চিকিৎসা তো চলেছেই, এখনও চলছে। কেমোথেরাপি কি কম দেওয়া হল! অনির্বাণ গলা চড়ান।
বাজে কথা বোলো না। কেমোথেরাপি কোনও চিকিৎসা নয়। ক্যান্সার ঘটিয়েছ, আর এখন কেমোথরাপি দিয়ে লোক ভোলাচ্ছ যে চিকিৎসা করছ। চিকিৎসা যখন করার দরকার ছিল, তখন করোনি। এ তো তুমি ভাল জানো, জানো না? অনুতাপ হয় না? নীলার কণ্ঠে ক্রোধ, চোখে ঘৃণা।
আজও আমি অনকোলজিস্ট পাঠিয়েছি।
সে তো লোক দেখানো। লোককে দেখাচ্ছ যে বড় ডাক্তার এনেছ।
অনির্বাণ নিখিলের দিকে চেয়ে সমর্থন খোঁজেন, কী বলছে এই মেয়ে, শহরের সবচেয়ে নামকরা অনকোলজিস্ট…
ফাক ইয়োর অনকোলজিস্ট।
হোয়াট?
ফাক ইয়োরসেল্ফ।
এটুকুর পর নীলা কাঁদে। বাড়ি কাঁপিয়ে কাঁদে।
.
কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়ে নীলা, সোফায়। ঘুম ভাঙে মলিনার চিৎকারে আর অনির্বাণের নাক ডাকায়। বাড়ির একটি ঘরে অসহনীয় যন্ত্রণায় কাঁদছেন একজন, আর অন্য ঘরে সুখনিদ্রা যাচ্ছেন আরেকজন। দীর্ঘ চল্লিশ বছর তাঁরা এক ছাদের তলে বাস করেছেন। গুমোট, এত স্তব্ধতা চারদিকে। মলিনা যেমন শরীরের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন, নীলা ওই স্তব্ধতার মধ্যে একা দাঁড়িয়ে থেকে মনের যন্ত্রণায় কাতরায়। নীলার ভয় হয়। মলিনাকে স্পর্শ করতে তার ভয় হয়। বোঁ বোঁ পাখার তলে মলিনার পা বরফঠাণ্ডা হচ্ছে আর মাথায় গ্রীষ্মের মধ্যাহ্ন। আহা মলিনার কেন বিদেশি কুকুর হয়ে জন্ম নেওয়া হল না।
সকালে সূর্যমুখী চোখ ফোটে।
চিত্রা নীলাকে চা করে দে রে!
চিত্রা শুয়ে ছিল ঘরের মেঝেয় কাঁথা বিছিয়ে। কাঁথা গুটিয়ে উঠে যায় চা করতে।
দরজাটা বন্ধ করে এস তো আমার কাছে। মলিনা বলেন।
নীলা দরজা বন্ধ করে।
বালিশের তল থেকে চাবি নিয়ে আমার আলমারিটা খোলো।
মলিনার কন্ঠ মনে হয় চাঁদের দেশ থেকে আসছে। এমন ক্ষীণ।
নীলা আলমারি খোলে।
ডান দিকের ড্রয়ারে দেখো কিছু কাগজ আছে।
নীলা কাগজ নিয়ে এল।
মলিনা বললেন এটা তোমার কাছে রাখো। এটা তোমার।
নীলা কাগজ খুলে দেখে তার নামে ভেতরে কুড়ি লক্ষ টাকার চেক।
সে চমকে ওঠে, এত টাকার চেক দেখে। এত টাকা তুমি আমাকে দিচ্ছ কেন মা? নীলা দেখে মলিনার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে বালিশে। জল মুছে দিয়ে ধরা গলায় বলে, এ টাকা দিয়ে তোমার চিকিৎসা করাব মা। তুমি ভাল হবে। আবার আগের মতো হাঁটবে, গান গাইবে। মনে আছে তুমি যে গাইতে আমি অকৃতি অধম বলেও তো কিছু কম করে মোরে দাওনি, যা দিয়েছ তারি অযোগ্য ভাবিয়া কেড়েও তো কিছু নাওনি…
বালিশে জল গড়াতে থাকে মলিনার।
দেখো মা আমি গাইছি গানটি…
নীলা গাইতে থাকে মেঝেয় বসে মলিনার মাথার পাশে মাথা রেখে, ভেজা বালিশে। বালিশ ভিজতে থাকে আরও, নীলার চোখের জলে মলিনার সিঁথিতে ঝাপসা হয়ে আসা সিঁদুরও মুছতে থাকে।
নীলার গলা বুজে আসে, গান শেষ হয় না।
চাঁদের দেশ থেকে আসা স্বর আবার, দেশে থেকো, বিদেশ যেয়ো না।
.
বাড়িতে হুলস্থুল শুরু হয়। নিখিল জানাল, দানিয়েল নামে একটি মেয়ে ফোন করেছিল প্যারিস থেকে। সে আজ রাতে এসে পৌঁছোচ্ছে কলকাতায়। অনির্বাণ বাজার করতে গেছে, বিদেশি অতিথির জন্য ভাল মাছ মাংস কিনতে। তাছাড়া অনির্বাণের দুজন বন্ধুও দুপুরে খাবে। রাতে খাবে কিছু আত্মীয়। এক চিত্রার ওপর চাপ বেশি পড়ে যায়। খবর পাঠিয়ে চিত্রার মা মাসিকে আনা হল। নীলা দূর থেকে বাড়ির ভোজউৎসব দেখে। নিখিলের ব্যস্ততা দেখে।
আচ্ছা তোর বিদেশি অতিথি কী পান করবে? ফরাসি ওয়াইন না হলে কি চলবে? ভারতীয় ওয়াইনের ব্যবস্থা করলে হবে তো!
নীলা কাঁপা কণ্ঠে বলে, দাদা, মার পাশে একটু বসো। একটু কথা বলো মার সঙ্গে। গায়ে একটু হাত বুলিয়ে দাও।
ডাক্তার বলেছে আরও দুমাস বাঁচবে মা। নিখিল বলে।
আমার ভয় লাগছে দাদা।
নিখিল বিমানবন্দর থেকে দানিয়েলকে নিয়ে বাড়ি এল সন্ধেবেলা। বাড়িতে আত্মীয়দের ভিড়ও বেড়েছে। সবাই দেখতে এসেছে মলিনাকে। রাতের ভোজ শেষ হলে অনির্বাণ মলিনার নাড়ি টিপে এসে মলিনার দাদা আর জামাইবাবুর সঙ্গে ফিসফিস করে শ্মশানঘাট, খাটিয়া, টাকা ইত্যাদি কথা বলেন।
নীলার কানে আগুনের শলার মতো ঢোকে প্রতিটি শব্দ। একা সে পুড়তে থাকে। নীলার পোড়া কাঁধে হাত রেখে, দানিয়েল ফিসফিস করে বলে, এত দূর থেকে তোমার কাছে এলাম, দেখে একটু খুশি হলে না মনে হচ্ছে।
ফিসফিসের কোনও উত্তর দেয় না সে।
নীলার বিছানাতেই দানিয়েলের ঘুমোনোর ব্যবস্থা হয়। নীলার বান্ধবী নীলার বিছানায় ঘুমোবে, এ নিতান্তই স্বাভাবিক, পশ্চিমে সূর্য ডোবার মতো, মলিনার কষ্ট পাওয়ার মতো। দুটো বেশি বালিশ পেতে বিছানা গুছিয়ে দিয়ে আসে চিত্রা। ঘুমোতে যাবার আগে অনেক রাত অব্দি বসার ঘরে বসে দানিয়েলের সঙ্গে ফরাসি বিপ্লব, ফরাসি সুগন্ধী নিয়ে কথা বলে নিখিল আর অনির্বাণ।
নীলা একা বসে ছিল মলিনার বিছানার পাশে, দেয়ালে হেলান দিয়ে। মধ্যরাত পার হলে দানিয়েল মলিনার ঘরে বেড়ালের মতো নিঃশব্দে ঢুকে, বলে, চলো ঘুমোতে যাবে।
তুমি ঘুমোও, আমি মার কাছে বসব।
তুমি খুব ক্লান্ত নীলা, তোমার ঘুম দরকার। এভাবে না ঘুমিয়ে শরীর খারাপ করলে তোমার মার কাছেই তোমার থাকা হবে না। তোমাকে নিয়েই বাড়ির লোকেরা ব্যস্ত হবে। তার চেয়ে রাতটা ঘুমিয়ে, সকালে এসে বোসো এখানে। দানিয়েল ফিসফিস করে বলে।
