নীলা দ্রুত বেরিয়ে যায় ভারী সুটকেসদুটো নিয়ে। একটি একটি করে সুটকেস ওপর থেকে নীচে নামায়, এখানে রামকিরণ নেই যে সুটকেস নামাবে, এখানে সিঁড়ির কাছে গাড়ি অপেক্ষা করছে না যে সে উঠে বসবে, চালককে গন্তব্য বলে দেবে। এখানে তার কোনও গাড়ি নেই, চালক নেই, এবং সবচেয়ে বড় যেটি নেই তার, সে হল গন্তব্য। নীচে নেমে, রাস্তায়, নীলার ইচ্ছে করে কাছের ফোন বুথ থেকে ফোন করে বেনোয়াকে।
কী বলবে! আমাকে তোমার বাড়িতে আশ্রয় দাও! লজ্জার কী আছে আর তার! সব লজ্জা কি আজ সারাদিন বেনোয়ার বেনোজলে ভেসে যায়নি!
নীলা প্রথম কিছুক্ষণ ইতস্তত করেও ফোন করে বেনোয়ার নম্বরে, বেনোয়া ফোন ধরেও।
কী করছ?
তোমাকে ভাবছি। হা হা।
সত্যি?
সত্যি সত্যি সত্যি।
আমিও ভাবছি তোমাকে।
বান্ধবী নিশ্চয় তোমাকে পেয়ে খুব খুশি?
নীলা থামে এখানে। বান্ধবী যে তাকে পেয়ে খুব খুশি হয়নি, এ কথা নীলার জিভে গড়াগড়ি খায়। জিভ থেকে খসে পড়লেই নীলা বেনোয়ার কাছে প্রমাণ করবে সে এ শহরে অবাঞ্ছিত এক মানুষ। নীলার ভয় হয়, আবার না বেনোয়ার কাছেও সে অবাঞ্ছিত হয়। যে কুকুরটিকে একজন লাথি দেয়, নীলা দেখেছে তাকে সবাই লাথি দেয়, তার ভয় হয়। জিভের গড়াগড়ি খাওয়া কথাগুলো ভেতরে ফিরিয়ে নিয়ে বলে সে, হ্যাঁ খুশি।
আমার কথা বলেছ ওকে?
বলেছি।
কী বলল?
বলল, তা ওর বাড়িতে গিয়ে থাকো না কেন? বলে নীলা অপেক্ষা করে, অপেক্ষা করে বেনোয়া বলবে, তা চলে আসছ না কেন আমার কাছে। আমার ক্ষুধিত তৃষিত তাপিত চিত, বঁধু হে, ফিরে এসো, আমার করুণ কোমল, এসো, ওগো, সজলজলদস্নিগ্ধকান্ত সুন্দর, ফিরে এসো, আমার নিতিসুখ, ফিরে এসো, আমার চিরবাঞ্চিত, এসো! আমার চিতসঞ্চিত, এসো! ওহে চঞ্চল, হে চিরন্তন, ভুজবন্ধনে ফিরে এসো! আমার বক্ষে ফিরিয়া এসো, আমার চক্ষে ফিরিয়া এসো, আমার শয়নে স্বপনে বসনে ভূষণে নিখিল ভুবনে এসো।
বেনোয়া হাসে, হেসে বলে, কাল কিন্তু ক্লজারি দ্য লিলা, একশো একাত্তর বুলেভার্ড মোপারনাস, মনে আছে তো?
নীলার নিশ্চয়ই মনে আছে। তার স্মরণশক্তি এখনও ধসে পড়েনি, তবে রেস্তোরাঁর খাবারের চেয়ে এই মুহূর্তে নীলার কাছে একটি চার দেয়ালের ঘর আর মাথার ওপর ছাদ সবচেয়ে বেশি প্রার্থনীয়।
জিজ্ঞেস করে সে, ওখানে যাব, খাব। তারপর?
তারপর আমার বাড়িতে কফি খেতে আসবে।
তারপর?
অনুমান করো।
অনুমান করতে পারছি না। আর জানো তো কফি খাই না আমি।
তাহলে আমাকে খাবে।
আমার এত খিদে নেই।
আছে।
কী করে জানো?
আমি জানি।
খুব অভিজ্ঞ বুঝি তুমি?
খুব না হলেও কিছুটা তো। বোঝোনি?
বেনোয়া হাসে একা একাই। নীলা চুপ হয়ে শোনে। শোনে, তোমার বান্ধবীকে বলে রেখো, কাল তোমার ফিরতে রাত হবে। ভেবো না, আমি পৌঁছে দিয়ে আসব।
.
হাতে অনেক টাকা থাকলে সে কোনও হোটেলে উঠত। কারও বাড়িতে ধরনা দেওয়ার, কাউকে বিরক্ত করার লজ্জা থেকে নিজে সে মুক্ত হত। কিন্তু এই মুহূর্তে সহায় হতে পারে এক কিষান আর সুনীল। অনির্বাণের সঙ্গে কিষানের যে কথা হয়েছে, তাতে সে জানায়নি যে নীলার পাট সে চুকিয়েছে। একটি ট্যাক্সি ডেকে প্রথম রু দ্য ফুবোই বলে নীলা, পরে মাঝপথে মত পালটে বলে, রু দ্য রিভলি।
চৈতালি ছিল বাড়িতে। নীলাকে দেখে চমকে ওঠে, তুমি কোত্থেকে?
নীলা টের পায়, কোথাও তাকে কেউ আশা করছে না। দানিয়েলও ঠিক এই সুরে এ কথা জিজ্ঞেস করেছে। কলকাতার মেয়ে কলকাতায় থাকবে এই ভেবে নিয়েছিল সবাই। প্যারিস নীলার জন্য নয়, অথবা নীলা প্যারিসের জন্য নয়, এরকম একটি সরল অঙ্ক কষা হয়ে গেছে চৈতালিরও। অনাহুত অবাঞ্ছিত চৈতালিকে পাশ কেটে সে ভেতরে ঢোকে।
কী ঘটনা, বলো। চৈতালি তার চমকানো চোখ নিয়ে জানতে চায়।
কিছু ঘটনা নয়। কলকাতা থেকে এলাম। থাকার জায়গা খুঁজে বেড়াচ্ছি। শেষ অব্দি এখানে…
এই তো একটু আগে কিষান ফোন করল। বলল ও সকালে বিমানবন্দরে গিয়েছিল, কথা তো ছিলই এমন!
নীলা বলে, আমার সঙ্গে কথা হয়নি।
বলল, তুমি নাকি এক ফরাসি ছেলের হাত ধরে চলে গেলে, ওর দিকে ফিরেও তাকাওনি!
নীলার মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে। জল চেয়ে খায়।
কী হয়েছে কী তোমার?
কিছু হয়নি তো!
নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে।
সোফায় গা ছেড়ে দেয় নীলা। সুটকেস পড়ে থাকে দরজার কাছে। চৈতালি বলে না সুটকেস ভেতরের ঘরে নিয়ে যেতে, বড় ধকলের কথাও বলে না, স্নান সেরে আসার কথাও না, কিছু খাবার কথাও না। অথচ এই চৈতালিই গতবার নীলা প্যারিস এলে আপন দিদির মতো স্নেহ ঢেলেছিল, গায়ের কোট খুলে ঢেকে দিয়েছিল নীলার গা, স্নান করতে পাঠিয়েছিল, খেতে দিয়েছিল। মানুষ কত তাড়াতাড়ি বদলে যায়! নীলা ভাবে।
মুখ চুন করে কিছুক্ষণ বসে থেকে চৈতালি সুনীলকে ফোন করে। কথা বলা শেষ করে নীলার সামনে আবারও মুখ চুন করে বসে।
কী বলল সুনীলদা?
শোনো নীলা! সুনীলের সঙ্গে কিষানের সম্পর্কটাই নষ্ট হয়ে গেছে তোমার কারণে। এখন কিষান যদি জানে যে তুমি আমাদের বাড়িতে উঠেছ, সুনীলের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগবে। ব্যাপারটা ভাল দেখায় না। স্বামীর কল্যাণকামনায় যে স্ত্রী সকাল সন্ধ্যা ঠাকুরকে ডাকে, সে স্ত্রীর জন্য এ অস্বাভাবিক নয় যে স্বামীর অমঙ্গল আশঙ্কায় সে বিষাদকাতর হবে, আর তার কাতরতা যতদূর ছড়ানো যায়, ছড়াবে।
