কাট।
এবার দানিয়েলের কাছে উঠে যায় রিতা। চেয়ার ফেলে কফিনের ওপর বসে দানিয়েলের সঙ্গে লঘুস্বরে কথা বলে। নীলা চেয়ারেই বসা, রোদের দিকে মুখ করা, পাউডার ঘসা মুখ।
ফিরে এসে মুখে হাসি টেনে রিতা বলে, শাড়িতে তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে নীলা। দেখেছি তুমি পশ্চিমি পোশাক পরো বেশি। শাড়িতেই কিন্তু তোমাকে মানায়।
এবার নতুন প্রশ্ন, তোমাদের সংস্কৃতিতে তো সতীদাহ বলে একটা ব্যাপার আছে, তোমার স্বামীর মৃত্যু হলে, তোমাকেও চিতায় উঠতে হবে।
সে পুরনো প্রথা। গত শতাব্দীতে এ প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মেয়েদের ভগাঙ্কুর ছেদ করা তো ভারতীয় সংস্কৃতির একটি অংশ, তা কত শতাংশ মেয়ের ভগাঙ্কুর ছেদ করা হয় ভারতে?
ভগাঙ্কুর ছেদ করা ভারতীয় সংস্কৃতি নয়।
আচ্ছা, তোমার সংসারজীবনের কিছু কথা বলো। তোমাকে তো সংসারের সব কাজ করতে হত তাই না?
তা করতে হত।
কী কী করতে বলো তো?
রান্না করা, বাসন ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা, কাপড় ধোয়া এসব।
তোমার স্বামী কী কী কাজ করত ঘরের?
তেমন কিছু না।
তোমার স্বামী কখনও রান্না করেছে?
না।
ঘর পরিষ্কার করেছে?
না।
সে কাজ থেকে ঘরে ফিরে কী কী করত?
টেলিভিশন দেখত, মদ খেত…
রিতা মাথা নাড়ে, বলো বলো আর কী কী করত…
আর কী, খেত, ঘুমোত।
সংসারের খরচ দুজনে মেটাতে তাই না?
না, আমার চাকরি ছিল না, আমার স্বামীই সব খরচ দিত।
তুমি চাকরি করো, এ তোমার স্বামী চায়নি তো!
না চায়নি।
তোমার স্বামী তোমাকে ঘরে বন্দি করেছিল তো, তাই না?
ঘর থেকে বাইরে একা বেরোই সেটা চায়নি। তবে বন্দি বলতে যা বোঝায় তা ঠিক না। দরজার চাবি আমার কাছেও থাকত।
তোমার স্বামী তো তোমার যা কিছু সম্পদ, তোমার স্বর্ণালংকার সব রেখে দিয়েছে।
রাখেনি। ও আমি ভুলে ফেলে এসেছি।
তোমার স্বামী তোমাকে পর্দা করার জন্য চাপ দেয়নি, মানে মাথায় কাপড় চড়ানো?
না। ও রক্ষণশীল মুসলমান পরিবারে ঘটে, হিন্দু পরিবারে নয়।
তোমার স্বামী তো তোমাকে মাছ মাংস খেতে দেয়নি। কী খাবে না খাবে তাও তার আদেশে হত!
তা ঠিক, ও নিরামিষাশী। চাইত ঘরে নিরামিষ রান্না হোক।
আর তা না করলে কী করত? মারত?
না মারেনি কখনও।
গাল দিত?
তাও দেয়নি।
তা হলে কী করত?
মন খারাপ করত।
কাট।
.
সানদানি থেকে বেরিয়ে দানিয়েল বলে, কিষানের জন্য বেশ দরদ তো তোমার!
নীলা জিজ্ঞেস করে, কী বলা উচিত ছিল আমার? কী বললে বোঝা যেত যে আমার দরদ নেই?
বাদ দাও। দানিয়েল হাত ঝাঁকায়।
এই তথ্যচিত্রটা মূলত কীসের ওপর?
মেয়েদের ওপর, মেয়েদের কী করে অত্যাচার করা হচ্ছে, সেসবের ওপর।
নীলার মনে আরও প্রশ্ন, কোন মেয়ে? যে কোনও মেয়ে? ফরাসি মেয়েও?
এটা আগেই তো বলেছি, বিদেশি মেয়েদের নিয়ে।
বিদেশি মেয়ে? জার্মান মেয়ে? সুইস মেয়ে? বেলজ?
ওরা তো ফ্রান্সে থাকতে আসে না। যারা আসে তারা।
রুয়ান্ডার, সোমালিয়ার, মালির, ভারতের, পাকিস্তানের, ইরানের, আফগানিস্তানের মেয়েরা তাই না?
দানিয়েল অনেকক্ষণ উত্তর দেয় না। মেট্রোয় ভিড় উপচে পড়ছে। সেই ভিড়ে গা ধাক্কা খেতে খেতে বলে, তুমি মেয়েদের ভগাঙ্কুর কেটে নেওয়ার ঘটনা জানো না? এই ফ্রান্সে কত মেয়েদের ভগাঙ্কুর কেটে নেওয়া হচ্ছে। সংস্কৃতির নামে এই নির্মমতা চলছে, এখানেও। তুমি যেন ব্যাপারটিকে সমর্থন করছ নীলা।
নীলা বলে, গলায় জোর তার, আমি সমর্থন করতে যাব কেন! যা সত্য তাই বলেছি, ভারতে এই সংস্কৃতি নেই।
এটা না থাক, অন্য কিছু আছে তো। সেসব বললে না কেন! এই তো বড় সুযোগ ছিল লোককে জানানো। যারা জানে না, তৃতীয় বিশ্বে মেয়েরা কী হারে বঞ্চিত হচ্ছে, লাঞ্ছিত হচ্ছে, তাদের মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না, পুরুষের দাসী হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য মনে করা হয় যে মেয়েদের জন্ম, সব বললে না কেন? এমনিতে তো অনেক বৈষম্যের উদাহরণ দাও।
নীলা বলে, আমাকে যা জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তার উত্তর দিয়েছি।
রিতা তোমার সাক্ষাৎকারে খুব একটা তুষ্ট নয়, সত্যি কথা বলতে গেলে।
নীলা পাঁচশো ফ্রাঁ কবে পাচ্ছে বা আদৌ পাচ্ছে কি না তা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করে না। মুখ বুজে থাকা, নীলা লক্ষ করেছে, অনেক সময় মঙ্গলজনক।
কী ব্যাপার কথা বলছ না যে! দানিয়েলের অতুষ্ট বাদামি চোখ নীলার চোখে।
কী বলব? কোনও প্রশ্ন করোনি তো!
তোমার সাক্ষাৎকারের পাট তো অনেকক্ষণ চুকেছে। এবার ধরায় ফেরো। স্বাভাবিক হও।
নীলা হেসে ওঠে। খামোখাই হাসে সে। দানিয়েল নীলার হাসির কারণ জিজ্ঞেস করলে নীলা ভেবে নেয়, বলবে যে খামোখাই হাসছে। খামোখা হাসে তো পাগল লোকেরা। নীলা বলবে যে সে পাগল।
.
বাসিলিক সানদানি থেকে কনকর্ড পৌঁছল দুজন। কনকর্ড থেকে এক নম্বর লাইনে এখন যেতে হবে শার্ল দ্য গোল এতোয়াল। কিন্তু এতোয়ালের দিকে মেট্রো চলবে না। এতোয়াল থেকে নেশনের পথে তিন ইস্টিশন গেলেই ত্রকাদেরো। কনকর্ড থেকে মেট্রো চলছে না, এতোয়াল থেকেও চলবে না। দানিয়েল উঠে আসে পাতাল থেকে মাটিতে। দানিয়েলের পেছন পেছন নীলা। বাস ধরা ছাড়া গতি নেই। কনকর্ডের বাসস্টপে দাঁড়ায় দুজন, বাস আসছে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু লোক তুলছে না, তিল ধারণের জায়গা নেই বাসের ভেতর। মেট্রো চলছে না তাই ভিড় বাসে, বাসস্টপের দু একজন বলে। ট্যাক্সি দেখলেই দানিয়েল হাত লম্বা করে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে, ট্যাক্সি যেমন যাচ্ছে, তেমন যেতে থাকে, কারও থামার লক্ষণ নেই। দেখে নীলা বলে, ভারতের মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে দেখছি। একরকম সে স্বস্তি বোধ করে দেখে যে কিছু অনিয়ম ঘটছে, এতদিন সে কোনও রেলগাড়ি বা বাসকে, সময়ের এতটুকু বাইরে যেতে দেখেনি। ঠিক পাঁচটা পঁয়ত্রিশে থামার কথা, পাঁচটা পঁয়ত্রিশে এসেই থামে, পাঁচটা চৌত্রিশেও নয়, পাঁচটা ছত্রিশেও নয়। ট্যাক্সি ডাকলেও তিন মিনিটে আসার কথা, তিন মিনিটেই আসে। হাত তুললে সে যে রাস্তায় হোক, যত রাত হোক, থামে। একটু অনিয়ম না হলে কেমন যেন দমবন্ধ লাগে, নীলা ভাবত। নীলা এই অনিয়ম দেখে মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস নেয়।
