জানে বলে এ যাত্রায় নীলা কোনও আগ্রহ দেখায় না বেনোয়ার লাগামছাড়া উৎসাহের।
বেনোয়া এই প্রথম ভারতে এল, ভারতের দিল্লিতে নেমেছিল, আগ্রা ঘুরে চন্দননগর গেছে, চন্দননগর থেকে কলকাতা, ওখানে দুদিন কাটিয়ে ফিরে যাচ্ছে প্যারিসে। ভালয় ভালয় ফিরছে, অসুখ বিসুখ কিছু করেনি। অবশ্য প্যারিসের ডাক্তার তাকে ভারতে যাবার আগেই ম্যালেরিয়া থেকে শুরু করে যত রোগ শোক আছে পৃথিবীতে সব কিছুর প্রতিরোধক দিয়েছিল। আফ্রিকা যাবার বেলাতেও তাই হয়েছিল বেনোয়ার।
আমার তো কোথাও গেলে ওষুধ লাগে না। আপনার লাগে কেন?
আমাদের লাগে।
আপনাদের মানে?
ইয়োরোপিয়ানদের। সাদাদের।
ও।
.
আচ্ছা, ভারতীয় মেয়েরা এত সুন্দরী হয় কেন?
নীলা চমকায় প্রশ্ন শুনে। কিন্তু এটিই প্রশ্ন বেনোয়ার, ভারতীয় মেয়েরা কেন এত সুন্দরী!
কই আমি তো সুন্দরী নই!
বেনোয়া হাসে।
ভারতীয় মেয়েদের যে এত মিথ্যে বলার অভ্যেস আছে, তা অবশ্য আমার জানা ছিল না।
বেনোয়া তার ভারত সফরে কোথায় কত মেয়ে দেখেছে, এবং কোথায় কোন মেয়েকে দেখে মনে হয়েছে, ভগবান নিজের হাতে তৈরি করেছেন, এবং রাস্তায় ভিখিরি মেয়েদের থেকেও সে চোখ ফেরাতে পারেনি, এসব বলে বলে নীলাকে বাইরের অন্ধকার থেকে ফেরায় এবং শেষে একটি কথাই জোর দিয়ে বলে যে এ তার অনেক বড় সৌভাগ্য যে সে একজন ভারতীয় মেয়ের পাশে বসে আছে এবং কথা বলছে। কিন্তু সে একাই বকবক করছে, নীলা যদি কেবল হ্যাঁ না বা আচ্ছা ছাড়া আরও কিছু বলে, কিছু পূর্ণ বাক্য টাক্য, বেনোয়া দুপঁর জীবন সার্থক হবে।
আমি সুন্দরী হব কেন? আমি তো সাদা নই।
সাদা মেয়েরা বুঝি সুন্দরী? সাদা মেয়েরা ফ্যাকাশে। দেখেছেন কেমন কুৎসিত ভঙ্গিতে হাঁটে, ফ্যাসফ্যাস করে কথা বলে। বুক চিতিয়ে, ঘাড় উঁচিয়ে, দেখতে কেমন উটের মত লাগে। এদের সঙ্গে ঘুমোনো যায়, কিন্তু প্রেম করা যায় না। বেনোয়া ঝুঁকে বলে, নীলার দিকে।
তাহলে এ অব্দি কোনও সাদা মেয়ের প্রেমে পড়েননি?
প্রেমে পড়েছিলাম এক ইথিওপিয়ার মেয়ের। আগুনের মতো সুন্দরী। কিন্তু সে মেয়ে,… গন উইদ দ্য উইন্ড।
প্রেম করলে ভারতীয় মেয়ের সঙ্গে করব। এ আমার সিদ্ধান্ত। বেনোয়া চোখ টেপে।
ভারতীয় মেয়ে পাবেন কোথায়? ভারতে তো থাকেন না।
না থাকি। প্যারিসে কি ভারতীয় মেয়ের অভাব আছে?
যারা আছে সবাই বিবাহিত।
আপনিও কি বিবাহিত?
আমিও।
বেনোয়ার কপাল ভাঁজ পড়ে সাতটা।
তবে যে বললেন কেউ নেই আপনার?
আমি স্বামীর সঙ্গে থাকি না। তাকে আমার কেউ বলে মনে হয় না।
বেশ জটিল ব্যাপার।
বেনোয়া এরপর নিজের বিয়ের কথা বলে, নিজে সে বিয়ে করেছে এক সাদাকে। একটি মেয়ে আছে, জ্যাকলিন, তরতর করে বড় হয়ে যাচ্ছে।
আপনার বয়স কত নীলা? কুড়ি পার হয়নি নিশ্চয়ই।
সাতাশ।
সাতাশ? দেখে, উনিশ মতো লাগে।
আপনার কত?
পঁচিশ।
পঁচিশ? নীলা অবাক হয়।
কেন দেখে কি বেশি বয়স লাগে? কত ভেবেছিলেন?
নীলা ভেবেছিল বিয়াল্লিশের নীচে নয়। কিন্তু কমিয়ে বলে তিরিশ কি বত্রিশ।
শুনে হা হা হাসে বেনোয়া, রীতিমতো বুড়ো বানিয়ে ফেলেছিলেন।
কপালে সাতটা, চোখের কোণে চার দ্বিগুণে আট মোট পনেরোটা ভাঁজ, কী করে সে ভাববে বিয়াল্লিশ নয়।
.
বিমানের ভেতর আলো নিবে যায়, ব্যাস চেয়ার পেছনে হেলিয়ে ঘুমিয়ে যাও সব। ঘুম না এলে টেলিভিশনে বোবা ছবি দেখো, শব্দ শুনতে চাইলে চেয়ারের হাতলে লাগানো শব্দ যন্ত্র কানে লাগিয়ে শব্দ শোনো।
টেলিভিশনের শব্দ শুনতে না চাও, গান শোনো। বেনোয়া ছবিও দেখবে না, শব্দ যন্ত্রও কানে লাগাবে না, গান শুনবে না, ঘুমোবেও না। একটির পর একটি লাল ওয়াইনের বোতল শেষ করছে আর বলছে, পাসকালের সঙ্গে তার চার বছর আগে বিয়ে হয়েছে, প্রথম প্রথম বেশ উত্তেজনা ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে কেমন যেন একঘেয়ে লাগছে, ঠিক এরকম ধরাবাঁধা জীবন সে চায়নি, অন্য কিছু চেয়েছিল, অন্যরকম কিছু।
কী রকম?
ঠিক জানি না কী রকম। তবে অন্যরকম।
বিমানের কেউ কেউ হাতের কাছের আলো বইয়ে ফেলে পড়ছে, কেউ হাঁ হয়ে আছে টেলিভিশনের দিকে। কেউ চেয়ারে ঘুমোচ্ছ, কেউ আবার তিনটে চেয়ার দখল করে লম্বা হয়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছ। বেনোয়া ফিসফিস করে, কারও যেন ঘুম না ভাঙে, আর ফিসফিসের কারণে তার নীলার দিকে সরে আসতে হয় অনেকটা। নীলারও সরতে হয় বেনোয়ার দিকে অনেকটা।
প্যারিসে কোথায় থাকেন?
ছিলাম গার দ্য নর্দের কাছে, এরপর পাঁচ এরনদিসময়, গার দ্য অস্তারলিজের কাছে, এক বান্ধবীর বাড়িতে।
এখন কি বান্ধবীর বাড়িতেই উঠবেন।
ঠিক জানি না।
আপনি কি সমকামী?
নীলা জানালায় তাকায়, অল্প অল্প আলো ফুটছে।
না কি উভকামী?
.
নীলা উন্মূল উদ্বাস্তুর মতো, বেনোয়াও তা টের পায়। নীলার কণ্ঠেও তা, অনিশ্চয়তা।
প্যারিসে কারও সঙ্গে প্রেম করেননি?
নীলা মাথা নাড়ে।
কোনও ফরাসি প্রেমিক?
না।
আপনি কি সবসময়ই কথা এত কম বলেন।
কম বলছি কোথায়!
আমি একটু বাচাল তা জানি। কিন্তু ভারতীয়রাও বাচাল শুনেছি। আপনাকে আমার ভারতীয়র চেয়ে ইয়োরোপিয়ান মনে হচ্ছে বেশি।
ইয়োরোপিয়ানরা কি কম কথা বলে?
মেপে কথা বলে। যার তার সঙ্গে বলে না। খামোখা বলে না।
আপনিও না?
মেপে হয়তো বলছি না, কিন্তু খামোখা বলছি না।
কী উদ্দেশ্য শুনি?
