অনির্বাণ প্যারিসে ফোন করে কিষানলালকে জানিয়ে দেন নীলা কখন কটায় গিয়ে পৌঁছবে। পিতার কর্তব্য করেন তিনি।
বিমানবন্দরের ভেতরে ঢোকার আগে, নিখিল পকেট থেকে একটি কৌটো বের করে নীলার হাতে দেয়, এটা রাখ।
কী এটা?
মার ছাই।
মা আমার কাছে মা, ছাই নয়। নীলা ফিরিয়ে দেয় কৌটো।
.
বিমানে ঢুকে চেয়ারে হেলান দিয়ে কলকাতাকে অ রভোয়া বলে নীলা।
তারপর জিজ্ঞেস করে নিজেকে, নীলা তুমি জানো তুমি কোথায় যাচ্ছ? কার কাছে যাচ্ছ?
নিজেকেই উত্তর দেয় সে, না।
তুমি কি জানো তোমার এই জীবন নিয়ে কী করবে তুমি?
না।
.
বেনোয়া দুপঁ
দমদম থেকে শার্ল দ্য গোল।
মাঝখানে বেনোয়া দুপঁ ঘটে যায়।
নীলা বসেছিল জানালার ধারে, পাশের আসনে বেনোয়া। সোনালি চুলের বেনোয়া। নীল চোখের বেনোয়া। গোলাপি ঠোঁটের বেনোয়া। ফরাসি যুবক বেনোয়া। ছ ফুট তিন ইঞ্চি বেনোয়া। নীল জিনস বেনোয়া। সাদা টিশার্ট বেনোয়া। কালো বুটজুতো বেনোয়া। ম্যাক ল্যাপটপ বেনোয়া।
.
চোখে চঞ্চলতা বেনোয়ার, বারবার নীলায়, নীলার উদাস চোখে, এলো চুলে, গালের কালো তিলে, কপালের ছোট্ট কাটা দাগে। মাথার ওপরের ছোট আলো ল্যাপটপে আর বেনোয়ার চোখের আলো নীলায়, জানালায় মাথা রেখে বাইরের অদ্ভুত অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকা নীলায়। অন্ধকার সরিয়ে উজ্জ্বল একটি তারা খোঁজা নীলায়।
সাদা মেঘবালিকারা পাখির মতো উড়ে উড়ে যাচ্ছে কোথাও, বাড়ি ফিরছে! সবাই বাড়ি ফেরে, মেঘেরাও, কেবল নীলাই ফেরে না।
রাতের খাবার নিয়ে এলে, নীলা বলে দেয় সে খাবে না।
বেনোয়া শুরু করে এভাবে, অন্ধকারে কী দেখছেন এত?
আমাকে বলছেন?
হ্যাঁ আপনাকেই।
ম্লান হেসে বলে নীলা, অন্ধকারে অন্ধকার দেখছি।
অন্ধকারে কিছু কি দেখা যায়?
যায়, অন্ধকার দেখা যায়।
অদ্ভুত।
অন্ধকারেরও রূপ আছে। অন্যরকম।
বেনোয়া শ্যাম্পেন পান করে ধীরে। বলে, আমার দেখা হয়নি কোনওদিন।
.
শ্যাম্পেন শেষ করে খাবার খেতে খেতে বেনোয়া আবার বলে, এই বিমানে সম্ভবত আর কেউ নেই যে কিছু খাচ্ছে না, পান করছে না। কেবল অন্ধকার দেখছে।
নীলা ফেরে না।
প্যারিস যাচ্ছেন বেড়াতে?
নীলা ফেরে না।
দুঃখিত, আমি বোধহয় আপনাকে বিরক্ত করছি।
নীলা ফেরে, কিছু বলছেন আমাকে?
প্যারিস যাচ্ছেন বেড়াতে?
নাহ!
তবে?
থাকতে।
প্যারিসে কী করছেন, লেখাপড়া?
না।
চাকরি?
না।
বেনোয়ার চোখে নীল কৌতূহল, তার চোখের নীল মণির সঙ্গে গাঢ় নীল হয়ে সেঁটে থাকে।
ওখানে কি একা থাকেন? না কি সংসার আছে?
নীলা উত্তর দেয় না।
ওখানে আত্মীয় আছে?
নীলা মাথা নাড়ে। নেই।
তবে কে আছে?
কেউ নেই।
তাহলে বলুন একা থাকেন ওখানে।
খাওয়া শেষ হওয়ার পরও বেনোয়া লাল ওয়াইনের নতুন বোতল নেয়।
আমি বেনোয়া দুপঁ।
নীলা মাথা নাড়ে, শুনেছে সে যে সে বেনোয়া দুপঁ।
আপনি? আপনার নাম?
নীলা।
নীলা, দ্যা ভারতীয় সুন্দরী।
.
নীলা স্পষ্ট বুঝতে পারে, বেনোয়া দুপঁ তার সঙ্গে কথা বলতে চায় আরও। এরকম হয়, দীর্ঘ বিমানযাত্রায় একঠায় বসে থাকা ক্লান্তিকর বলে পাশের যাত্রীকে কোথায় যাওয়া হচ্ছে, কেন যাওয়া হচ্ছে, কী করা হয়, কোথায় থাকা হয়, বিয়ে হয়েছে কি না, বিয়ে হলে বাচ্চা কাচ্চা হয়েছে কি না, বাচ্চা কাচ্চা হলে বয়স কার কত, কী খেতে পছন্দ, কী গান পছন্দ, কোনও বিশেষ শখ আছে কি না, থাকলে কী, যদি কোনও বইয়ে চোখ বুলোতে থাকে পাশের জন, কী বই এটা, কার লেখা, এই লেখক আর কী বই লিখেছে, কোনটা তার পড়া হয়েছে, কোনটি হয়নি জিজ্ঞেস করে বারো ঘণ্টার যাত্রাকে কমিয়ে অন্তত দু ঘণ্টায় আনা যায়। বেনোয়া দুপঁ এই একঘেয়ে বসে থাকার চেয়ে পাশের রহস্যময়ীর রহস্য উদ্ধারে ব্যস্ত হতে চাইছে। গতবার প্যারিস যাওয়ার সময়, নীলার পাশের আসনে বসে থাকা ওলন্দাজ মেয়েকে নীলা এরকমই প্রশ্ন করেছিল, যত না একঘেয়েমি কাটাতে তার চেয়ে বেশি সাদা রঙের আকর্ষণে, সাদা রং কী করে, কী খায়। বয়স তেতাল্লিশ গাব্রিয়েলার, পাঁচ বছর ধরে ভারত থেকে কাপড় কিনে নিয়ে যায় নিজের দেশে বিক্রি করতে, কেবল কাপড় নয়, পাথরের মালা, দুল, আগরবাতি, শিবমূর্তি। কত টাকায় কেনে, কত লাভ হয়, কত টাকা বাড়িভাড়া দিতে হয় তার, কত টাকা খাওয়ার খরচা, কত যায় ভ্রমণে এসবের হিসেবও দিয়েছিল, আরও ব্যক্তিগততে গিয়ে বলেছিল, বিয়ে থা করেনি সে, একা থাকে, তবে একেবারে একাও নয়, মাঝে মাঝে প্রেম হয়, প্রেমিকের সঙ্গে দুবছর একবছর কাটানোও হয়, গাব্রিয়েলার শেষ প্রেমিক ছিল আবু নাসের, মিশরের ছেলে, মাস দুই পর নাসেরকে সে বলেছে ব্যস, যথেষ্ট হয়েছে, এবার বিদেয় হও, নাসের বিদেয় হওয়ার লোক ছিল না, শেষে পুলিশ ডেকে বিদেয় করতে হয়েছে। তারপর গভীর ব্যক্তিগততে গিয়ে বলেছিল, নাসের দুমিনিটে কাত। হা হা। কখনও গেছ আমস্টারডামে? না। কী আছে দেখার? পতিতা। পতিতা দেখার জিনিস? নিশ্চয়ই। রাস্তার কিনারে সারি সারি কাচের ঘরে পতিতারা উলঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকে, তাই দেখতে লক্ষ লোকের ভিড় হয় ও শহরে। নীলা ওয়াক করে। আর কী আছে দেখার? আর দেখার আছে স্বাধীনতা। কী রকম? উড়ে বেড়াবার। মারিহুয়ানার ধোঁয়া পিঠে দুটো পাখা বসিয়ে দেয়, তারপর শহর জুড়ে উড়ে বেড়াও, নেচে বেড়াও হা হা। বিমান থামলে সেই গাব্রিয়েলা বাই বলে নেমে গেল, পেছন ফেরেনি, নীলার ঠিকানাও নেয়নি, নিজেরটিও দেয়নি। প্যারিস থেকে কলকাতা যাবার পথেও প্রায় ওরকম হয়েছিল। নীলার পাশে এক শিখ যুবক তার জীবনের শুরু থেকে শেষ অব্দি নিজের জীবনের সব গল্প বলে নীলার গল্প শুনে গুরুনানকের জীবনের নানা দর্শন বর্ণনা করে কলকাতায় নেমে গেল। নীলা জানে ওই শিখের সঙ্গে নীলার আর কখনও দেখা হবে না, শিখের নামটিও নীলার জানা হয়নি। সে জানে নাগাড়ে বারো ঘণ্টা বসে থাকাকে কেবল বসে থাকা যেন না মনে হয় সে কারণে গল্প বলা এবং শোনা।
