আপনি আমার কাছে এখনও রহস্য। উদ্দেশ্য রহস্যের গভীরে যাওয়া।
নীলা তাকায় বেনোয়ার নীল চোখে। স্বপ্নে যে সব সুদর্শনকে প্রেমিক হিসেবে ভেবেছে এতকাল, বেনোয়ার সঙ্গে তাদের কারও তুলনা হয় না। বেনোয়া নীলার যে কোনও স্বপ্নপুরুষের চেয়ে বেশি সুদর্শন। সোনালি কটা চুল বেনোয়ার কপালে পড়েছে এসে, ইচ্ছে করে চুলগুলো সরিয়ে দেয় সে। ইচ্ছে করে চুল সরিয়ে দিতে গিয়ে স্পর্শ করতে বেনোয়ার উজ্জ্বল ত্বক।
ইচ্ছেকে প্রশ্রয় না দিতে নীলা জানালায় ফেরায় চোখ। আকাশে অদ্ভুত এক আলো। এরকম আলো নীলা কখনও দেখেনি।
কী অপূর্ব! নীলা গলা চেপে চিৎকার করে ওঠে। এত সুন্দর কী করে হয় রং?
ইচ্ছে করে দিগন্তের ওই রংগুলোকে স্পর্শ করতে, মুঠো মুঠো তুলে আনতে ওই রং, গায়ে মাখতে।
বেনোয়াও ঝুঁকে থাকে, জানালায়, নীলায়।
নীলা টের পায় না বেনোয়া তার হাতটি নিয়েছে হাতে, সে হাতে আঙুল বুলোচ্ছে।
নীলার চোখের মুগ্ধতার দিকে অপলক তাকিয়ে বেনোয়া বলে অপূর্ব!
তাই না?
তাই।
এত চমৎকার আলো আমি আর আগে দেখিনি।
আমিও না। এত আলো কোথায় পেলেন আপনি, নীলা?
নীলা চমকে তাকায়। দেখে বেনোয়ার চোখ আকাশে নয়, তার চোখে।
আপনি আকাশের আলো দেখেননি?
দেখেছি, আমি আপনার চোখের আলো দেখেছি।
নীলা জানে, বেনোয়ার এই আবেগ আর কিছুক্ষণ পর নিবে যাবে। প্যারিস পৌঁছে বেনোয়া বাই বলে নেমে যাবে। স্বপ্নালু চোখদুটো নেমে যাবে। হাজার অচেনা মানুষের স্রোতে ভেসে যাবে। আর নীলা দাঁড়িয়ে থাকবে, না কুলে, না জলে।
কিন্তু নীলাকে অবাক করে প্যারিস পৌঁছে বেনোয়া বলে, খুব তাড়া নেই নিশ্চয়ই আপনার। গার দ্য অস্তারলিজের উলটোদিকে যাবেন তো। আমার বাড়িতে এক কাপ কফি খেয়ে গেলে নিশ্চয়ই আপনার বান্ধবী রাগ করবে না খুব।
ও জানেই না আমি এসেছি। নীলা হেসে বলে।
তা হলে আপনার জন্য কেউ অপেক্ষা করছে না প্যারিসে? আমার সৌভাগ্য, চলন চলুন।
বেনোয়া গাড়ি রেখে গিয়েছিল বিমানবন্দরের গাড়ি পার্কিংয়ে। লাল পুযো।
নীলাকে তুলে নিয়ে সোজা রু দ্য রেনের দিকে যায় সে। প্যারিসের স্নিগ্ধ সুন্দর সকাল দেখতে দেখতে যায় নীলা, ফুসফুস ভরে হাওয়া নেয়। বসন্ত নাকি গ্রীষ্ম এখন, নীলা হিসেব করে না, সে হাওয়ায় বসন্তের ঘ্রাণ পাচ্ছে। কলাপাতা রঙের সবুজে ছেয়ে আছে ঘাস, সবুজ পাতার পোশাকে সেজে আছে প্যারিস। গাছে ফুল, ঘাসে ফুল, বাড়ির জানালায় ফুল, ফুলেশ্বরী প্যারিসকে নতুন চোখে দেখে নীলা।
বেনোয়া বাড়ির সামনে গাড়ি রেখে নিজের সুটকেস নামিয়ে নেয়, নীলার দুটো থেকে যায় পুয়োর পেটে।
সুন্দর সাজানো গোছানো বাড়ি বেনোয়ার।
নীলা জিজ্ঞেস করে, আপনার বউ বাড়ি নেই?
বউ থাকে স্টারসবুর্গে। ওখানে মেয়রের অফিসে চাকরি করে, ছুটিছাটায় প্যারিসে আসে।
বেনোয়া নিস্পৃহ কণ্ঠে বউয়ের স্টারসবুর্গ থাকার খবরটি দেয়। নীলা সোফায় বসে ঘরটি দেখে, আবছা আলো ঘরটিতে, জানালার ভারী পর্দা ফুড়ে আসছে সকালের রোদ। সোফার পাশে একটি বিছানা, তার পাশে গানের যন্ত্র, গানের যন্ত্রের পাশে একটি তাকে কিছু বই, কিছু সিডি, কিছু ভিডিও। ঘরটির সামনে খোলা রান্নাঘর, কফি বানানোর মেশিনে জল ঢালতে ঢালতে বেনোয়া জিজ্ঞেস করে, কফিতে চিনি?
আমি কফি খাই না।
তবে কী খান?
চা।
চা তো নেই।
তবে যাই বলে নীলা উঠে দাঁড়াল। কফি খেতে ডেকেছে বেনোয়া তাকে, কফি যে সে খায় না, তা আগে সম্ভবত জানানো উচিত ছিল তার, যেহেতু সে জানায়নি, চায়ের সরঞ্জামাদি জোগাড় করা এখন সম্ভব নয়, যেহেতু সম্ভব নয়, এবং তার পক্ষে কফি পান করাও সম্ভব নয়, তবে, নীলা অনুমান করে, তার বিদায় নেওয়াই ভদ্র আচরণ। নীলার যাই শুনে বেনোয়া কফি রেখে সামনে এসে দাঁড়ায় নীলার। চোখে চেয়ে থাকে। নীলা চোখ নামিয়ে নেয়।
পান করার কিছু নেই বলে চলে যেতে হবে? বেনোয়া জিজ্ঞেস করে।
নীলা উত্তর দেয় না, নখের তলের ময়লা খোঁটে।
নীলার হাতদুটো ধরে বেনোয়া নীলার কাছে সরতে থাকে, সরতে সরতে ধুকপুক করা বুকের কাছে। নীলা ছিটকে সরে যায়, আর ছিটকে সরে যাওয়া দ্য ভারতীয় সুন্দরীকে টেনে এনে বুকে জড়িয়ে গভীর চুমু খায় বেনোয়া।
কী হচ্ছে কী! নীলা নিজেকে ছাড়িয়ে বলে।
আমাকে পান করো নীলা, আমাকে পান করো। বেনোয়া নিবিড় কণ্ঠে বলে।
নীলার মনে হয় না এ বাস্তবে ঘটছে। মনে হয় এখনও সে বিমানের ভেতর বসা, আর আকাশের অদ্ভুত আলোর দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছে।
এমন চুমু নীলাকে কেউ খায়নি কোনওদিন। নীলা জানে না চুমু এরকম গভীর হতে পারে। তার সমস্ত শরীর অবশ মতো হয়ে আসে, আর অবশ মতো শরীরটিকে তুলে তুলো-মেঘের মতো নরম বিছানায় শুইয়ে দিয়ে একটি একটি করে জামা খুলে ফেলে। কী সুন্দর তুমি, নীলা ও নীলা, ভগবান তোমাকে নিজের হাতে গড়েছেন বলে বলে নীলার সারা শরীরে চুমু খায় বেনোয়া। চুলে কপালে কানে চোখে নাকে ঠোঁটে জিভে গালে চিবুকে গলায় ঘাড়ে পিঠে বুকে বাহুতে হাতে আঙুলে স্তনে পেটে তলপেটে নিতম্বে উরুতে উরুসন্ধিতে হাঁটুতে পায়ে নখে পায়ের পাতায়।
নীলার সারা শরীর ভিজে ওঠে চুমুতে। চোখ বুজে থাকে সে।
এত সুখ সে তার সাতাশ বছরের জীবনে কখনও পায়নি।
