নীলা কোনও আশাও দেয় না মিঠুকে। মিঠু তার মুখের নীল আতঙ্ক মুখে নিয়ে ফিরে যায়।
.
অনির্বাণ সন্ধের পর বাড়ি ফিরে নীলাকে ডাকেন। যেমন ছিলেন তিনি, তেমনই আছেন। ঘরে ফিরে আগের মতো তিনি জামা জুতো খুলে, হাত মুখ ধুয়ে, পাজামা ফতুয়া পরে বসেন সোফায়। দিনের পত্রিকায় চোখ বুলোন। নীলা যখন সামনে মুখোমুখি বসল, অনির্বাণের চোখ দিনের পত্রিকায়।
কিষানের সঙ্গে হয়েছেটা কী তোর?
কিছু হয়নি তো।
অনির্বাণ চশমা খুলে ফতুয়ার কোনায় চশমার কাচ মুছে আবার পরে নিয়ে বলেন, জীবন যে খুব অল্পদিনের, দেখছ না? তোমার মার অবস্থা তো দেখছ! জীবনের মূল্য যদি না বোঝা, যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াও, ভবিষ্যতের বারোটা বাজিয়ে যদি বসে থাকো, হঠাৎ একদিন দেখবে জীবন ফুরিয়ে গেছে। কিছুর আর সময় নেই। পালটাবার বা নতুন করে গড়ার।
মানুষটি সারা জীবন ভবিষ্যতের কথাই বলেছেন নীলা আর নিখিলকে, ঠিক এভাবে। নীলা মনে করতে চেষ্টা করে, অনির্বাণকে কখনও সে কাঁদতে দেখেছে কি না।
অনির্বাণ মন্দ্রগম্ভীর স্বরে বলেন, কিষানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে সেদিন। ও বলল, তুমি যদি ভদ্র হয়ে থাকো, আর দশটা মেয়ের মতো স্বামীর ঘর করতে চাও, স্বামীর কথা মতো চলতে চাও, তবে সে তোমাকে ক্ষমা করবে, ঘরে নেবে। না হলে কাগজে কলমে সম্পর্ক চুকিয়ে দিতে তার কোনও আপত্তি নেই। এই সোজাসাপটা ভালমানুষটাকে খেপিয়ে দিয়েছ নীলা। দুশ্চিন্তায় আমি ঘুমোতে পারি না।
নীলা অনির্বাণের ঠোঁটের দিকে উদাস তাকিয়ে ঠোঁটের নড়াচড়া দেখতে দেখতে বলে, বাবা, তুমি কখনও কেঁদেছ?
হঠাৎ কাঁদার কথা উঠছে কেন?
উঠছে কারণ আমি ওঠাচ্ছি। আমার খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছে কখনও, তোমার জীবনে, তুমি কেঁদেছ কি না। মনে করে দেখো তো, কারও জন্য কেঁদেছ কি? কারও জন্য না হলেও নিজের জন্য কেঁদেছ কি না। চোখে কখনও হঠাৎ অনুভব করেছ যে জল? ওই চোখদুটো, চশমার আড়ালে, চশমা, মাত্র যার কাচ মুছে নিয়ে পরলে, সেই চশমার আড়ালে যে চোখ, সে চোখের কথা বলছি। ওই চোখদুটো থেকে এক ফোঁটা জল কখনও ঝরেছে? বুকের মধ্যে কষ্ট হচ্ছে কোনও, দেখলে তোমার গাল ভিজে গেছে কীসে যেন, চোখে হাত দিলে, দেখলে হাত ভিজে গেল, চোখ থেকে জল গড়ালে তো এমনই হয় তাই না? হাত ভিজে যায় মুছতে গেলে। এমন হয়েছে তোমার কখনও? অথবা বালিশ, শুয়ে কাঁদলে বালিশ ভিজে যায়। এরকম হয়েছে কখনও?
পাগল হয়ে গেছিস নাকি? অনির্বাণ ধমক লাগান।
নীলার অদ্ভুত শান্ত কণ্ঠ, হ্যাঁ হয়েছি।
অনির্বাণ আবার চশমা খুলে হাতে নেন। এবার আর চশমার কাচ মোছর জন্য নয়। নীলার দিকে তীক্ষ্ণতা ছুড়ে দিতে।
অনির্বাণের দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা পরোয়া না করে নীলা বলে অনুতাপ বলে একটি শব্দ আছে কখনও শুনেছ? কখনও অনুতাপ করেছ? কখনও করোনি। করার দরকার হয়নি। মাকে বিয়ে করেছিলে, তোমার টাকার দরকার ছিল বলে। মিটেছে। পণের টাকা নিয়ে নিজে ডাক্তারি পড়েছ, ডাক্তার হয়েছ, মিটেছে। মা এ সংসারে দাসীর মতো ছিল, ছিল না কি? ছিল। তাতে লোকে কেউ কিছু বলেনি, কারণ মেয়েরা স্বামীর সংসারে দাসীর মতোই থাকে। প্রভু হবার আনন্দও ভোগ করেছ। ওদিকে আবার স্বাতী সেনকে রেখেছ তোমাকে অন্য রকম আনন্দ দিতে। লোকে এতেও মন্দ কিছু বলেনি, কারণ পুরুষদের ওরকম দু একজন কিছু মেয়েমানুষ বাইরে থাকেই, থাকাটা তেমন খারাপ কিছু নয়। লোকে তোমাকে মন্দ বলেনি, বরং দেবতা ঠাউরেছে, কালো পেঁচি বউকে কখনও তাড়িয়ে দাওনি বলে। এদিকে নিষ্ফলা নপুংসক যে নও, তারও প্রমাণ রেখেছ, দুটো ছেলেমেয়ে হইয়ে। দুটো ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করে বড় ডিগ্রি নিয়েছে, এও সাতজনকে শোনানোর বিষয়, এতেও জিতেছ। এক কানাকড়ি মেয়ের বিয়েতে পণ লাগেনি, বেঁচেছ। লোকের কাছে আরও বলার সুযোগ হয়েছে মেয়ে তোমার বিদেশে থাকে। বিদেশে কেমন আছে কেমন থাকে তা তো আর লোকে জানতে চায় না, বিদেশে থাকা মানেই ভাল থাকা। মায়ের মতো মেয়েও যেন স্বামীর দাসী হয়ে জীবন পার করে, তা হলেই ষোলো কলা পূর্ণ হয়। তা না হলে মেয়ে আবার ডিভোর্সি হয়ে বাপের বাড়ি উঠলে তো ঝামেলার শেষ নেই। ছেলে এখন বড় চাকরি করে, রাজনীতিও করে, একদিন, কে জানে হয়তো মন্ত্রী ফন্ত্রীও হয়ে বসবে। বাহ! কানায় কানায় পূর্ণ জীবন, সার্থক জীবন। অনুতাপ আর যাকে করা মানায়, তোমাকে না। তাই না বাবা?
অনির্বাণকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে নীলা চলে যায় অন্য ঘরে, মলিনার ঘরে। মলিনা চোখ বুজে আছেন, নীলা কাছে বসে মলিনার হাতটিতে আঙুল বুলোতে নিয়েছে যেই, সূর্যমুখীর কুঁড়ির ফুল হয়ে ফোটার মতো মলিনার বোজা চোখ খোলে।
মা কিছু বলবে?
তোমার বাবাকে কিছু বোলো না। বিপদে আপদে তোমার বাবাই তো ভরসা। মলিনার ক্লান্ত ভাঙা স্বর।
মা, তোমাকে আমি প্যারিস নিয়ে যাব। চিকিৎসা করাব। তুমি ভাল হয়ে উঠবে। তোমাকে বলেছি না প্যারিসে কত কী আছে দেখার। সব তোমাকে দেখাব, সব।
মলিনার চোখদুটো হঠাৎ উজ্জ্বল হয়, আমি ভাল হয়ে যাব?
নিশ্চয়ই তুমি ভাল হয়ে যাবে। ওখানে কত ভাল ভাল ডাক্তার। তারপর সমুদ্রের ধারে একটা চমৎকার বাড়ি বানাব। পাহাড়ও থাকবে পেছনে। তুমি তো সমুদ্র খুব ভালবাসো, তাই না?
