বাড়িটি, নীলা দেখে, ফিসফিসে ফিসফিসে ভরে উঠছে।
দানিয়েল নীলার ক্লান্ত শরীরকে টেনে নিয়ে যায় দোতলায়।
সারারাত নীলার নিস্তরঙ্গ শরীরে দানিয়েলের তৃষ্ণার্ত জিভ খেলা করে। নীলার মরাকাঠ শরীর হঠাৎ বানের জলে ভেসে যায়। দানিয়েল নিখুঁত শিল্পীর মতো নীলার শরীরে আঁকতে থাকে ওর স্বপ্নের ছবি।
নীলা শীৎকারে, শীর্ষসুখে যখন আকণ্ঠ ডুবে আছে, ভোরের আলো এসে চুমু খাচ্ছে তার এলো চুলে, তখনই চিত্রার চিৎকার তাকে পাথর করে দেয়।
.
দানিয়েল বেরিয়ে যায়, হিন্দুর সৎকারউৎসব ও দেখেনি কোনওদিন। দেখবে, এ এক নতুন অভিজ্ঞতা ওর জন্য।
নীলা বিছানা থেকে ওঠে না। নিখিল এসে ডেকে যায়। চিত্রা ডাকতে এসে বলে যায়, দিদি, মাসিমা অস্থির অস্থির করছিলেন, আর নীলা নীলা বলে ডাকছিলেন। ওই ডাকেই তো আমার ঘুম ভাঙে। তারপর মাসিমাকে কত ডাকি, মাসিমা আর কথা বলেন না। চোখ খোলেন না।
চিত্রা সরে গেলে নীলা উলঙ্গ শরীরে নেমে আসে বিছানা থেকে, ঘরের দরজায় খিল এঁটে দেয়। সারাদিন দরজায় শব্দ হয়, কেউ টোকা দেয়, কেউ ধাক্কা, কেউ ওপাশ থেকে শেষবার মায়ের মুখ দেখার অনুরোধ করে, কেউ আদেশ করে, মঞ্জুষা ভাঙা গলায় করেন, মলিনার দিদি দাদা ভারী গলায় করেন, অনির্বাণও কী কারণে নীলা জানে না, ডাকতে আসেন। কারও জন্য দরজা খোলে না সে।
সারাদিন জানালার হলুদ রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে থাকে নীলা, রাস্তার ফেরিঅলার ডাক, বাস ট্রাকের চিৎকার, সৎকারউৎসবের কোলাহল কিছুই তাকে স্পর্শ করে না।
রাতে অতল নিস্তব্ধতার বুক চিরে চিত্রার মিহি কান্নার শব্দ বাড়ির গুমোট বাতাসে ভাসতে থাকে।
নীলার বুক চিরে কোনও দীর্ঘশ্বাস বেরোয় না, চোখ জ্বালা করে এক ফোঁটা জল বেলোয়।
.
মলিনার দুঃখগুলোর ওপর গোলাপজল ছিটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল নীলার। যেন দুঃখগুলো সুগন্ধ পেতে পেতে ঘুমিয়ে পড়ে কোথাও, ময়দানের ঘাসে, বিড়লামন্দিরের সিঁড়িতে। সন্ধেবেলা আলতো করে তুলে বাড়ির ছাদে রেখে এলে দুঃখগুলো দুঃখ ভুলে চাঁদের সঙ্গে খেলত হয়তো বুড়িছোঁয়া খেলা। দুঃখরা মলিনাকে ছেড়ে কলতলা অব্দি যায়নি কোনওদিন। যেন এরা পরম আত্মীয়, খানিকটা আড়াল হলে বিষম একা পড়ে যাবেন মলিনা, কাদায় পিছলে পড়বেন, বাঘে ভালুকে খাবে।
মলিনাকে দুঃখের হাতে সঁপে বাড়ির মানুষগুলো অসম্ভব স্বস্তি পেত। দুঃখগুলোকে পিঁড়ি দিত বসতে, চা বিস্কুট দিত। নীলার ইচ্ছে ছিল বেড়াতে নিয়ে গিয়ে মলিনার দুঃখগুলো গঙ্গার জলে, কেউ জানবে না, ভাসিয়ে দেবে একদিন। কচুরিপানার মতো, খড়কুটোর মতো, মরা সাপের মতো ভাসতে ভাসতে দুঃখরা চলে যাবে দূরে… অনেক দূরে। নীলার কোনও ইচ্ছে পূরণ হয়নি, মলিনার দুঃখগুলো মলিনার সঙ্গে শ্মশান অব্দি গেছে।
.
আমরা এমনি ভেসে যাই
পুরো সপ্তাহ কলকাতার রাস্তায় ঘুরে ভিড়ভাট্টা ধুলোবালি যানজট ভেঁপুতে কাতর হয়ে, ফুটপাতের আলুকাবলি খেয়ে পেটের অসুখ বাঁধিয়ে, মনিক ক্লদ ম্যাথুর পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে দুদিন আড্ডা দিয়ে, চোখ বিস্ফারিত করে নিখিলের মাতৃদায় দেখে দানিয়েল প্যারিস ফিরে গেল। যাবার আগে নীলাকে সেধেছিল যেতে। নীলা যায়নি।
অনুতাপ? তুমি তো প্যারিস থেকে নাও আসতে পারতে। তোমাকে না দেখেই সম্ভবত মলিনার যেতে হত। নিজেকে দোষী ভাবছ তো! কক্ষনও নিজেকে কোনও কিছুর জন্য দোষী ভাবতে নেই নীলা, দোষী ভাবলে জীবন আর এগোয় না। স্থবির জলাশয় হতে চাও? তা হলে ভাবো।
এসব বলে পাথরে টোকা যতই দিতে চেয়েছে দানিয়েল, পাথরে শব্দ হয়নি। ঠেলেছে, পাথর নড়েনি।
দানিয়েলের শব্দবাক্য বাড়ির পেছনের আবর্জনায় ছুঁড়ে দিয়ে নীলা বলেছে, যথেষ্ট বিরক্ত করেছ আমাকে, আর কোরো না।
নীলার এ বাক্যই দানিয়েলের জন্য যথেষ্ট ছিল পেছনে আর ফিরে না তাকাবার। কিন্তু ও দরজার কাছ থেকে ফিরে মনিক ম্যাথুর ঠিকানা লেখা কাগজটি রেখে বলে যায়, নিকলের বন্ধু মনিক। চমৎকার মহিলা। যদি প্রয়োজন মনে করো কখনও, যেয়ো।
.
রাতগুলো আগের চেয়েও আরও বেশি স্তব্ধতার জলে ডুবে থাকে। কেউ আর এ বাড়িতে কাতরায় না। চিত্রাও আর কাঁদে না। মলিনার ঘর থেকে মলিনার বিছানা বালিশ সব ফেলে ঘর খালি করে ধুয়ে মুছে দিয়েছে চিত্রা। অনির্বাণ সে ঘরে টেবিল পাতবেন, রোগীর শোয়ার টেবিল, চেয়ার পাতবেন চারটে কি পাঁচটা, হাসপাতাল থেকে ফিরে রাতে রোগী দেখবেন সে ঘরে। হলুদ রোদ্দুর চলে গিয়ে অন্ধকার এসে বসে জানালায়, নীলা সেই অন্ধকারের দিকেই তাকিয়ে থাকে। ঘোর অমাবস্যার দিকে নীলার চোখ স্থির হয়ে থাকে।
অমনই এক রাতে, নিখিল এসে নীলার শিয়রের কাছে বসে, পিঠে হাত রেখে নীলার, বলে, কষ্ট তো তোর একার হচ্ছে না, কষ্ট আমাদের সবারই হচ্ছে। কিন্তু কী করা যাবে, মাকে কি ফিরিয়ে আনতে পারব! পারব না। জীবন তো আমাদের যাপন করতেই হবে। এটাই তো নিয়ম, বাস্তব খুব নির্মম হয়, কিন্তু মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
অমাবস্যার ঘোরে নাকি জ্বরের, নীলা বলতে থাকে, আমাদের একটি মা ছিল, মা আমাদের খাওয়াত, শোয়াত, ঘুম পাড়াত। গায়ে কোনও ধুলো লাগতে দিত না, পিঁপড়ে উঠতে না, মনে কোনও আঁচড় পড়তে দিত না, মাথায় কোনও চোট পেতে না। মাকে লোকেরা কালো পেঁচি বলত, আমরাও। বোকা বুদ্ধু বলে গাল দিতাম মাকে। মা কষ্ট পেত, মা কষ্ট পেলে আমাদের কিছু যায় আসত না। আমাদের কিছুতে কিছু যায় আসত না, মা জ্বরে ভুগলেও না, মা জলে পড়লেও না। মাকে মা বলে মনে হত, মানুষ বলে না। মা মানে সংসারের ঘানি টানে যে, মা মানে সবচেয়ে ভাল রাঁধে যে, বাড়ে যে, কাপড় চোপড় ধুয়ে রাখে, গুছিয়ে রাখে যে, মা মানে হাড়মাংস কালি করে সকাল সন্ধে খাটে যে, যার খেতে নেই, শুতে নেই, ঘুমোতে নেই। যার হাসতে নেই, যাকে কেবল কাঁদলে মানায়, শোকের নদীতে যার নাক অব্দি ডুবে থাকা মানায়। মা মানে যার নিজের কোনও জীবন থাকে না। মাদের নিজের কোনও জীবন থাকতে নেই। মা ব্যথায় চেঁচাতে থাকলে বলি, ও কিছু না খামোকা আহ্লাদ। মরে গেলে মাকে দিব্যি পুড়িয়ে ফেলি। ভাবি যে বিষম এক কর্তব্য পালন হল। মা নেই, এতেও আমাদের কিছু যায় আসে না।
