মলিনা শিশুর মতো মাথা নাড়েন।
এ দেশেও কত কিছু দেখার আছে। আমি তোমাকে দার্জিলিং নিয়ে যাব, সিমলা নিয়ে যাব, কাশ্মীর নেব।
মলিনা বলেন, সেই ক্লান্ত অস্ফুট স্বর, না কাশ্মীর না।
ঠিক আছে কাশ্মীর না, কাশ্মীরে গণ্ডগোল। জয়পুর যাবে না মা? গোয়াতেও তো যাবে। গোয়ার সমুদ্রে সাঁতার কাটব আমরা…
.
মলিনার ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে যায়। চোখদুটো বোজেন, ধীরে, তারপর জোরে। এত জোরে যে নাক চোখ মুখ সব কুঁচকে দলামোচা করা কাগজের মতো দেখতে লাগে।
নীলা মলিনাকে জড়িয়ে রাখে।
হঠাৎ মঞ্জুষা বলে চিৎকার করেন মলিনা।
মঞ্জুষামাসি নেই মা। চলে গেছেন। বলো কী লাগবে।
চিত্রা দৌড়ে আসে চিৎকার শুনে।
দিদি, মাসিমাকে ওই লাল ওষুধটা খাইয়ে দিন। চিত্রা বলে।
ব্যথার ওষুধ। দুটোর জায়গায় তিনটে বড়ি জলে গুলে খাইয়ে দেয় নীলা।
ব্যথা কমার নাম গন্ধ নেই।
নীলা নিখিলকে ডেকে তোলে, দাদা বেশ তো ঘুমোচ্ছ। মা যে ব্যথায় চিৎকার করছেন। উঠে এসো। কোন ডাক্তার দেখছে মাকে, তাকে শিগরি ডাকো!
অনির্বাণ নাক ডেকে ঘুমোচ্ছিলেন, ডেকে তোলে তাঁকেও নীলা, ডাক্তার ডাকতে বলে। অনির্বাণ ধমকে ওঠেন, এত রাতে আবার কীসের ডাক্তার!
ঘুমন্ত বাড়ির ভেতর গোঙানোর শব্দ কেবল। মলিনা সারারাত গোঙান, চিৎকারের শক্তি চলে গেছে। নীলা অসহায় বসে থাকে পাশে। মনের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে মলিনার কষ্টগুলো নিজের শরীরে নিতে চায়, চায় মলিনার সব দুঃখগুলো আলতো করে তুলে নিয়ে নিজের হৃদয়ে ধারণ করতে।
.
হা ফামেলিয়া
সকালে বেরোবার আগে অনির্বাণ একবার উঁকি দেন মলিনার ঘরে। নিখিলও। প্রাতরাশ সেরে, উঁকিপর্ব সেরে ঝাড়া হাত পা, সারাদিনের জন্য হাওয়া হয়ে যেতে কারও কোনও অনুশোচনা হয় না।
নীলা পথ আগলে বলে, মার এমন অসুখ রেখে সকাল হতেই গটগট করে বেরিয়ে যাচ্ছ যে সব।
চাকরি আছে না!
চাকরি? সারাজীবন তো চাকরিই করবে। মোটা বেতনের চাকরি। ছুটি নাও।
কী করব ছুটি নিয়ে। মাকে কি সারাতে পারব?
সারাতে না পারলে। পাশে থাকো। তোমাকে দেখবেন মা।
দেখবেন কী, ঘুমিয়েই তো কাটাচ্ছেন।
সময় নষ্ট কোরো না। তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। অনির্বাণ নিখিলকে তাড়া দেন।
এই বাস্তবজ্ঞানবিবর্জিত মেয়ের কথায় কান দিয়ো না নিখিল, বেরোও। একজনের জীবন থেমে আছে বলে সংসারের বাকি মানুষদের জীবন থেমে থাকবে নাকি! ভারী গলায় বলেন অনির্বাণ।
যাও। যত পারো টাকা কামাই করো গিয়ে। তোমাদের সম্ভবত থাকারও দরকার নেই। কেবল ডাক্তার পাঠিয়ে দিয়ো। না পারো, ডাক্তারের নাম ঠিকানা দিয়ে যাও। আমিই আনার ব্যবস্থা করব। নীলা বলে, ক্লান্ত কণ্ঠ।
সকালে সূর্যমুখী ফোটে।
আজ বিকেলে গঙ্গার ধারে যাবে বেড়াতে?
মলিনার মুখে শিশুর হাসি। তিনি যাবেন। বহুকাল তাঁর বাড়ির বাইরে বেরোনো হয়নি। বাড়ির বাইরে কোথাও যে একটি জগৎ আছে, বহুকাল দেখা হয়নি তাঁর।
পই পই করে নীলা কী খাচ্ছে না খাচ্ছে সে খোঁজ নেন মলিনা। স্বর ফুটতে চায় না, তবু ফোটান, চোখ বুজে আসতে চায়, তবু তিনি খুলে রাখেন। মনের জোরে রাখেন। নীলা বলে সে খুব ভাল খাচ্ছে, চিত্রা রাঁধছে খুব ভাল, কইমাছ ভাজা, পুঁইশাক, চিতলমাছের ঝোল…
ঝোলে ধনেপাতা দিয়েছে তো!
দিয়েছে মা।
নিজে তিনি কিছুই খেতে পারেন না, সারাদিনে এক কাপ দুধ যদিও মুখে নেন, তাও বমি হয়ে যায়। নীলা মলিনাকে দেখে আর ভাবে, স্বামী সন্তানদের খাইয়ে নিজে এঁটোকাঁটা খেতেন, বাসি খাবার খেতেন। সংসারে মায়েরা যা করে, মলিনা তাই করেছেন। ওই করে অসুখ বেঁধেছে। নিজের দিকে কখনও তাকাননি, নিজের সামান্য সুস্থতার দিকে, সুখের দিকে। নীলাও কোনওদিন ফিরে দেখেনি মলিনা কী খাচ্ছেন না খাচ্ছেন, মলিনার অসুখ করছে কি না। বাড়ির আর সবাই যেমন দেখেনি। এখন নীলার চেতন ফিরেছে, এখন সে মরিয়া হয়ে মলিনাকে ভাল খাওয়াতে চাচ্ছে, নিজের হাতে মুখে তুলে। মলিনাকে সে সুস্থ করে তুলতে চাইছে। কিন্তু মলিনার পক্ষে কারও কোনও স্নেহ মমতা, কারও শ্রদ্ধা সেবা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। বড় দেরি হয়ে গেছে নীলার। নীলা প্রাণপণ চায় সময়কে পিছিয়ে দিতে, পারে না। প্রাণপণ চায় নিজের ভুলগুলি শুধরে নিতে, পারে না। সময়ের সময় নেই দাঁড়াবার, এ যখন যায়, যায়। মানুষের ভুলগুলি, অন্যায়গুলি সঙ্গে নিয়েই যায়।
.
ডাক্তার প্রশান্ত এলেন দুপুরের পর। অনেকদিনের চর্চায় হাত বাড়িয়ে দিল করমর্দন করতে, ডাক্তারের অপ্রস্তুত মুখ দেখে হাতের আঙুল গুটিয়ে নিয়ে, যেন হাতটি আসলে করমর্দনের জন্য সে বাড়ায়নি, কোন ঘরে যেতে হবে ডাক্তারকে তা দেখাতেই কেবল হাতটি প্রসারিত করা, এর বেশি কিছু নয়, নীলা হাঁপ ছাড়ে, ভাগ্য ভাল যে ডাক্তারের গালে চুমু খাবার জন্য সে ঠোঁট বাড়িয়ে দেয়নি। তাহলে শহরে নীলার নাম ছড়িয়ে যেতে মোটে দেরি হত না যে নীলা কেবল নষ্ট হয়ে যায়নি, তার মাথায় কোনও গোলমালও দেখা দিয়েছে।
ডাক্তার মলিনার রক্তচাপ মাপলেন, নাড়ি দেখলেন, বললেন যে ওষুধ তিনি লিখে দিয়েছেন, তাতেই চলবে।
তাই চলছে না ডাক্তারবাবু। কড়া ওষুধ দিন ব্যথার। মরফিন ইঞ্জেকশন দিন।
পাকাচুলো ডাক্তার, নাকের ওপর ঘোলা চশমাটি বছর তিরিশের পুরনো বলে নীলার মনে হয়, দুপাশে মাথা নেড়ে বলেন, মরফিন এখনই না। আরও পরে।
