জুতোর সুকতলি খসিয়ে অন্তত একটি ব্যাপার নীলা সম্ভব করতে পারে, হাজার পঞ্চাশেক টাকা সে তুলতে পারে, বাকিটা তার প্যারিসের ব্যাঙ্কে পাঠাতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও ঠিকঠিক জমা দিতে পারে, যদিও কবে টাকাটা প্যারিস পৌঁছবে, সে সম্পর্কে মাড়োয়ারি সঠিক কিছু বলতে পারেনি। অনিশ্চয়তার হাতে ভবিষ্যৎ ছেড়ে দিয়ে নীলা টিকিট কেনে।
প্রতিদিন বিমান যায় না কলকাতা থেকে প্যারিস, গেলে নীলা সেদিনই কে এল এম-এ চড়ে বসত। দিল্লি বোম্বেতে যে সুবিধে তা কলকাতায় নেই। দিন দিন পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে পড়ছে ভারতের আর সব রাজ্য থেকে। এখানকার বাঙালি বাবুরা বাণিজ্যে মন না দিয়ে লেখাপড়ায় মন দেন বেশি, রাজনীতিও ভিন্ন, সমাজতন্ত্রের জয়জয়কার, যে দলই কেন্দ্রে যায়, চুলের মুঠি ধরে সমাজতন্ত্রকে নামাতে চায় পশ্চিমবঙ্গের মঞ্চ থেকে, আর নামাতে গেলে রাস্তাঘাট থাকা চাই ভাঙা, কলকারখানা থাকা চাই অচল, বিমানবন্দরে চাই যত কম বিমান, অর্থনীতি ধসিয়ে সমাজতন্ত্র ভাঙার ঝনঝন শব্দ শুনতে কান পেতে আছে কেন্দ্রের বাবা।
.
দু সপ্তাহ অপেক্ষা করা ছাড়া নীলার গতি নেই। দু সপ্তাহ নীলার কাছে দু বছর মতো সময় মনে হয়। নীলা পালাতে চায় এই নোংরা সমাজ থেকে। কলকাতাকে তার আর আপন মনে হয় না, এ শহরে তার জন্ম, এ শহরে কেটেছে তার শৈশব কৈশোর, অথচ এ শহরকেই তার মনে হতে থাকে সবচেয়ে অচেনা, যেন এ শহরের সঙ্গে কোনওদিন তার কোনও ভাব ছিল না, এ শহরের ধুলোয় শরীর মেখে সে খেলেনি কোনওদিন, গঙ্গার হাওয়ার সঙ্গে মনে মনে তার কোনওদিন কোনও কথা হয়নি। কলকাতা এখন নীলার কাছে আস্ত একটি শ্মশান, যে শ্মশানে দাঁড়িয়ে প্রতিরাতে একটি কুকুর কাঁদে, আর কোণে নেশাগ্রস্ত পড়ে থাকে চিতা জ্বালানোর কজন লোক। কলকাতা ছিল মলিনার ধনেখালি শাড়ির আঁচল, যে আঁচলে ঘাম মুছে, চোখের জল মুছে দাঁড়িয়ে থাকতেন মলিনা, দরজায়। কলকাতা ছিল মলিনার গভীর কালো চোখ, যে চোখ ডানা মেলে উড়ে যেত, রোদ্দুরে, রাত্তিরে, যেখানেই নীলা ভাসে, ডোবে, পাড় পায়, খুঁজত নীলাকে। কলকাতা ছিল মলিনার এলো চুলের হাতখোঁপা, ভেঙে পড়ত, হেলে পড়ত, রাজ্যির শরম ঢাকত নীলার। কলকাতা ছিল মলিনার হাতে সর্ষের তেলে মাখা মুড়ি, মেঘলা দিনে ভাজা ইলিশ, ভুনি খিচুড়ি। কলকাতা ছিল মলিনার হাতের ছ জোড়া রঙিন চুড়ি। কলকাতা ছিল বাড়ির আঙিনায় মা মা বলে ডাকার আনন্দ। কনকনে শীতে মলিনার কাঁথার তলে গুটিসুটি শুয়ে পড়া, ভোরবেলা শিউলি ছাওয়া মাঠে বসে ঝাল পিঠে খাওয়া, অন্ধকারে মুড়ে, দূরে, নৈঃশব্দ্যের তলে মাটি খুঁড়ে কলকাতাকে পুরে, পালিয়েছে কারা যেন, কলকাতা বলে কেউ নেই এখন, কিছু নেই নীলার। খাঁ খাঁ একটি শ্মশান সামনে, একটি কুকুর, আর কজন নেশাগ্রস্ত লোক।
ফোঁসকা পড়া গরমে ঘেমে নেয়ে মনিকের ছায়ায় মায়ায় আশ্রয় নেয় নীলা।
কলকাতার নয়, ফরাসি দেশের গল্প বলো মনিক।
মনিক লাল অমৃতে ডুবে ফরাসি দেশের গল্প বলেন। অলস দুপুর জুড়ে লুলু ভুলু বারান্দায়, মনিকের গাড়ির চালক সুরঞ্জিত আগুনের হলকা থেকে গা বাঁচাতে গাছের ছায়ায়, রাঁধুনি বিন্দিয়া গুনগুনাচ্ছে, বিনুনি বাঁধছে, মালি হরিদাস লুলু ভুলুর পাশে গল্প বলা দাদার মতো শুয়ে আছে। আর ঠাণ্ডা ঘরে বসে মনিকের সবুজ চোখ ঝলমলিয়ে ওঠে গল্প বলতে বলতে। দক্ষিণ ফ্রান্সের শাতো মনতান-এ তার পূর্বপুরুষের বাস ছিল, এখনও সেই শাতোয় গিয়ে সেই হরিণ মাথার দিকে, সেই নিখুঁত তাপেসিরি পলকহীন চোখে দেখে। মনিকের প্রতি লোমকুপ থেকে ছিটকে বেরোতে থাকে আভিজাত্যের অহংকার। পরক্ষণেই, শাতো মনতান ভেঙে পড়ার নির্মম দৃশ্য কল্পনা করে তাঁর লোমকূপ বুজে যেতে থাকে, বাস্তিল ভাঙার দৃশ্য যেন তিনি নিজের চোখে দেখছেন, বিপ্লবের বিকট চিৎকার যেন নিজের কানে শুনছেন, কেঁপে ওঠে মনিকের স্তনজোড়া, ভয়ে।
তারপর তো ওই, ইগালিতে। ইগালিতে শব্দটি দুবার উচ্চারণ করেন তিনি।
.
আমি কাল দিল্লি যাচ্ছি তিনদিনের জন্য, কিন্তু বিষম দুশ্চিন্তায় পড়েছি। এই তিনদিন লুলু ভুলুকে খাওয়ানোর লোক পাচ্ছি না। মনিকের চোখে শ্যাওলা রঙের দুশ্চিন্তা।
তুমি এ কাজটা করবে নীলা? তোমাকে আমি চাবি দিয়ে যাচ্ছি। দেখিয়ে দিচ্ছি কোথায় খাবারগুলো রাখা, রেফ্রিজারেটরে কিছু, বাইরে কিছু, দু বোতল বিশুদ্ধ জল। তিনবার জল বদলাবে, আর খাবার দেবে দু বেলা।
নিশ্চয়ই করব। এ কোনও ব্যাপার হল! কিন্তু…
কিন্তু কী?
বিন্দিয়া, হরিদাস, আর ওই সুরঞ্জিত,ওরা থাকছে না?
তা থাকছে।
মনিক সিগারেট ধরান। ধোঁয়া ছুঁড়ে দিয়ে দেয়ালে টাঙানো সুনীল দাসের ঘোড়ায়, বলেন, থাকছে কিন্তু…
কিন্তু কী?
কিন্তু আমার লুলু ভুলু তো এখানকার কুকুরদের মতো আবর্জনা খায় না, ফেলে দেওয়া হাড় হাড্ডিও খায় না। ওদের জন্য প্যারিস থেকে প্যাকেটের খাবার আসে।
তো?
আমার সন্দেহ হয়, ওরা লুলু ভুলুকে খাওয়াবে না। মনিক গলা নিচু করে বলেন।
নীলা উৎসুক জানতে, খাওয়াবে না কেন?
কারণ ওরা নিজেরা ও খাবার খেয়ে ফেলবে।
নিজেরাই খেয়ে নেবে? বলো কী! কখনও খেয়েছে আগে?
খায়নি।
তবে?
খেতে পারে।
বিশ্বাস কী! খেতে পারে।
.
নীলা বিষম এক বিবমিষা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।
