তা বটে। কিন্তু সে আসেনি। নীলা একা এসেছে!
আমি প্যারিসে কখনও যাইনি। বাট আমি জানি, প্যারিস ইজ এ ওয়ান্ডারফুল সিটি, আই উড লাভ টু গো দেয়ার। কিষানলালের বাড়িতে থাকা যাবে তো! আই এম সিওর হি হ্যাজ এ বিউটিফুল বিগ হাউজ।
নীলা বলে, কথা বলতে গিয়ে এত ইংরেজি ব্যবহার করছেন কেন? বাঙালি মানুষ, বাংলায় কথা বলুন।
বাংলা ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলা তাঁর চিরকালের স্বভাব। নীলা কখনও আপত্তি করেনি আগে, নিজেও সে মলিনার দাদার সঙ্গে বাংলা ইংরেজি মিলিয়েই কথা বলত।
হো হো শব্দে হেসে ওঠেন মলিনার দাদা, আত্মসম্মানে তাঁর আঘাত লাগেনি, বরং তাঁর সম্মান, নীলা অনুমান করে, তিনি ভাবছেন, যে বেড়েছে। তাঁর জিভে বাংলা শব্দ সহসা আসে না, এ নিয়ে কোনও লজ্জার বদলে গর্ব হচ্ছে তাঁর।
অনির্বাণের দিদি নীলাকে টেনে জানালা থেকে সরান। কী, এত চুপচাপ কেন নীলা! কথা বলো। কথা না বললে কষ্ট হয়ে বেশি। কী করবে বলো, আমাদের কারও কি হাত আছে মলিনাকে সারানোর… সব ভগবানের ইচ্ছে… মলিনার জামাইবাবু একটি সিগারেট ধরিয়ে সোফায় গা এলিয়ে বলেন, তা প্যারিসে জীবনযাপন কেমন চলছে। স্বামী ভাল কামায় তো? আই হার্ড দ্যাট হি আর্নস গুড মানি।
মলিনার কাকাতো বোন নীলার হাত দুটো তুলে ধরে, দেখো দিকিনি, কেমন খালি হাত, গয়নাগাটি খুলে রেখেছ কেন! শাঁখা সিঁদুরও পরোনি। কেমন বিধবার মতো দেখাচ্ছে।
আরেক কাকাতো বোন বলে, বাচ্চা কাচ্চা কবে হবে! যা নেবে, তাড়াতাড়ি নিয়ে নাও।
এবার মলিনার দিদির মেয়ে বলে, কোলের বাচ্চার মুখে দুধের বোতল ঢুকিয়ে দিয়ে দোলাতে দোলাতে, তোমার বাচ্চা তো জন্মেই ফরাসি নাগরিক হবে, তাই না!
মলিনার কাকিমা পল্টুকে ডেকে নীলার সামনে দাঁড় করায়। কী তোর দিদিকে নাকি প্যারিসের কথা জিজ্ঞেস করবি! করেছিস। পনেরো বছর বয়স পল্টুর, দিদিকে আর জিজ্ঞেস করা হয় না কিছু, দিদিমার পেছনে মুখ লুকোয় সে। এই পল্টুটাকে বিদেশে নেওয়া যায় কি না দেখো তো। ছেলেটা মোটে লেখাপড়া করতে চাইছে না দেশে।
অনির্বাণের পিসতুতো দাদা সাধন দাস নীলাকে আড়ালে ডেকে বড় শ্বাস ফেলে বলেন, মিঠুর জন্য কিছু কি করতে পারবে নীলা? একটা বিয়ে টিয়ের বন্দোবস্ত যদি করতে পারো…
নীলা অনুমান করে, আত্মীয়দের বিশ্বাস তার হাতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা এখন। কেউ জানে না যে সে নিজে সুনীলের কাছ থেকে বিমানভাড়ার টাকা ধার করে কলকাতা এসেছে। কেউ জানে না কারও কোনও সমস্যার সমাধান করা নীলার দ্বারা সম্ভব নয়। কেউ জানে না কার বিয়ে হচ্ছে না, কার লেখাপড়া হচ্ছে না এ দেশে, সে এসব জানতে চায় না। নীলা চায় বাড়ি থেকে অতিথিরা সব বিদেয় হোক, মলিনার পাশে বসার অবসর জুটুক তার, মলিনার বোজা চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার যতক্ষণ না তিনি চোখ খোলেন, খুললে নীলা দেখাবে মার জন্য একজোড়া জুতো এনেছে সে প্যারিস থেকে, একটি ঘড়ি এনেছে হাতে পরার, আর একটি ক্রিম মুখে মাখার, বয়সের রেখা মুছে দেওয়ার ক্রিম।
চিত্রা আর মঞ্জুষা ব্যস্ত অতিথি আপ্যায়নে। চা বিস্কুট দেওয়া হচ্ছে ঘরে ঘরে।
নীলা দুর্লভ নীরবতা খোঁজে।
.
মিঠু একটি সাদা সুতি শাড়ি গায়ে, ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়েছিল, পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে নীলার দিকে, ইতিউতি তাকিয়ে গলা চেপে বলে, তোমার সঙ্গে একটু কথা বলব।
বলো।
এখানে না। চলো না তোমার ঘরে যাই।
নীলা দোতলায় নিজের ঘরে মিঠুকে নিয়ে ঢুকল। মিঠু ঘরের দরজা ভেজিয়ে বিছানায় বসল। বসে নীলার দুহাত চেপে ধরে বলল, আমার জন্য কিছু করো নীলা।
কী করব।
একটা ছেলে, যে কোনও একটা ছেলে খুঁজে দাও। তোমার চেয়ে চার বছরের বড় আমি জানো তো। বাবা কেরানি ছিলেন, সে ভাল চাকরিটা গেছে। এখন সে আপিসেই দারোয়ানের কাজ করেন। দাদা বেকার বসে আছে। বিয়ের জন্য যেই আসে, আমার রং তাদের পছন্দ হয় না। আমি কালো বলে, কেউ বিয়ে করতে চায় না আমাকে। বাবার এমন পয়সাও নেই যে ছেলে কিনতে পারে। বিয়ে না হওয়া এ সমাজে কী ভয়ংকর অপরাধ নীলা, তোমার বিয়ে হয়েছে, তুমি বুঝবে না। সেই কবে বি এ পাশ করে বসে আছি। বাপমায়ের সংসারে আমি একটা বোঝা ছাড়া কিছু নই। আমি অকল্যাণ। আমার ছায়া দেখাও পাপ। বিদেশের কোনও ছেলে, আমি ধর্ম টর্ম দেখব না, যে ধর্মেরই হোক, কানা হোক, খোঁড়া হোক, যদি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়…। এ দেশে তো আমাকে বিয়ে করার কেউ নেই, পণ দেবার ক্ষমতা আমার বাবার নেই। কী করে হবে বিয়ে, বলো!
মিঠুর ডাগর চোখে জল। মিঠুর দীঘল ঘন চুল পিঠে ছড়িয়ে আছে। মিঠুর পানপাতার মতো মুখে নীল আতঙ্ক। মিঠুর মেদহীন দীর্ঘ কালো শরীরের লাবণ্য নীলা দুচোখ ভরে দেখে।
দাদাকে বলি দাদা তুমি বিয়ে করছ না কেন? দাদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তোর বিয়ে না দিয়ে কী করে করি। দাদারও তো বয়স কম হল না। আমার বিয়ে হচ্ছে না বলে নিজে বিয়ে করতে পারছে না। আমার ভয় হয় নীলা। বিয়ে হয় না বলে সমাজে মুখ দেখানো যাচ্ছে না আর।
মিঠুর হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নীলা বলে, বি এ পাশ করেছ। কোথাও চাকরি বাকরি করো। বিয়ে না হলে কী হয়? মানুষ মরে যায়?
বিয়ে কি আমি আমার জন্য চাইছি নীলা! বাবা মার মুখের দিকে তাকাতে পারি না। অন্ধকার। আমার গায়ের রং দেখি সবার মুখে। এ যে কত বড় অপরাধ আমার, আমি কালো। দূর দূর করে আমাকে তাড়ায় সবাই। নীলা, যদি কেউ বিয়ে কোরে আমাকে দাসীবাঁদির মতো রাখে রাখুক, তবু বিয়েটা করুক। যদি পাও, বুড়ো হোক, পাগল হোক…
