এত আনন্দ তার জীবনে কখনও আসবে সে ভাবেনি। এই নির্মম নিষ্ঠুর কুৎসিত পৃথিবীতে ভালবাসা যে এত গভীর হতে পারে, সঙ্গম যে এত অসম্ভব সুন্দর হতে পারে, আগে সে কখনও অনুমানও করেনি।
.
নীলার জীবনে, নীলার অলক্ষেই ঘটে যায় বেনোয়া দুপঁ।
৫. বেনোয়ার বেনো জল
বেনোয়ার বেনো জল
সারাদিন ঘোরে কাটে নীলার। সন্ধেয় দানিয়েলের বাড়িতে নীলাকে পৌঁছে দিয়ে বেনোয়া বলে যায়, কাল সন্ধে সাতটা। মোপারনাস, ক্লসারি দ্য লিলা। ঠিক তো?
ঠিক।
দানিয়েল ঘরেই ছিল, দরজা খুলে নীলাকে দেখে অবাক, তুমি প্যারিসে? কবে এলে?
আজ।
নীলা ঘরে ঢুকে দেখে ঘর সেই আগের মতোই, তবে ঘরে অন্য এক মেয়ে।
ও নাতালি, আমার প্রেমিকা।
নাতালি পাতলা জামা গায়ে বিছানায় শুয়েছিল। উঠে বসল। প্রথম পরিচয়ের বেলায় যা করে, হাতে হাত ধরে ঝাঁকানো, তা চলে নীলা আর নাতালিতে, আর দানিয়েলের সঙ্গে নীলার গালে গাল লাগিয়ে চুমু।
নাতালি প্রভান্সের মেয়ে, প্যারিসে নতুন এসেছে, এখন, হ্যাঁ এখানেই থাকবে। নাতালি মিষ্টি হাসে। ছোট করে কাটা বাদামি চুল মাথায়, বাদামি চোখ। বাদামি চোখদুটোও হাসে। নীলা কে, তার পরিচয় দিতে হয় না নাতালিকে, সে জানে, দানিয়েলই নীলার গল্প করেছে ওর কাছে।
আমি তো জানি তুমি আর ফিরবে না, প্যারিসে। দানিয়েল বলে।
নীলা চেয়ার টেনে বসে, ভেবেছিলাম ফিরব না, কিন্তু ফিরতে হল।
কোথায় উঠেছ?
নীলা এর উত্তর তক্ষুনি দিতে পারে না। দানিয়েলের বাড়িতে উঠেছে বলেই সে জানে। কিন্তু প্রশ্ন তার জিভকে ভারী করে রাখে।
দানিয়েল সিগারেটে লম্বা একটি টান দিয়ে বলে, প্রথমেই বলে নিই, এ ঘরে কিন্তু এখন নাতালি আর আমি থাকছি, তোমাকে অন্য কোথাও থাকতে হবে।
সিগারেটটি দানিয়েল নাতালিকে দেয় ফুঁকতে।
তা যাবে কোথায় জানো?
নীলা জানে না, দানিয়েলের এখানে আশ্রয় না মিললে সে যাবে কোথায়।
পকেটে রাখা বেনোয়ার ঠিকানা ফোন নম্বর লেখা কাগজটি সে স্পর্শ করে, যেন সে বেনোয়ার শরীর স্পর্শ করছে। শরীরে তার অদ্ভুত এক শিহরন জাগে। বেনোয়ার তীব্র শীৎকার এখনও তার কানে লেগে আছে, এখনও শরীর ভিজে আছে বেনোয়ার বেনো জলে। এখনও নীলা ঘোরে।
নাতালি সিগারেটটি আবার দানিয়েলকে দেয় ফুঁকতে।
টানবে মারিহুয়ানা?
নীলা কোনওদিন মারিহুয়ানার স্বাদ নেয়নি। স্বাদ নিতে গিয়ে, এক টানেই মাথা ঝিমঝিম করে নীলার।
ঘরে ছড়িয়ে আছে নাতালির জুতো জামা। বেড়েছে বই। টেবিলে একটির জায়গায় দুটো কম্পিউটার।
আমার ছবিগুলো? ইজেল? নীলা জিজ্ঞেস করে।
দানিয়েল মারিহুয়ানায় টান দিয়ে হাসে। হাসতে হাসতে বলে, ঘরে জায়গা নেই। ফেলে দিতে হয়েছে।
দানিয়েল মজা করছে, নীলা ভাবে।
সত্যি করে বলো, কোথায় রেখেছ ইজেল, আমি ছবি আঁকা শুরু করব আবার। নীলার দিকে একটি স্বপ্নশিশু হামাগুড়ি দিতে দিতে এগোয়।
দানিয়েল আবারও বলে, ফেলে দিয়েছি।
নীলার সংকোচ হয় ইজেল আর ছবি বিষয়ে আর কোনও প্রশ্ন করতে। দানিয়েল ওগুলো ফেলে দিয়েছে, এর অর্থ ওগুলো বিরক্তিকর ঠেকেছে তার কাছে, তাই যদি হয়, ওগুলোর প্রসঙ্গও বিরক্তিকর নিশ্চয়ই।
বদল করে সে প্রসঙ্গ, তোমার ওই মনিকের সঙ্গে কলকাতায় দেখা করেছিলাম।
তাই নাকি? মনিক চমৎকার মানুষ, তাই না? দানিয়েলের উচ্ছ্বাস উপচে পড়ে।
মনিক কলকাতা অন্ত প্রাণ। কলকাতা সম্পর্কে এত বিস্তর জ্ঞান তাঁর, এমন জ্ঞান কোনও কলকাতা বিশেষজ্ঞরও নেই। জঁ রাসিন কলকাতা বিষয়ে কী জানে, তার চেয়ে অনেক বেশি জানেন মনিক। এত ধুলো, এত ভিড়, এত নোংরা কলকাতা, তারপরও ওই কলকাতাকে ভালবেসে তিনি থেকে গেছেন ওখানে। গরিবদের দুহাতে সাহায্য করেন। এমন বড় হৃদয়ের মানুষ, সহসা দেখা যায় না। বাঙালি জাতিকে এত ভাল আর কেউ বাসেনি।
নীলা দানিয়েলকে থামিয়ে বলে, আমার মনে হয় না।
কী মনে হয় না?
মনে হয় না মনিক খুব বড় হৃদয়ের মানুষ। মনে হয় না তিনি কলকাতার মানুষদের সত্যিকার শ্রদ্ধা করেন। নীলা তার মনে না হওয়ার কথাকটি বলে শুধু, কেন তার মনে হয়, তা বলতে যাবার আগেই দানিয়েল বারুদের মতো জ্বলে ওঠে, চেঁচিয়ে চিলেকোঠা চৌচির করে,
তুমি এক আশ্চর্য চরিত্র নীলা। মোটেও তুমি লোককে বাহবা দিতে চাও না। মনিকের মতো মেয়ের প্রশংসা তুমি করতে চাও না। আমি তোমার জন্য কম করেছি? তোমার জন্য আমি কলকাতা পর্যন্ত গেছি, গেছি তোমার পাশে থাকার জন্য, তোমাকে সাহস আর শক্তি জোগাতে। তোমার জন্য ভেবেছি, তোমার জন্য করেছি, আর বিনিময়ে তুমি কী করেছ? জঘন্য ব্যবহার করেছ, যাচ্ছেতাই রকম অবহেলা করেছ, অপমান করেছ। এই প্যারিসে তোমার কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না, আমি তোমাকে আশ্রয় দিয়েছিলাম, আমি দিয়েছিলাম আমি। অথচ প্রথম দিনই তুমি আমার সঙ্গে মিথ্যে কথা বলেছ। বলেছ, নাচতে জানো না, অথচ তুমি নাচতে জানো। নিকলের বাড়িতে তোমাকে নেমন্তন্ন খেতে নিয়েছি, তুমি ইচ্ছে করেই ভাল কোনও ড্রেস পরোনি, পরে গেছ জিনস। এত তোমাকে খাতির করল নিকল, ওকে তুমি যাওয়ার আগে একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত বলোনি। ক্যাথারিনের বাড়িতে হঠাৎ গিয়ে হাজির হয়েছিলে, এমন অদ্ভুত আচরণ এ দেশে কেউ করে না, ক্যাথারিন না হয়ে অন্য কেউ হলে পুলিশ ডাকত, ও তোমাকে সাহায্য কম করেছে? তুমি জানতেই না কারখানার কাছে কোথায় রেস্তোরাঁ, ও তোমাকে চিনিয়েছে, পোস্টাপিস কোথায় তাও তো তুমি জানতে না, ও দেখিয়ে দিয়েছে। অথচ ওর সঙ্গে তুমি অনেকদিন হেসে কথা বলোনি। তুমি ভাবো, অন্যরা তোমার জন্য করবে, করাটা অন্যের দায়িত্ব আর তুমি রানির মতো বসে সব উপভোগ করবে আর যারা করবে তাদের দিকে তুমি অবজ্ঞা ছুড়বে, এভাবেই জীবন চলবে তোমার, ভেবেছ? দেখলাম তো কী বুর্জোয়া পরিবারের মেয়ে তুমি। খামোখা তো স্বভাব নষ্ট হয়নি। যা চাও, পেয়ে যাও হাতের কাছে, কোনও কিছু পেতে তোমার পরিশ্রম করতে হয় না। তোমার এই স্বভাব বদলাও নীলা, নাহলে ভুগে মরবে। কেউ তোমার দাস বা দাসী হবার জন্য বসে নেই। ইয়োরোপের ধনীরাও এত প্রাচুর্যের মধ্যে থাকে না, ভারতের মতো গরিব দেশে যেমন তুমি ছিলে। আর এখন এখানে এসেছ শ্রমিকের জীবন যাপন করতে? দারিদ্র্য পোহাতে? ধনীর আবার শখের শেষ নেই। তুমি ওই ইজেল চাইছ আর ছবি, ফেলে দিয়েছি। তুমি ছবি না, ছাই আঁকতে জানো! কিছু হয় না ওসব। ওগুলো ফেলে দেওয়ার মতো জিনিস, তাই দিয়েছি। আর বেশি কথা না। আমাদের নেমন্তন্ন আছে। বেরোতে হবে। তোমাকে আর সময় দিতে পারছি না নীলা। যথেষ্ট বিরক্ত করেছ আমাকে, আর নয়।
