নীলা তার ঘরটিতে চোখ বুলোয়। তার বিছানা বালিশ, তার বইপত্র, শাড়ি কাপড়, পুরনো চিঠি, তার শখের তানপুরা, হারমোনিয়ম সব এ ঘরেই। প্যারিসের সুটকেসের জীবনের মতো জীবন নয়, অনেক প্রসারিত।
কী কারণে নীলাকে প্যারিস যেতে হবে? কারণ হল আত্মীয়রা এমনকী পড়শিরাও কানাঘুষা করছেন, নীলা বুঝি স্বামী ছেড়ে দিয়ে এসেছে।
হ্যাঁ এসেছি। তো ওদের হয়েছে কী?
অনির্বাণ গলা ফাটিয়ে বলেন, ওদের কিছু হয়নি। হয়েছে আমার। আমার আর এ সমাজে মুখ দেখানো যাবে না। বংশের মুখে চুনকালি দিতে চাস?
স্বামীর সঙ্গে যদি আমার না মেলে, তবে এ কি চুনকালি দেওয়া হল?
হল। অনির্বাণ জোর দেন এই হল-য়।
এই সমাজে থাকতে হলে, সমাজের আর দশটা লোক যেন ভাল বলে সেভাবে থাকতে হবে। প্যারিসে স্বামীর বাড়ি ফিরে যা, নয়তো মিঠুর মতো আত্মহত্যা করে আমাদের মুক্তি দে। এই আমার শেষ কথা।
অনির্বাণ তাঁর শেষ কথা বলে চলে যাওয়ার পর নীলা বাথটাবের ঠাণ্ডা জলে শুয়ে থাকে অনেকক্ষণ। না, চোখে এক ফোঁটা জল নেই নীলার।
.
গভীর রাতে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেলে, মলিনার খালি ঘরের খালি মেঝেয় শুয়ে একটি বাহু ছড়িয়ে দিয়ে সামনে, যেমন করে প্রায় রাতে এসে মলিনার গায়ের ওপর বাহু ছড়িয়ে, নীলা ঘুমোত, ফিসফিস করে বলে, মা তুমি নেই কেন? প্রদীপের আলোয় পিঠ করে শোয়া নীলার ছায়া বিশাল দৈত্য হয়ে তাকেই ছিঁড়ে খেতে আসে। নীলা সিদ্ধান্ত নেয় সে কলকাতা ছেড়ে যাবে।
মায়ের শ্রাদ্ধটা শেষ করেই যা। অনির্বাণ থেকে শুরু করে মলিনার কাছের দূরের সব আত্মীয় বলেন।
মলিনার শ্রাদ্ধে নীলার এতটুকু আগ্রহ নেই। লোক খাওয়ানো, পুরুত খাওয়ানো, এসবে সে কোনও যুক্তি দেখে না।
তোর মার আত্মা কষ্ট পাবে, এমন করিস নে।
নীলা হেসে বলে, মার কষ্ট সয়ে অভ্যেস ছিল, মার আত্মাও কষ্ট সইতে পারবে, এ কোনও ব্যাপারই না।
যাব বলে সুটকেস গোছানো হতে পারে, কিন্তু যাওয়া অত শিগরি হয় না। টিকিটের তারিখ ঠিক করো, ব্যাঙ্কের চেক ভাঙাও, টাকা তোলো, টাকা পাঠাও, নানান ঝামেলা।
পুরনো টিকিটে প্যারিস ফেরার যাত্রা বাতিল হয়ে গেছে, সুতরাং নতুন টিকিট করা চাই। শ্রাদ্ধ অব্দি যখন থাকতে চাইছে না, ঠিক আছে, অনির্বাণ নিখিলের হাতে টাকা দেন, সস্তায় কলকাতা প্যারিস টিকিট কিনতে।
নীলা পথ আটকায় নিখিলের। ও টাকা দিয়ে দাও, আমি কিনব টিকিট।
টিকিট কিনবে টাকা কোথায় পাবে?
এ কথা গোপন থাকে না, মলিনা তাঁর বাবার সম্পত্তি যা পেয়েছিলেন, বিক্রি করে ব্যাঙ্কে রেখেছিলেন, ব্যাঙ্কের সেই কাগজপত্র মলিনার ড্রয়ারে নেই, নীলার হাতে।
কত টাকা?
কুড়ি লক্ষ।
অনির্বাণ ধপাস করে বসে পড়েন। মাথায় হাত। এত টাকা কী করবি তুই? যা দরকার কিষানলাল দেবে। এ টাকা রেখে যা, সংসারের অনেক খরচা আছে। পুরনো বাড়ি, ভেঙে নতুন করে গড়তে হবে।
এ বাড়ি তো আমার নয়, আমি এ বাড়ির কেউ নই। এ তোমাদের বাড়ি, তোমরা করো যা করার। আমার টাকায় লোভ কোরো না।
তুই কি জানিস যে আইনত এই টাকা তিন ভাগে ভাগ হবে। এক ভাগ কেবল পাবি তুই। আর কোথায় কোনও মেয়েকে শুনেছিস টাকা নিতে? সব মেয়েরাই তো ভাইকে দিয়ে দেয় নিজের ভাগ।
ভাগাভাগি করতে চাইলে মা আমার নামে লিখে দিতেন না।
লিখে দিলেই হবে। উত্তরাধিকার বলে একটা ব্যাপার আছে না?
উত্তরাধিকার বলে যে একটি ব্যাপার আছে তা অনির্বাণ মলিনার আত্মীয়দের বাড়িতে ডেকে নীলাকে বোঝাতে অনুরোধ করেন। মলিনার দিদি, জামাইবাবু, দাদা, বউদি এমনকী মঞ্জুষাও এসে মাথা নেড়ে সায় দেন, যে উত্তরাধিকার বলে একটি ব্যাপার আছে। স্বামীর ঘরে যদিও জীবন পার করে, মেয়েরা কি বাপ ভাইকে ভুলে থাকে? থাকে না। পারলে জীবন দেয়। বাপ মায়ের সম্পত্তির কিছুর ওপর কোনও মেয়েরা লোভ করে না। লোভ করলে লোকে ভাল বলে না, মেয়েদের আর কিছু থাক, লোভ থাকা মানায় না। মেয়েরা হবে নির্লোভ, নিঃস্বার্থ নির্দোষ, নিষ্পাপ, নির্বিরোধ, নিবেদিত, নিখাদ, নিভৃত, নির্মল, নিরহঙ্কার, নির্ঝঞ্ঝাট…
মলিনারও কাণ্ড, মাথার ঠিক ছিল না, কী করতে কী করেছেন, এসব কি ধরতে আছে! না কি এ সই মলিনার নয়, হবে হয়তো, মলিনাকে ফুসলিয়ে বা নিজেই নকল সই দিয়ে কাজগুলো নীলা তলে তলে করেছে। আর যদি সই সত্যিকার সই-ই হয়, এত টাকা প্যারিস নিয়ে নষ্ট করার কোনও মানে হয় না। কিষানলাল তো আর এমন নয়, যে টাকা কম কামায়, দুটো রেস্তোরাঁর ব্যবসা, বহাল তবিয়তে আছে। আর যদি গোঁই ধরে, ঠিক আছে, টাকা কলকাতার ব্যাঙ্কে রেখে দিক, বিপদ আপদের কথা তো বলা যায় না, নয়তো এখানে একটা বাড়ি কিনে রাখুক, ভাড়ার টাকা নীলার ব্যাঙ্কে জমা থাকবে। লোকে বিদেশ গিয়ে টাকা রোজগার করে দেশে টাকা পাঠায়। কেউ দেশের টাকা বিদেশে খরচার জন্য নেয় না।
নীলা কি পাগল?
নীলা বলে, হ্যাঁ সে পাগল।
পাগলকে কে সামাল দেবে!
নীলার ধারণা, দেখতে খারাপ দেখায় বলে, অনির্বাণ নিখিলকে পরামর্শ দেননি নীলার বিরুদ্ধে মামলা করতে। মাঝে মাঝে সমাজের চোখের কারণে অনেক অন্যায়কেই থাবা গুটোতে হয়। এতে কপাল ভাল থাকলে বেঁচে যাওয়া যায়, নীলা যেমন বাঁচে। তবে ব্যাঙ্কগুলো নীলার জুতোর সুকতলি খসিয়ে ছাড়ে, মাড়োয়ারি ব্যাঙ্কারের মুখে প্রতিদিন খই ফোটে, এত টাকা দেশ থেকে চলে যাবে, এ কি মুখের কথা, কেন যাবে, কোথায় যাবে, কী কারণ, এত টাকা কোত্থেকে এল, করের কাগজ কোথায়, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অনুমতি নিয়ে এসো, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করে দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজানো হচ্ছে। ইত্যাদি ইত্যাদি।
