বাড়ির উঠোনে সেদ্ধ ভাত ছড়িয়ে নিখিল আকাশে তাকিয়ে কা কা কা কা করছে।
কা কা শব্দ শুনে কাক এসে ছড়ানো ভাত খাবে, তারপর নিখিল খাবে। মাতৃদায় সহজ জিনিস নয়, কাককে খাইয়ে তবে নিজে খেতে হয়।
নিখিলের পেছনে দাঁড়িয়ে নীলা বলে, আচ্ছা তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো যে মা কাক হয়ে গেছেন?
পাগল নাকি তুই? নিয়ম, তাই করতে হয়। নিখিল আকাশ থেকে মুখ না ফিরিয়ে বলে।
নিজেকে কমুনিস্ট বলো, আবার তারাপীঠের মন্দিরে গিয়ে ফুল দাও, খাবার আগে কাক খাওয়াও! মেলে না কিছু। নীলা মরা সবজি বাগানে একটি পচা টমাটো পায়ে চটকে বলে।
শুনে নিখিল শুকনো ঠোঁটে হাসে। নীলা টেনে নিয়ে যায় নিখিলকে ঘরের ভেতর। গলার ধড়া খুলে নেয় এক টানে, ইস কী অবস্থা, এই পরেই স্নান করছ, গায়েই এই কাপড় শুকোচ্ছ! জামা পরো তো, খোলো এসব। এভাবে মায়ের ঋণ থেকে মুক্ত হওয়া যায় না। যত্তসব অদ্ভুত রীতি। যাও স্নান করে এসো, জামা জুতো পরে এসো, চলো কোনও ভাল রেস্তোরাঁয় গিয়ে খেয়ে আসি।
বাদ দে। আর কটা দিন মাত্র আছে। নিখিল ক্লান্ত গলায় বলে। সে যাবে না কোথাও, সেদ্ধ শাকান্নই খাবে।
তবে কাকের আগে নিজে খাও। নীলা নিখিলের মুখের ভেতর খাবার ঠেলে দেয়।
খেয়ে, ঘরের গুমোট গরম থেকে বেরিয়ে মাঠে ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসে নিখিল। চমৎকার হাওয়া দিচ্ছে।
নীলাও পাশে এসে বসে।
দাদা সত্যি করে বলো তো, তুমি কি এই ধর্ম কর্ম হিন্দু আচার এসব আসলেই বিশ্বাস করো?
এসব কি বিশ্বাসের জিনিস?
তা হলে করো কেন?
এক ধরনের মজা আছে এসবে।
মজা? আমি তো কোনও মজা দেখি না। যুক্তিহীন জিনিস সব। ফালতু আবেগ।
ধর, আজ যদি পুজো উঠে যায়, তোর কি ভাল লাগবে? খালি খালি লাগবে না? উৎসবের আনন্দ আর কোথায় পাবি।
তোমার মনে আছে দাদা, এই মাঠে আমরা যখন লুকোচুরি খেলতাম, তুমি ওই বেদিটার পেছনে বেশির ভাগ সময় লুকোতে! আর তোমাকে সবার আগে খুঁজে পেতাম আমি।
তোর লুকোনো ছিল অন্যরকম। আমগাছের মগডালে।
মনে আছে সেই প্রফুল্লদের বাড়ির পেয়ারাগাছের কথা? তুমি গিয়ে সব পাকা পেয়ারাগুলো চুরি করে আনলে..আর প্রফুল্ল বাবার কাছে বিচার নিয়ে এল।
নিখিল হা হা হাসে।
কেমন লেগেছিল বাবার পিটুনিগুলো? উফ।
আর রাতে, পূর্ণিমা রাতে, এত বাড়িঘর ওঠেনি তখন আশপাশে, মা মাঠে বসে রজনীকান্তের গান গাইতেন, সে কী চমৎকার গানের গলা ছিল মার…
অনেকক্ষণ দুজনের কেউ কোনও কথা বলে না।
সূর্যাস্তের আকাশের লালচে রঙের দিকে উদাস তাকিয়ে নীলা নীরবতা ভাঙে, জানো দাদা, মা একদিন ফিরে আসবেন। ফিরে কলতলায় পায়ের কাদা ধুতে ধুতে বলবেন, হঠাৎ দার্জিলিং গিয়েছিলাম, তোরা সব ভাল ছিলি তো! দার্জিলিঙের গল্প শোনাতে শোনাতে মা আমাদের খাওয়াবেন রাতে, নেপথলিনের গন্ধঅলা লাল পাড় শাড়ি পরে এই মাঠে বসে মা আমাদের আগের মতো গান শোনাবেন…
নীলা চকিতে উঠে দাঁড়ায়, বলে, আজ রাস্তায় দেখলাম, পঁচাশি বছরের এক বুড়ো হেঁটে যাচ্ছে। ওর কী দরকার ছিল বেঁচে থাকার। কাউকে বাঁচতে দেখলে অসম্ভব রাগ হয় আমার। পৃথিবীর সব গাছ যদি মরে কাঠ হয়ে যেত, পাহাড়গুলো ধসে যেত বাড়িঘরের ওপর, নদী সমুদ্র শুকিয়ে চর হয়ে যেত, সেই চরে পশুপাখি মানুষ এক বিষম অসুখে কাতারে কাতারে মরে যেত! আর এই কুৎসিত পৃথিবীটা যদি মহাকাশে ছিঁড়ে পড়ত হঠাৎ, সুর্যের দু হাত কাছে গিয়ে ঝলসে যেত, ছাই হয়ে যেত।
নীলা খেয়াল করে তার গা কাঁপছে। শিথিল হয়ে যাচ্ছে সমস্ত শরীর। নিখিলের পাশে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ে সে, ক্ষীণ কণ্ঠে বলে, জানো দাদা, আমার খুব একা লাগে। ভীষণ একা লাগে।
তুই কি সত্যি প্যারিস চলে যাচ্ছিস?
আমার কি না যেয়ে উপায় আছে, দাদা?
কবে ফিরবি?
কোথায়?
কোথায় আবার? কলকাতায়।
নীলা উত্তর দেয় না।
বাবার কথায় রাগ করেছিস তো! তুই চলে গেলে আবার ঠিক ঠিকই ভেবে মরবেন, কেমন আছিস ওখানে, সুখে আছিস তো!
সুখ! দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসে সুখ শব্দটি।
বাবা জানেন না কিষানলাল যে বিয়ে করেছিল আগে। আমি সেদিন মাত্র জানলাম, সুনীল বলল। কাউকে বলিনি।
বোলো না। কী দরকার। বাবা আবার চুনকালির ভয়ে অতিষ্ঠ হবেন।
তুই সে কারণেই কিষানকে ছেড়ে গিয়েছিলি, তাই বলল সুনীল। ও বিয়ে নাকি অনেকটা পাতানো বিয়ে ছিল, নাগরিকত্ব পাবার জন্য। ওটাকে ধরিস না।
ধরছি না।
এবার গিয়ে ভাল একটা শ্যানেল পাঠাস তো, আগে যেটা পাঠিয়েছিলি, নকল ছিল।
নকল কী করে বুঝলে?
মোটে গন্ধ নেই। কলকাতা থেকে যে শ্যানেল কিনি, ওতে কড়া গন্ধ থাকে।
আমি যেটা পাঠিয়েছিলাম, সেটাই আসল শ্যানেল।
ওটা কবেই ফেলে দিয়েছি।
আসল ফেলে নকলটা ব্যবহার করছ তো! আমার অতগুলো টাকা জলে ফেললে।
নীলার ভাল লাগছিল ওভাবে ঘাসে শুয়ে থাকতে। ফুরফুরে হাওয়ায় নীলার চুল উড়ছিল। পাখিরা ঝাঁক বেঁধে ঘরে ফিরছে। পাঁচিলের ওপর প্রতিবেশীর দুটো বেড়াল বসে ছিল, ওরাও লেজ গুটিয়ে ফিরে যাচ্ছে।
নিখিলও একসময় বলে, যাই ইন্টারনেটে চ্যাট করি গিয়ে।
নীলা শুয়ে থাকে ঘাসে। আকাশে একটি একটি তারা ফুটতে থাকে, আর নীলা একটি উজ্জ্বল তারা খোঁজে। নীলা যখন ঘোট, মলিনা একবার বলেছিলেন, মানুষ মরে গেলে আকাশে তারা হয়ে ফুটে থাকে।
.
নীলার যাবার দিন, মঞ্জুষা এসে নীলার সুটকেস গুছিয়ে দিতে দিতে বারবারই বলেন, মানিয়ে থাকিস কিষানলালের সঙ্গে। বিয়ে তো তোকে জোর করে কেউ দেয়নি, তোর নিজের ইচ্ছেতেই হয়েছে।
