়ে খায়। ঢোক গিলে বলে, এক বন্ধু।
ফরাসি বন্ধু তোমার সঙ্গে কলকাতা থেকে ফিরেছে? নাকি তোমাকে তুলে আনতে গিয়েছিল?
ওই বিমানে পরিচয়।
বিমানে পরিচয় ছেলে তোমার বন্ধু হয়ে গেল? এত শিগরি?
সুনীল হেসে ওঠে, এ হাসিতে সুখের ছিটেফোঁটা নেই। চৈতালি এবং সুনীল দুজনেরই ধারণা নীলার বোধবুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে।
বন্ধু হওয়া এত সোজা জিনিস নয় নীলা, বারো বছর একসঙ্গে চলাফেরা করেও দেখা যায়, বন্ধুত্বই হল না।
নীলা বোধবুদ্ধি প্রমাণ করতে যুক্তি দেখায়, আবার একদিনেও হয় তো। হয় না?
সুনীল হাসে। এ হাসি সম্মতির হাসি নয়।
ওসব বাদ দাও, সময়ে বুঝতে পারবে, জীবন কোথাও সহজ নয়। কলকাতায় নয়, প্যারিসেও নয়। খানিক থেমে দু পা ছড়িয়ে সামনে, দু হাত ছড়িয়ে সোফার কাঁধে, বলে কিষানলালের যে মানসিক অবস্থা, যে কোনও সময় সে তোমাকে ডিভোর্স দিতে পারে, তখন তো তোমার কলকাতা না ফিরে উপায় নেই।
টুম্পাকে ঘুম পাড়াতে যাবার জন্য ওঠে চৈতালি, শোবার ঘরের দিকে যেতে যেতে বলে, তা হবে কেন, ওর ওই ফরাসি বন্ধু ওকে বিয়ে করলেই তো সব ঝামেলা ফুরোয়।
.
সুনীলের কাছে সরে এসে নীলা খুব বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মেয়ের মতো কিছু টাকা ধার চায়, যা সে শোধ দিয়ে দেবে, কলকাতা যাবার সময় যে টাকা ধার করেছিল, তাও দেবে, খুব শিগরি, কুড়ি লক্ষ টাকাটা প্যারিস পৌঁছে গেলেই। বেশি নয়, তার পাঁচ হাজার ফ্রাঁ হলেই চলবে। তবে এক্ষুনি লাগছে না, কদিন পরে হলেও চলবে। সুনীল বুঝে পায় না এতগুলো ফ্রাঁ দিয়ে নীলা করবে কী, এ বাড়িতে আছো। বাড়ি ভাড়া নেই, খাওয়ার খরচা নেই। আপাতত তো এখানেই থাকছ। আপাতত নীলা এখানেই থাকছে তা ঠিক। কিন্তু নীলার দরকার আছে টাকার। কিছু পরিকল্পনা আছে তার। খামোকা টাকা চায়নি। আর এও নীলা জানিয়ে দেয়, প্যারিসে ভিখিরি হয়ে থাকতে সে আসেনি। যদি সুনীলের কোনওরকম সন্দেহ হয়, সে নিখিলের কাছে ফোন করে জেনে নিতে পারে কুড়ি লক্ষ টাকা নীলার আছে কি নেই।
চৈতালির পুজোর ঘরে নীলার জন্য বিছানা পেতে দেওয়া হয়। দুর্গা, সরস্বতী, কালী, লক্ষ্মীকে ঘাড়ের পেছনে রেখে নীলাকে শুতে হয়। সারারাত সে এপাশ ওপাশ করে শুয়ে। সকাল হবে, সকাল পার হয়ে দুপুর, দুপুর গেলে বিকেল, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বিকেল যাবে, তারপর সেই আনন্দসাগরে ঝাঁপ দেওয়া, বেনোয়ার বেনো জলে ভেসে যাওয়া। নীলা ঘড়ির কাঁটার দিকে চেয়ে থাকে। কাঁটা এত ধীরে চলতে সে আর দেখেনি। তার তর সয় না।
সারা বিকেল সে বাথটাবে শুয়ে কাটাল। শরীরের আনাচ কানাচে যত ধুলো ময়লা দূর করে ভাল যত পোশাক আছে প্রতিটি পরে আয়নায় নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার দেখে যেটির তুলনা নেই সেটিই শেষ অব্দি নির্বাচন করে, পরে, চোখের ভুরুতে, পাতায়, কিনারে, গালে, ঠোঁটে রং লাগিয়ে, পয়জন-এর সবুজ শিশি উপুড় করে সারা গায়ে ঢেলে নীলা যখন তৈরি, তখন বাজে সাড়ে পাঁচটা। বাকিটা সময় অপেক্ষা, না নড়ে না চড়ে কেবল দুর্গামূর্তির মতো বসে থেকে অপেক্ষা। শুয়ে গড়ালে পোশাকের ইস্ত্রি ভেঙে যাবে, চুলের ঢেউ যাবে নষ্ট হয়ে, কিছু খেলে বা পান করলে, ঠোঁটের রং যাবে উঠে, নীলা তাই কিছুই করল না। কেবল বুকের শব্দ শুনল আর স্থির চোখে দেখল ঘড়ির কাঁটার দ্রুত পার হওয়া।
