বোতাম টিপে বিশাল দরজা খুলে দিলে রিতার গাড়ি ঢুকে যায় সার্জের বাগানে। গির্জার ঠিক পেছনেই বাগান। বাগান বলতে ঘাসের মাঠ। মাঠে ছড়িয়ে আছে পুরনো পাথরের কফিন। কফিনের ওপর বসে কফি খাচ্ছে আন লর। মাঠে খেলছে রাফায়েল আর বেনজামিন। আন লরের দুই ছেলে।
রিতা পৌঁছতেই এক দফা চুমোচুমি হল।
দানিয়েল বাসিলিকের পাদদেশের বাড়িখানা দেখে অনেকক্ষণ উ লা লা উ লা লা করে। এত চমৎকার জায়গায় বাড়ি পাওয়া নাকি ভাগ্যের ব্যাপার। ভাগ্য কি আর সাধে, সার্জ এই বাসিলিকের পরিচালক বলেই না!
রিতার সঙ্গে নীলা আর দানিয়েল ছাড়াও আরও দুজন এসেছে, একজনের হাতে ক্যামেরা, আরেকজনের হাতে মাইক্রোফোন। নীলার বুক কাঁপে। ক্যামেরার সামনে সে কোনওদিন দাঁড়ায়নি আগে। রিতা তাকে কী প্রশ্ন করবে তার সে কিছুই জানে না। নীলার হাতের তালু ঘামতে থাকে, নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
রিতা বলে, তুমি নাকে একটু পাউডার লাগিয়ে আসবে?
নীলা হাতে নাক মুছে বলে, না, ঠিক আছে। আর আমি পাউডার আনিওনি সঙ্গে।
রিতার মুখ রক্তিম হয় শরমে।
দানিয়েল নীলার কানে কানে চাপা স্বরে বলে, নাকে পাউডার লাগানো মানে নাকে পাউডার লাগানো নয়। এর মানে তয়লেতে যাওয়া। পেচ্ছাপ পায়খানা করা।
তয়লেতে যাব কি না তা জিজ্ঞেস করলেই তো হয়?
না, এ শরমের কথা।
শরমের?
নীলা ঠিক বোঝে না, এ সমাজের শরম ঠিক কোথায় থাকে। এখনও গ্রীষ্মকাল আসেনি, এখনই মেয়েরা রাস্তায় আধন্যাংটো ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছে। কাপড় চোপড় ব্যাপারটিই ঝামেলার। শরম ধুয়ে খেয়েছে বলেই না এদের দেখতে এত মৌলিক দেখায়।
ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর আগে ক্যামেরার লোকটি বলল, মুখে একটু পাউডার লাগালে ভাল হয়।
এই পাউডার সত্যিকার পাউডার। তয়লেত নয়। নীলার মুখে আন লর পাউডার মাখাতে নিয়ে যায়। আন লর-এর সাজানো ঘরদোর দেখে নীলা বলে, তোমাদের অনেকদিন বিয়ে হয়েছে?
না তো আমাদের তো বিয়ে হয়নি।
সার্জের কী হও তুমি তা হলে?
প্রেমিকা হই।
একসঙ্গে থাকো?
নিশ্চয়ই। আজ ছ বছর ধরে সংসার করছি।
আর বাচ্চারা?
আমাদের বাচ্চা। আমার আর সার্জের। আন লর মিষ্টি হেসে বলে।
নীলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে পাউডার ঘসে। আজ রিতার অনুরোধে সে শাড়ি পরেছে। শাড়ি পরা, কপালে লাল টিপ পরা বাঙালি মেয়ে নীলা। মনে মনে কলকাতা ঘুরে আসে নীলা। মনের এই এক বড় গুণ, এটি খুব দ্রুত উড়তে পারে।
দুটো চেয়ার পেতে দেওয়া হয়েছে মাঠে। নীলার সামনে বসে রিতা দেখে নিল ক্যামেরায় ঠিক ঠিক আসছে কি না নীলার মুখ আর পেছনের বাসিলিক, বিখ্যাত গির্জা, ফ্রান্সের সব রাজারা শুয়ে আছেন যে গির্জায়। দেখে নিন নীলার মুখে রোদ পড়ছে কি না, কপালের টিপটিকে দেখাচ্ছে কি না রক্তের মতো লাল। পড়ছে, দেখাচ্ছে।
এবার মুখোমুখি বসে প্রথম প্রশ্ন, আচ্ছা নীলা, তুমি কপালে যেটি খোদাই করে লাগিয়েছ, সেটি তো তুমি যে বিবাহিত তার একটি প্রতীক, তাই না?
না।
রিতা থতমত খায়, কিন্তু একটি বেদনার্ত হাসি ঝুলিয়ে রাখে ঠোঁটে, অপেক্ষা করে নীলার ব্যাখ্যার, কেন না।
এটি বিয়ের কোনও চিহ্ন নয়, সব মেয়েরাই বিয়ের আগে টিপ পরে, দেখতে সুন্দর লাগে বলে পরে।
রিতার প্রশ্ন, এটি কি স্থায়ীভাবে লাগানো হয়নি তোমার কপালে?
নীলা হেসে ওঠে, হেসে সে কাগজের টিপটিকে আঙুলে তুলে নিয়ে দেখায়, দেখো, এটি অস্থায়ী একটি জিনিস। এই পরলাম, এই খুললাম।
কাট।
.
রিতার পছন্দ হয়নি টিপের ম্যাজিকটি। লাল একটি বিয়ের রং যদি নীলার কপালে খোদাই করা থাকত, সম্ভবত তার সুবিধে হত সাক্ষাৎকারে।
কোলের ওপর প্রশ্নের কাগজে চোখ বুলিয়ে রিতা পরের প্রশ্ন করে, তুমি তো ভারতের মেয়ে, অত দূর দেশ থেকে প্যারিসে এসেছ স্বামীর সঙ্গে সংসার করতে, তাই না?
হ্যাঁ তাই।
শুনেছি তুমি স্বামীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছ। একটু বিস্তারিত বলবে, কেন?
কারণ স্বামীর সঙ্গে আমার মেলে না।
কেন মেলে না?
মেলে না কারণ দুজন আমরা ভিন্ন ধরনের মানুষ।
তোমার স্বামী তো ভারতীয়, তবে ভিন্ন কেন বলছ?
ভিন্ন কারণ আমাদের মানসিকতা ভিন্ন।
তোমার স্বামী শুনেছি অত্যাচার করত তোমার ওপর। খুলে বলো কী কী করত সে।
অত্যাচার বলতে আসলে যা বোঝায় তা সে কিছুই করেনি।
তোমার স্বামী তো তোমাকে মারত, কী করে মারত, কী ব্যবহার করত মারতে গিয়ে? চাবুক, নাকি লাঠি নাকি কোমরের বেল্ট। নাকি হাত…
আমার স্বামী আমার গায়ে কখনও হাত তোলেনি।
কাট।
.
রিতা হাত উঠিয়ে ক্যামেরা বন্ধ করতে বলে।
উঠে আসে নীলার সামনে, হাঁটু গেড়ে বসে বলে, তুমি বোধহয় আমার প্রশ্ন বুঝতে পারোনি নীলা।
নীলা নির্ঘাত বেকায়দায় পড়ে। তার অস্বস্তি দেখে, রিতা জল জল বলে চিৎকার করে। আন লর দৌড়ে এক গেলাস ঠাণ্ডা জল নিয়ে আসে। নীলার তেষ্টা পায়নি তবু পান করতে হয় জল, অর্ধেক জল হাতের কাছে রাখতে হয় যদি পান করার তাগাদা দেওয়া হয়।
ক্যামেরা তাক করা নীলার মুখে।
রিতা শুরু করে আবার, তোমাদের ভারতীয় মহলে আর যে মেয়েরা স্বামীর ঘর ছেড়েছে, তাদের সঙ্গে নিশ্চয়ই তোমার কথা হয়েছে। ওদের অবস্থার কথা কিছু বলো, ওদের ওপর ওদের স্বামী কী কোরে অত্যাচার করে।
নাহ। এরকম কারও সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। নীলার নিরীহ জবাব।
