বাজে বকিস না তো, খাবি আয়। নিখিল নীলাকে টেনে, প্রায় কোলে তুলে নিয়ে গেল খাবার টেবিলে।
.
অনির্বাণ আর নিখিল দুজনই তিনদিনের ছুটি নিয়েছে। তিনদিন বাড়িতে কেবল ভাত আর নিরামিষ সেদ্ধ হবে। তিনদিন পর পুরুত ডেকে মায়ের শ্রাদ্ধ দিতে হবে নীলাকে। নিখিলের মাতৃদায় চলবে পুরো এক মাস। নিখিল সেলাই ছাড়া সাদা কাপড় এক টুকরো কোমরে পেঁচিয়েছে, আরেক টুকরো গলায়, হাতে কুশাসন। যেখানেই বসবে, কুশাসন পেতে। খাবার মধ্যে দুবেলা সেদ্ধ শাকান্ন আর চিড়া মুড়ি দই। এক মাস এই শোক চলবে নিখিলের। নীলার জন্য এক মাসের নয়, শোক তিনদিনের, বিয়ে হয়েছে তার, এক বংশ থেকে আরেক বংশে গেছে, সে এখন পর, মাতৃদায় তেমন নেই। অনির্বাণও আচার অনুষ্ঠান পালন করছেন যথারীতি। মাস গেলে মলিনার শ্রাদ্ধে কত লোক নেমন্তন্ন করবেন, তারই এখন থেকে হিসেব চলছে। শ্রাদ্ধ শেষ হলে অনির্বাণ আর নিখিল দুজনেরই ব্যস্ততা বাড়বে। মৃত্যুর স্মৃতিকে পেছনে ফেলে সামনে এগোবে। পেছনের কিছুর জন্য হাহাকার করে সময় নষ্ট করার যুক্তি না দেখেন অনির্বাণ, না দেখে নিখিল। একা নীলাই কেবল জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করেছে, কী অর্থ এই জীবনের।
.
মলিনার ঘরে হঠাৎ ঢুকে নীলা মা মা বলে ডাকে। ডেকে সে চমকে ওঠে, খালি ঘর, একটি টিমটিমে প্রদীপ জ্বলছে ঘরের মাঝখানে। মলিনার বুকে মাথা রেখে তার শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল, সুশান্ত চলে যাবার পর যেমন শুয়েছিল। টেলিভিশনের বিকট শব্দ আর নিখিলের হা হা হাসির যন্ত্রণায় নীলা কুঁকড়ে যেতে থাকে, চিত্রা এসে নীলাকে প্রদীপের সামনে থেকে তোলে।
চিত্রা, মা কী বলতে চেয়েছিলেন?
তা আমি কী করে বলব দিদি।
মুখে একটু জল চাইছিলেন? ওষুধ চাইছিলেন ব্যথা কমার?
তা কী করে বলব দিদি?
মা কি আমাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছিলেন? ভয় পাচ্ছিলেন?
মৃত্যুর সময় কেমন লাগে, কী বলতে ইচ্ছে হয়, কী করতে, তা তো আমি জানি না দিদি! যাঁরা মরেছেন তাঁরা জানেন।
.
মলিনা নেই বলে কটি বিষাক্ত সাপ উঠে এসেছে উঠোনে, ফিরে যাচ্ছে না জলায় বা জংলায়। কাপড়ের ভাঁজে, টাকা পয়সার ড্রয়ারে, বালিশের নীচে, গেলাসে বাটিতে, ফুলদানিতে, চৌবাচ্চায়, জলকলের মুখে ইঁদুর আর তেলাপোকার বিশাল সংসার। মলিনা নেই বলে মাধবীলতাও আর ফুটছে না। দেয়াল ঘেঁষে যে রজনীগন্ধার গাছ ছিল, কামিনীর, মরে গেছে। গোলাপবাগানে গোলাপের বদলে শুধু কাঁটা আর পোকা খাওয়া পাতা। বুড়ো জাম গাছে বিচ্ছুদের বাসা, পেয়ারা গাছটি ঝড় নেই বাতাস নেই গুঁড়িসুদ্ধ উপড়ে পড়েছে। মিষ্টি আমের গাছে একটি আমও আর ধরে না, নারকেল গাছে না একখানা নারকেল। সুপুরি গাছেদের নাচের ইস্কুল এখন বন্ধ। মলিনা নেই বলে সবজির বাগান পঙ্গপাল এসে খেয়ে গেছে, সবুজ মাঠটি ভরে গেছে খড়ে, আগাছায়।
মলিনা নেই, মলিনার না থাকা জুড়ে দাপট এখন অদ্ভুত অসুস্থতার, নীলার শ্বাসরোধ করে আনে দুষিত বাতাস, মলিনার না থাকার দৈত্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে ঘাড়ে, মলিনার না থাকার শকুন ছিঁড়ে খাচ্ছে নীলার সর্বাঙ্গ, মলিনার না থাকার উন্মত্ত আগুন পুড়িয়ে ছাই করছে, মলিনার না থাকার সর্বগ্রাসী জল নীলাকে ডুবিয়ে নিচ্ছে। নীলাও মলিনার মতো নেই হতে চায়।
.
নেই হওয়ার নানা পথ আছে, মনিক ম্যাথুর বাড়ি যাওয়া নয়। কিন্তু নীলা মনিকের বাড়ি যায়।
মনিক মলিনার বয়সি। অথচ কী দিব্যি বেঁচে আছেন। হাত পায়ের প্রতিটি নখ নিখুঁত করে রাঙানো, চোখের পাতায় গাঢ় নীল রং, পাপড়িগুলোয় রঙের প্রলেপে উজ্জ্বল, গালে রং, ঠোঁটে রং, বাদামি চুলকে রাঙিয়ে সোনালি করেছেন, স্তন ফুটে বেরোচ্ছে এমন পাতলা জামা পরেছেন। নীলা কোনওদিনই মলিনাকে মুখে কোনও রং লাগাতে দেখেনি। ভয় ছিল, কালোর ওপর রং পড়লে কী জানি আরও বিদঘুটে না দেখায়। মনিক ঝটপট চা বানিয়ে আনলেন, চা খেতে খেতে বললেন, জীবনের অর্থ কী জানো? ডগলাস আদামস বলেছিলেন জীবনের অর্থ বিয়াল্লিশ, আমার মনে হয় ভুল বলেছিলেন, জীবনের অর্থ আসলে সাতচল্লিশ।
মনিক স্তন দুলিয়ে হাসেন। নীলার হাসি পায় না।
মনিক উচ্ছল উজ্জ্বল প্রাণবান মানুষ। বয়সে ছোট এক বাঙালি ছেলেকে বিয়ে করেছিলেন, সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে দিল্লি চলে যাচ্ছেন এখন। আলিয়ঁজ ফ্রসেজে ফরাসি ভাষা শেখাতেন, ভাষা শেখানো ছেড়ে ফরাসি দূতাবাসে চাকরি জুটিয়ে নিয়েছেন, তাই কলকাতার পাট চুকোতে হবে তাঁর। কিন্তু কলকাতার এই বাড়িটি বিক্রি করবেন করবেন করেও মন তাঁর সায় দিচ্ছে না।
কলকাতার মতো, বুঝলে নীলা, শহর হয় না! যদি বাস করার জন্য কোনও শহর চাও, তো কলকাতা।
নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
তা তুমি কি ফিরে যাচ্ছ প্যারিসে? মনিক জিজ্ঞেস করেন।
নাহ।
দুটো জার্মান শেফার্ড ঘরে দাপট দেখিয়ে হাঁটে। লুলু আর ভুলু। বিদেশি কুকুরের বাংলা নাম!
মনিকের ওই প্রেমিক ছোকরাটি নাম রেখেছে। লুলুর গলায় ভুলুর পিঠে হাত বুলিয়ে মনিক ওদের খেলতে পাঠান বাগানে।
লুলু ভুলুকে নিয়েই আমার সংসার। অনেক পুরুষের সঙ্গে সংসার করে দেখেছি, কুকুরের সঙ্গে সংসার করায় আনন্দ বেশি। কারণ বিশ্বাস হল সবচেয়ে বড় ব্যাপার। মানুষ বিশ্বাস ভাঙে, কুকুর ভাঙে না। তুমি কুকুর পোষো?
