কত লোক আসে মাসিমাকে দেখতে, কেউ তো ভাল করতে পারে না। কতরকম ডাক্তারবাবু আসেন। কতরকম ওষুধ দিয়ে যান। কোনও ওষুধে তো মাসিমা ভাল হচ্ছেন না। দিন দিন বিছানার সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন। দুদিন আগেও নরম করে দিলে দুটো ভাত খেতে পারতেন, এখন তো কিছুই মুখে ওঠে না। চিত্রা আবার ফুঁপিয়ে ওঠে।
চিত্রা একাই নীলাকে যন্ত্রণা দিচ্ছিল, এরপর যন্ত্রণা দিতে আসেন মঞ্জুষা, এতদিন পর এলি রে নীলা বলে হু হু করে কেঁদে উঠলেন।
বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদলেন আর বললেন, কেন আগে এলি না রে। তুই বিদেশে এটা খেতে পারছিস না, ওটা খেতে পারছিস না, বাড়ি ফিরে এলে তোর জন্য নিজে হাতে কত কিছু রাঁধবেন, বলেছিলেন। তোকে মুখে তুলে খাওয়াবেন। মায়ের হাতের রান্না খাওয়ার ভাগ্য তোর বুঝি আর হল না…
নীলা এবার বালিশে গোঁজা মুখ তুলে চেঁচায়, কী হয়েছে তোমাদের, ভেউ ভেউ করে সব এত কাঁদছ কেন। একটু দূরে সরো সবাই।
মঞ্জুষা বসেই থাকেন আর বলতে থাকেন, ডাক্তারবাবু আর ওষুধ দিচ্ছেন না, বলেছেন ওষুধ আর কাজ দেবে না। ব্যথার কটি ওষুধ কেবল চলছে। তাতে তো আজকাল ব্যথাও কমছেনা। ক্যান্সার নাকি নাড়ি থেকে থেকে লিভারে গেছে, কাল বলে গেলেন হাড়ে ঢুকেছে, আবার বললেন মাথাতেও। কাল সারারাত দিদি কাতরালেন ব্যথায়, বসে বসে তাই দেখতে হল।
নীলা এবার উঠে যায় বিছানা থেকে, দৌড়ে যায় স্নানঘরে।
বাইরে থেকে মঞ্জুষা বলেন চানটা করে খেতে আয় নীলা।
নীলা নীরবতা চাইছে। নীরবতা সম্ভবত বড় দুর্লভ জিনিস এ মুহূর্তে। সে চাইছে না কেউ কোনও নিখুঁত বর্ণনা দিক মলিনার শরীরের বা ইচ্ছের। মলিনার ইচ্ছের কথা নীলা সেই ছোটবেলা থেকেই জানে, মলিনার কোনও ইচ্ছে কখনও পূরণ হয়নি, তিনি চেয়েছিলেন অনির্বাণের সামান্য ভালবাসা পেতে, পাননি। অনির্বাণ মণ্ডল যে ভালবাসেন না কাউকে তা নয়, বাসেন, তবে মলিনাকে নয়, স্বাতী সেনকে। মলিনা একবার কাঞ্জিপুরম শাড়ি দেখে এসে বলেছিলেন, কী সুন্দর শাড়ি গো। একটা পরতে পারলে বেশ হত।
অনির্বাণ কাঞ্জিপুরম শাড়ি কিনে মলিনাকে দেননি, দিয়েছেন স্বাতীকে, স্বাতীকে সেই শাড়ি পরিয়ে সিমলায় নিয়ে গেছেন বেড়াতে। মলিনার সাধ ছিল কোনও একদিন দার্জিলিং যাবেন, অনির্বাণের কোনও দিনই সময় হয়নি মলিনাকে দার্জিলিং নেবার। স্বাতী দেখতে মলিনার চেয়ে ফর্সা ছিল, স্বাতীর ওই একটি গুণের কারণে অনির্বাণ স্বাতীর পিছু ছাড়েননি। বুদ্ধি হবার পর থেকে নীলা কখনও দেখেনি অনির্বাণ আর মলিনা এক ঘরে এক বিছানায় শুয়েছেন। মলিনা যত্ন করে স্বামীর বিছানা গুছিয়ে দিতেন, অনির্বাণ স্বাতীর সঙ্গে রাতের আমোদ আহ্লাদ সেরে বাড়ি ফিরে খেতে বসে কোন নিরামিষে নুন হয়নি, কোন মাংসে তেল বেশি পড়েছে, কোন ভাজা পুড়ে গেছে এসব নিয়ে চেঁচিয়ে গোছানো বিছানায় ঘুমোতেন নাক ডেকে। মলিনার জীবন ওরকমই ছিল। ইচ্ছের গায়ে শেকল পরিয়ে তিনি তাঁর জীবন কাটিয়েছেন এ সংসারে।
.
বিকেলে বাড়ি ভরে গেল মলিনাকে দেখতে আত্মীয়স্বজনে। বাড়ির মাঠ ভরে গেল ঝকঝকে গাড়িতে। মলিনার দিদি জামাইবাবু, তাদের ছেলে, ছেলের বউ, ছেলের বউয়ের দু বাচ্চা, মলিনার কাকিমা, দুই কাকাতো বোন কাকাতো বোনের ছেলে পল্টু, অনির্বাণের দাদা, দিদি, পিসতুতো দাদা, তার মেয়ে মিঠু, আর দুজন প্রতিবেশী গৃহবধু। চৌকাঠের জুতোর ঢিবিতে জুতো রেখে সব ঢুকে যাচ্ছে মলিনার ঘরে, হাতে কারও আপেল আঙুর কমলালেবু, কারও হাতে বেদানা, ডালিম, কেউ নিয়ে এসেছে হরলিকস, কেউ আবার বাটি ভরে শিংমাছের ঝোল এনেছে, কেউ এনেছে ঘরেপাতা খাঁটি দই, কারও হাতে ফুল। মলিনাকে দেখিয়ে দেখিয়ে জিনিসগুলো সামনে রাখছেন মঞ্জুষা। মঞ্জুষা জানেন যে ফুলের ঘ্রাণ মলিনার নাকে গন্ধিপোকার গন্ধ হয়ে ঢোকে, বেদানা বা কমলার রস মুখে ঢোকালে বমি হয়ে বেরিয়ে যায়। মলিনা শুকনো চোখে আত্মীয়দের খানিকক্ষণ দেখে আবার চোখ বোজেন। যেন সারাজীবন নিরন্তর পরিশ্রম করার পর এখন এত ক্লান্ত যে চোখ মেলার শক্তিও নেই। মলিনাকে দেখে কেউ আহা বলে, কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কেউ আঁচলে চোখ মোছে, হাতপাখায় কেউ বাতাস করে গায়ে, কেউ হাত বুলোতে থাকে মলিনার হাড়সার হাতে।
আর ভিড় থেকে ভেসে আসতে থাকে
এই কদিন আগেও তো হেঁটেছেন! কথা বলেছেন।
আহা শরীরের কী হাল হয়েছে?
পেটটা আজ বেশি ফোলা লাগছে।
চোখের হলুদটা আরও বেড়েছে।
নীলা ভিড় কেটে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। নীলার পেছন পেছন ভিড়ের মানুষগুলোও এক এক করে। মঞ্জুষা নীলাকে তাড়া দেন, শাঁখা সিঁদুর পরে আয় তো। এত লোক এসেছে, কী বলবে বল।
লোকেরা কি আমার শাঁখা সিঁদুর দেখতে এসেছে?
তা দেখতে আসেনি, কিন্তু চোখ তো বাড়িতে রেখে আসেনি কেউ। এ নিয়ে দেখিস, কথা হবে।
হোক।
নীলা শাঁখা সিঁদুর পরা অনেক আগেই ছেড়েছে, ও পরার কোনও ইচ্ছে তার নেই। জানালায় গিয়ে সে দাঁড়ায়, সেই জানালা, তাকালে প্রতিবেশীর বাড়ির পিঠ দেখা যায়, আর পিঠের তলে এক বোঝা আবর্জনা, আবর্জনা খুঁটে খাচ্ছে রাস্তার দুটো নেড়ি কুকুর। নীলার মগ্নতা ভাঙে মলিনার দাদার কণ্ঠস্বরে, হোয়াই ডিডন্ট হি কাম, নীলা?
কে?
কিষানলাল। আমি ভেবেছিলাম, হি হ্যাজ অলরেডি এরাইভড ইন ক্যালকাটা, আড্ডা ফাড্ডা দেব, হি ইজ রিয়েলি এ জেন্টেলম্যান।
