কত পরে?
কত পরে, তা ডাক্তার বলেন না। কেবল বলেন, পরে।
.
মরফিন পরে দেবার কারণটি শেষ অব্দি ডাক্তার ব্যাখ্যা করেন। তাঁর ধারণা, মরফিন জিনিসটি সুবিধের নয়, এটি নিলে নেশা হয়।
নীলার বিস্ময় চোখে ধরে না। গায়ে পায়ে নামে। লোমকূপে। সারা গা তার কাঁপে ক্রোধে। যে মানুষটি যে কোনও মুহূর্তে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করবেন, তাঁর জন্য করা হচ্ছে মরফিনের নেশা হওয়ার আশঙ্কা!
নীলা বলে, হোক, মরফিনের নেশা হোক আমার মার। মার কখনও কোনও নেশা ছিল না। বাড়ির আর সবার নানা রকম নেশা আছে। আমি খুব করে চাইছি আমার মা যেন মরফিনের নেশা করেন। লিখে দিন মরফিন।
ডাক্তারিতে নীতি বলে আমাদের একটা ব্যাপার আছে তো। আমরা এর বাইরে যেতে পারি না। ডাক্তার তাঁর ঘোলা চশমাটি নাক থেকে চোখের দিকে ঠেলে বললেন।
রাখুন আপনার নীতি। মরফিন লিখে দিয়ে যান। আমি মাকে ইনজেকশন দেব। নীলা তার ত্রিগুণ বয়সী ডাক্তারকে ধমক দিয়েই বলে।
এরকম নিয়ম নয় নীলা জানে। গুরুজনদের সম্মান করার শিক্ষা জন্মের পর পরই সবাই পায় এ দেশে। নীলাও পেয়েছে, গুরুজন যাহা আদেশ করিবে, তাহাই পালন করিবে। গুরুজনের চোখের দিকে তাকাইয়া কথা বলিবে না। তাহাদের সঙ্গে নিচু কণ্ঠে কথা বলিবে, উচ্চকণ্ঠে না। গুরুজন মিথ্যা বলিলেও সে মিথ্যা মানিয়া লইবে। গুরুজন মন্দ কাজ করিলেও বলিবে, ইহা মন্দ নয়, ইহা ভাল। গুরুজন ভুল করিলে কখনও তাহা শুধরাইতে যাইও না, ভুলকেই ঠিক বলিয়া মানিয়ো। গুরু যদি গোরুর মতো ব্যবহার করে, তবে চক্ষু বন্ধ করিয়া রাখিয়ো। ইত্যাদি ইত্যাদি।
নীতির জলে ডুবে ডাক্তার খাবি খাচ্ছেন। মরফিনের পরামর্শ দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না।
পশ্চিমে যে ব্যাপারটি চলছে ইদানীং, ইউদেনেশিয়া, নীলার হঠাৎ মনে হয়, মন্দ নয়। আগে সে ইউদেনেশিয়াকে চরমতম নিষ্ঠুরতাই মনে করত। আজ, তার মনে হতে থাকে, বেঁচে থাকার অধিকার যেমন মানুষের আছে, মরে যাবার অধিকারও তার থাকা উচিত। এটিও মানবাধিকার। কী লাভ বেঁচে থেকে যখন যন্ত্রণা পোহানো ছাড়া সামনে আর কিছুই থাকে না।
যাবার সময় ডাক্তার বলে যান, এত উত্তেজিত হওয়ার কী আছে! অসুখ তো হঠাৎ করে হয়নি। দীর্ঘদিনের পোষা অসুখ। একটা ফুসকুড়ি মতো ছিল অন্ত্রে, ও থেকে রক্ত যাচ্ছিল, ওটি কেটে ফেলে দিলেই হত। না ফেলার কারণেই তো ক্যান্সারে দাঁড়িয়েছে। রোগীর পরিবার নিয়ে এই এক ঝামেলা পোহাতে হয় আমাদের। সময়মতো চিকিৎসা করাবে না, সময় চলে গেলে, মাথা গরম করবে।
.
বিকেলে নিখিল বাড়ি ফিরে গাড়ি পাঠিয়ে দেয় অনির্বাণকে হাসপাতাল থেকে তুলে আনতে। অনির্বাণ ফিরলে নীলা বলে, রামকিরণকে অপেক্ষা করতে বলো, আমি বেরোব।
কোথায় বেরোবে?
নীলা উত্তর দেয় না। নিখিলকে বলে মলিনাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে গাড়িতে তুলতে।
নিখিলকে ধমকে থামায় অনির্বাণ। ওরও মতো পাগল হয়েছিস তুই।
নিখিলও মত দেয়, এ পাগলের মতো কথাই বটে। যে মানুষ হাঁটতে পারে না, দাঁড়াতে পারে না, উঠে বসার শক্তি নেই যার, হাত পা প্রায় অবশ, সেই মানুষকে নিয়ে গঙ্গার ধারে যাওয়া।
মরার আগেই মেরে ফেলার ফন্দি এঁটেছে নাকি!
হতবাক দাঁড়িয়ে থাকা নীলাকে টেনে বারান্দায় নেয় নিখিল, বলে, তোর হয়েছে কী বল তো! এমন পাগলামো করছিস কেন! মার শরীর তো দেখছিস! এ সময় টানাটানির কোনও মানে হয় না!
নীলা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে।
কী যে হল মার হঠাৎ! নিখিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
দীর্ঘশ্বাসটি, নীলার বিশ্বাস, কৃত্রিম।
.
মলিনা ব্যথায় চিৎকার করছেন। বারান্দা থেকে সেই কাতর চিৎকারধ্বনি শুনছে সে। তার ইচ্ছে করে না সেই ভয়ংকর কষ্টের সামনে যেতে, দেখতে দুঃসহ যন্ত্রণায় কোঁকড়ানো মুখ। বারান্দার গ্রিল শক্ত মুঠোয় ধরে রাখে সে, কোথাও সে যাবে না, এখানে দাঁড়িয়েই সে জীবনের যত দুর্ভোগ দুর্যোগ দেখা থেকে নিজেকে রক্ষা করবে। কিন্তু যায়, পেছন ফিরে যখন দেখে টেলিভিশনে ধুন্দুমার নাচ হচ্ছে, আর সোফায় পাজামা আর ফতুয়া পরে অনির্বাণ বসে আছেন, হাতে দিনের পত্রিকা, চোখ বুক কাঁপানো কোমর দুলোনো তরুণীদের নাচে, সেদিকে।
টেলিভিশনটি বন্ধ করে, অনির্বাণের নাক বরাবর বসে বলে, কাল যে বলেছিলাম, অনুতাপের কথা। অনুতাপ হয় তোমার কোনও কারণে?
কী কারণে হবে? অনির্বাণ চশমা খোলেন। আবার সেই তীক্ষ্ণ চোখ।
হবে এই কারণে যে তুমি মার চিকিৎসা করোনি। দশ বছর ধরে মার রক্ত যাচ্ছিল, অর্শরোগের কারণে রক্ত যাচ্ছে বলেছ। বলোনি? এখন তো জানো, ওই রক্ত যাওয়া কোনও অর্শরোগের কারণে ছিল না। মার যে পেটে ব্যথা হত, বলোনি, ও কিছু না! মা খামোকা আহ্লাদ করছেন! ব্যথার কথা বলে মা নাকি আসলে শুয়ে আরাম করতে চান। বলোনি? বলেছ। মা তোমার মনোযোগ পেতে মিথ্যে বলছেন, বলোনি? বলেছ। এখন তো সব বুঝেছ। অনুতাপ হয় না? একবারও অনুতাপ করো না, যখন একা বসে থাকো, একবারও মনে হয় না যে এ রোগ হত না যদি তুমি মার চিকিৎসা করতে আগে থেকে। আগে যদি অবহেলা না করতে। তুমি তো গ্যাস্ট্রোএনটারোলজির প্রফেসর ছিলে, ছিলে কী এখনও আছো, অনুতাপ হয় না? অনুতাপ হয় না একবারও যে তুমি ডাক্তার বলে মা তোমার ওপর ভরসা করে ছিলেন, আর তুমি ফিরেও তাকাওনি, বিনা চিকিৎসায় মাকে মরতে হচ্ছে। হয় তো অনুতাপ, হয় না?
