নাহ।
নীলা তার মলিন মুখ আর উদাস দুচোখ নিয়ে বসে থাকে। সুতি একটি সাদা শাড়ি গায়ে, শাড়ির আঁচল গড়াচ্ছে মেঝেয়, উড়ো খুড়ো চুল, গালের ত্বক ফেটে চৌচির, নখে পুরনো রং আধখেচড়া হয়ে আছে।
মনিক অনেকক্ষণ তাকিয়ে নীলার দিকে, বলেন, তোমাকে দেখে একটা জিনিস আমার মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, তুমি অমর! কখনও মরবে না।
নীলা আগ্রহ দেখায় না মনিকের এই মন্তব্যের ব্যাখ্যা শুনতে, কিন্তু মনিক বলে যান, চোখের সামনে কেউ মরলে তুমি এত কষ্টে কাতর হও যে মনে করতে ভুলে যাও, মানুষ লক্ষ লক্ষ প্রজাতির ভিড়ে একটি প্রজাতি। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সহস্র কোটি গ্যালাক্সির ভেতর ছোট্ট একটি গ্যালাক্সিতে সহস্র কোটি সৌরজগতের ছোট্ট একটি সৌরজগতে ছোট্ট এক গ্রহে মানুষ নামক প্রাণী বাস করছি। তুমি একটি বিন্দুর মতো, আসলে একটি বিন্দুর মতোও না, তারও চেয়ে ক্ষুদ্র, ক ফুট লম্বা তুমি, আমার চেয়ে দু ইঞ্চি বেশি যদি হও, পাঁচ ফুট ছয়। আমার চেয়ে পাঁচ কিলো যদি কম হও, ষাট কিলো, এই বিশাল মহাজগতে কোথাও দেখতে পাও তোমার অস্তিত্ব? তোমার মায়ের? মানুষের চেয়ে ওই কাদাঘাঁটা কচ্ছপ বেশিদিন বাঁচে। প্রকৃতি এমনই। প্রকৃতিকে জয় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা আসি, যাই। আমরা এমনি এসে ভেসে যাই। এক পলকে মানুষের আয়ু ফুরোয়। হিসেব করতে পারো বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীর এই মাটিতে কত কিছুর জন্ম হচ্ছে, কত কিছু বিলীন হচ্ছে। ডায়নোসর এককালে দাপটের সঙ্গে বেঁচে ছিল, কোথায় এখন তারা, নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মানুষের অস্তিত্বও একসময় আর থাকবে না, মানুষের ইতিহাসই অতীতের গর্ভে গর্তে তলিয়ে যাবে। এই মহাজগতে আমরা কেউ না, কিচ্ছু না…
মনিকের সবুজ চোখদুটো উদাস।
উদাস চোখ নিমেষে চঞ্চল হয়। আচ্ছা তুমি কি পরজন্মে বিশ্বাস করো?
নীলা মাথা নাড়ে, সে বিশ্বাস করে না।
পরজন্মে বিশ্বাসীদের একটা সান্ত্বনা থাকে, এ জীবনে তো এ কাজটা করা হল না, পরের জন্মে না হয় করব। কিন্তু যদি বিশ্বাস করো জীবন একটিই, তবে অপেক্ষা কোরো না। যার যার জীবন তার তার। সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়, যা পাবে, সব গ্রহণ করবে। স্বার্থপর হবে নীলা, এ ছাড়া গতি নেই। লুফে নাও, গোগ্রাসে নাও।
মনিকের মুখ তিজেভির মতো চলে। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে মখমলের সোফায় পা তুলে বসে বাগানের মিঠে রোদ্দুরে বিশ্বাসী কুকুরের খেলা দেখতে দেখতে, নীলা জানে, চমৎকার চমৎকার সব কথা বলা যায়।
হঠাৎই প্রসঙ্গ ছাড়া প্রশ্ন করে বসে নীলা, তোমার মা আছেন মনিক?
আছেন। তুলুজের এক গ্রামে থাকেন। একানব্বই বছর বয়স।
বাড়িতে আর কে কে আছে?
মা একাই থাকেন।
একা?
হ্যাঁ একা।
তুমি গিয়ে থাকো না তোমার মার সঙ্গে?
আমার সময় কোথায়? আর মাও চান না ছেলেমেয়ে গিয়ে তাঁকে বিরক্ত করুক। যার জীবন তার নীলা।
স্বনির্ভরতার অহঙ্কার কে ছাড়তে চায়? বছরে একবার ক্রিসমাসের সময় মাকে দেখতে যাওয়া হয়। তাও সব বছর হয়ে ওঠে না।
তোমার মা একা পারেন রান্নাবান্না করতে? ঘর গোছাতে?
এখনও পারছেন। না পারলে বুড়োবুড়িদের সরকারি বাড়িতে চলে যাবেন, ওখানে দেখাশোনার লোক থাকবে।
.
অর্ধেক বেলা মনিকের বাড়িতে কাটিয়ে নীলা যখন বাড়ি এল, নিখিল জানাল, গলায় শাড়ি পেঁচিয়ে কড়িকাঠে ঝুলে গত রাতে আত্মহত্যা করেছে মিঠু।
.
অ রভোয়া
মিঠুকে শুইয়ে রাখা হয়েছে মেঝেয়। লাল একটি শাড়ি পরানো হয়েছে। গলায় ফুলের মালা, কপালে চন্দন। পায়ে আলতা। মিঠু বেঁচে থাকতে নিশ্চয়ই এত সাজেনি। মিঠুর জন্য সাজ সাজ রব পড়ে গেল। মিঠুকে সাজাও, খাটিয়া সাজাও।
লোক দেখতে এসে বলে যাচ্ছে, আহা কী নিখুঁত মুখ মেয়েটির। কী টিকোলো নাক! কী দীঘল কালো চুল। আহা চিবুকের তিলটি মেয়েকে আরও মায়াবী করেছিল। মেয়েটার স্বভাব চরিত্র, কী বলব, ফুলের মতো পবিত্র ছিল। মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটত, গুরুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে কোনওদিন কথা বলেনি, বেয়াদবি করেনি। লেখাপড়া জানা মেয়েরা আজকাল কি আর আদব কায়দা মানে! কিন্তু মিঠু মানত। মিঠু একা হাতে সংসারের সব কাজ করত, এত লক্ষ্মী ছিল!
নীলা দেখে মিঠুর মা বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছেন, কাঁদছেন কিন্তু সে কাঁদায় এক ধরনের তৃপ্তি আছে।
সাধনবাবু, মিঠুর বাবাও পাঞ্জাবির খুঁটে চোখের জল মোছেন, তাঁর কপালের দুশ্চিন্তার ভাঁজগুলো আগের মতো নেই। মিঠুকে নিয়ে এখন কারও আর দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এখন কেবল কেওড়াতলা, নিমতলা, এখন মুখাগ্নি, এখন ছাই। মিঠু এ জগৎ থেকে জন্মের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আগুনে পোড়া তার কালো শরীরের কালো ছাই নিয়ে সংসারে কেউ দুর্ভাবনার মধ্যে পড়বেনা। মিঠু আত্মহত্যা করে কালো হওয়ার অপমান থেকে যত না বাঁচল, ওর বাপ মাকে বাঁচাল আরও, ওর দাদাকেও বাঁচাল, ওর দাদা এখন দেখে শুনে ভাল পণ নিয়ে একটি মেয়ে বিয়ে করতে পারে।
.
মিঠুর এই মৃত্যু নীলাকে বাকরুদ্ধ করে আবার।
.
নীলাকে ঠেলে সজাগ করে অনির্বাণ জানতে চান কবে সে প্যারিস ফিরছে।
প্যারিস আর যাচ্ছি না। আমি এখানেই থাকব।
এখানে কোথায়?
এখানে এই কলকাতায়।
কলকাতায় কোথায়?
এই বাড়িতে।
বিয়ের পর স্বামীর বাড়িই তোর বাড়ি। স্বামীর বাড়িতেই তোর সব অধিকার। বাপের বাড়িতে মেয়েরা বেড়াতে আসে, থাকতে না। অনির্বাণ ভারী গলায় ভারী কানুন টানেন।
